তাই তো বলছিলাম রে! তাহলে? তিনি কন : সেইজন্যেই তো তোর মাকে ডাকতে বলছিলাম।
বাবার জবাবে সে সোফায় বসে আমার মাথাটাকে নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। নিজেই মা হয়ে বসল যেন। তারপর কোলের ছেলেকে মা যেমন ঝিনুকে করে দুধ খাওয়ায় না, তেমনি করে আগে ফুঁ দিয়ে গরম দুধটাকে একটু জুড়িয়ে নিয়ে খাওয়াতে লাগল আমায়। চামচের পর চামচ।
হাঁ করাতে হোলো না আমাকে। চিরকালের হাঁ-করা ছেলে হাঁ করেই ছিলাম, ঢক ঢক করে গিলতে লাগলাম বেশ।
এমন সময় রিনির মা দরজা ঠেলে ঘরে এলেন। একী? এ কে? চাঁচলের রাম না? এখানে অমন করে শুয়ে কেন গো? কী হয়েছে ওর?
ভারী শক্ত ব্যারাম গিন্নি। বুকে জল জমেছে। বললেন রিনির বাবা : প্লুরিসি হয়েছে ছোঁড়াটার।
.
৫৩.
না, কোমা না। কমা নয়, সেমিকোলনেই ছিলাম এতক্ষণ। এমন কি, কোলনেও ছিলাম বলা যায়। রিনির কোলে মাথা রেখে দুধ খেয়েছি মনে পড়তে থাকে আমার। আচ্ছন্ন ভাবটা কাটার পর চোখ মেলে দেখি আমি বিছানাতে শুয়ে। এ কোথায়? এ তো সেই সোফা নয়, এমন কি ডাক্তারবাবুর রুগী দেখার ঘরও নয় এ।
রিনি আমার বিছানার পাশে বসে।–কোথায় রে আমি?
আমাদের তিনতলার ছাদে। চিলকোঠায়। রিনি বলল, বাড়িতে তো ঘর খালি নেই। ছাদের এই ঘরটাই ফাঁকা। এখানেই তুমি থাকবে।
চিলেকোঠায়? এই এক চিলতে ঘরে?
তোমার একলার থাকার পক্ষে তো যথেষ্টই–তাই নয়?
একলা থাকতে হবে আমায়? না বাবা, একলাটি থাকতে পারব না। দারুণ ভয় করবে আমার।
ভয় কিসের গো?
ভূতের ভয়, আবার কী? আমি বলি : ছোটবেলায় ভূতে ধরেছিল না আমায়? সেই থেকে ভূতের ভয় আমার ভারী।
ভূত কোথায় এখানে? কলকাতায় কি ভূত থাকে নাকি? থাকতে পায়? তিষ্ঠোতে পারে কখনো? ভূত যতো সব পাড়াগাঁয়।
সেই ভূতটা আমায় ছাড়েনি এখনো। জানিস? মনের মধ্যে রয়ে গেছে আমার। অন্ধকার ঘরে একলাটি পেলেই চেপে ধরে, ভয় দেখায় আমায়, বুকের মধ্যে এমন গুড় গুড় করে। একলা থাকতে হলে…আমি…আমি হয়ত হার্টফেল করেই মারা যাবো।
বেশ। আমিও থাকব না হয় তোমার কাছে। তুমি রুগী মানুষ, রাত-বিরেতে কখন কী দরকার পড়ে, ওষুধ-টষুধ খাওয়াতে হয় যদি, এই সব বলে-কয়ে মাকে রাজী করানো যাবে–থেকে যাব না হয় তোমার কাছে, কী হয়েছে
তাই বল্। এতক্ষণে ধড়ে প্রাণ এলো আমার। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলি-একতলায় আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলুম না? একটু আগে…যখন তুই দুধ খাইয়ে দিচ্ছিলিস আমায়? তিনতলায় এলুম কি করে? কিছুই তো মনে পড়ছে না আমার।
আমি তুলে আনলাম যে তোমাকে!
তুই! তুই আনলি? কি করে আনলি রে তুই। কিছুই তো টের পাইনি।
কোলে করে আনলুম তো! একলাই আনতে পেরেছি…
বলিস কি রে! অবাক্ করলি আমায়!
অবাকটা কিসের? এমন কিছু ভারী কাজ নয়। কেন, চাঁচলে থাকতে তুমি যে আমায় কোলে করে মহানন্দা পার করেছিলে একবার–মনে পড়ে না তোমার?
তুই তো হাল্কা পলকা ছিলিস তখন। এখন আর পারব কি? আর তোকে কোলে নিয়ে মহানন্দা পেরুননা…সে তো মহানন্দের কাজ। তাছাড়া তোকে কোলে করতে পাওয়া তো এক বিলাস! আর আমি-আমি যে একটা দস্তুর মতন লাশ রে, প্রাণ নিয়ে টানাটানি ব্যাপার…
তুমিও এমন কিছু ভারী নও। কদিন ধরে ভুগে ঠিক যেন ফড়িংটি হয়ে গেছ। তোমাকে তুলতে এমন কিছু বেগ পেতে হয়নি।
এখনো তুই ঐ ছেলের পোশাক বদলাসনি? সেই হাফপ্যান্ট পরে রয়েছিস? মা কিছু বলছে না?
বলবে না আবার? তবে এখনো বলার ফুরসত পায়নি বোধহয়। তুমি অজ্ঞান হয়ে গেছ বিসি নাকি যেন হয়েছে তোমার-তাই নিয়ে বাড়ি সুদ্ধ ব্যস্ত সবাই। তাই এখনো আf আস্ত রয়েছি এতক্ষণ। দেখো না কী হয়…আমার অদৃষ্টে কী আছে দ্যাখো না! আমারে নিয়ে কী হয় এরপর দেখতেই পাবে।
তা নাহয় দেখবখন। কিন্তু তুই যে চামচেয় করে আমায় দুধ খাইয়েছিস তাতে…তার যা দুঃখ পেয়েছি কী বলব! সে আমার দুধ খাওয়া নয় বিষ খাওয়া হয়েছে। আর্ট সখেদে কই : তোকে এত করে সেদিন বোঝালাম যে, মুখ থাকতে হাতের কোনো কাত নেই-হাত কিসের জন্যে? আর তুই কি না! …কোনো উন্মুখ লোকের কাছে, এমন কি : যদি মরণোন্মুখও হয় না…মুখের কাছে দুধের পাত্র তুলতে হলে মুখটাকেই পাত্র করতে হয় নিজেই মুখপাত্র হবি। তা না হয়ে…?
মুখপাত্র হব? কি করে মুখপাত্র হবো? সে বুঝতে পারে না বুঝি।
কি করে আবার? মুখটাকেই পাত্র করবি তোর। মুখের মধ্যে দুধ নিয়ে না…চুমুকে চুমুতে খাওয়াবি আমায়। তাই তো নিয়ম।
তাই নিয়ম? কোথাকার সৃষ্টিছাড়া নিয়ম।–শুনি একবার?
মোটেই সৃষ্টিছাড়া নয়। এই সৃষ্টির মধ্যেই। তোর সৃষ্টির মধ্যেই তো? তুই-ই আমারে অমনি করে খাইয়েছিলিস একবার…একটা মিষ্টি জিনিস…তাতে ঐ মিষ্টি আরেকটা মিষ্টি সঙ্গে মিশিয়ে ডবোল মিষ্টি করে আমি পেয়েছিলাম.তোর কাছেই খেয়েছিলাম সব প্রথম আর…আর বোধ হয় সেই শেষ। মনে নেই তোর?
কক্ষনো না! কবে আমি খাওয়ালুম গো তোমায়?
ওর কথায় আমি আঘাত পাই সত্যিই! যে মুহূর্তক্ষণটি আমার প্রতিমুহূর্ত-আমা: সারাজীবন তাই ওর কাছে বিস্মরণ হয়ে রয়েছে। ওর যে ক্ষণিক আত্মবিস্মৃতি থেকে আমার আত্মবিস্মৃতি–কোনোখানেই তার বিন্দুমাত্র স্থিতি নেই আর একটু ও?
মেয়েরা বুঝি এমনিই! এমনি করেই মুহূরে লীলাবিলাসে কাউকে রাজা করে দিতে তার পরেই অবহেলায় তাকে ফকির করে ছেড়ে দেয়। ঈশপের ব্যাঙের গল্পটা মনে পরে যে, ব্যাঙ নাকি ঢিলছোঁড়া একটা ছেলেকে বলেছিল নাকি মেয়েকেই?), তোমার কাছে যা নেহাত হাসিখেলা, আমার বেলায় তা ভাই মরণদশাই নির্ঘাত!
