গরম জল যদি না থাকে? ওদের তো চায়ের দোকান না!
বেশ ফুটন্ত দুধ তো? তাহলে ওই গরম দুধ দিয়েই ভাঁড়টা গরম জলে ভালো করে ধুয়ে নিবি একটুখানি, বুঝেছিস?
আমি কি বেহুঁশ হয়ে পড়ছি নাকি? এক্ষুণি কি অজ্ঞান হয়ে পড়ত্ব? মারা যাব এবার? কী হয়েছে আমার যে!……
গলার থেকে বোল সরছে না আমার মাথার ভেতর যতো আবোল-তাবোল ভাবনা।
বাবার মতই হোলো নাকি আমার? বাবার যেমন মাঝে মাঝে হয়? দিন কয়েক অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকেন বিছানায়। তারপর একদিন আপনার থেকেই সেরে ওঠেন–জ্ঞান ফিরে পান আবার।
কী হোত যে বাবার কে জানে! তখনকার কালে ওসব রোগের নামধাম, চিকিৎসা কিছুই বেরয়নি নাকি।
চাঁচল রাজ হাসপাতালের ডাক্তার বিপ্রদাসবাবু আসতেন–দেখতেন। অজ্ঞানাচ্ছন্ন বাবাকে তাঁর যথাসাধ্য পরীক্ষা করতেন। দেখেশুনে শেষমেস বলতেন-কোমা হয়েছে তোমার বাবার। আমাদের চিকিৎসাশাস্ত্রে এর কোনো দাবাই নেই। আমার জানা নেই অন্তত।
সারবেন না বাবা? কাচুমাচু হয়ে শুতাম। মারা যাবেন নাকি? সে কথা জিগ্যেস করার সাহস হত না, মন যে কেমনটা করত তখন!
সারলে আপনার থেকেই সারবেন! এখন কদিন এভাবে থাকেন কিছুই বলা যায় না। জল খাওয়াতে হবে খুব। আর ফলের রস-টস। এই লুক।
হাঁ করছেন না তো! খাবেন কি করে?
হাঁ করিয়ে খাওয়াতে হবে। ঐ জল আর ফলের রস। খুব একটু একটু করে। মাঝে মাঝেই।
ওষুধ দেবেন না?
এর কোনো ওষুধ নেই, বেরয়নি এখনো। কবরেজি শাস্ত্রে এই ব্যায়োকে সন্ন্যাস রোগ বলে থাকে। আমরা বলি কোমা!
কোমাটি কী?
কোমা হচ্ছে কোমা–আবার কী? মরবার আগে হয়ে থাকে অনেকের, আচ্ছন্নের মতন এই পড়ে থাকা। আবার মরবেই যে তারও কোনো মানে নেই। ভালোও হয়ে উঠতে পারে ভগবানের ইচ্ছায়। সবই তাঁর হাত।
কিন্তু মা যে বলেন, উনি এখন সমাধিতে রয়েছেন?
সেই কথাই বলেন। ঐ কোমাই। সংস্কৃত ভাষায় সমাধি। একেবারে খতম হবার আগে, মানে সমাধার আগে হয়ে থাকে।
না না, তা নয়। ঠাকুর পরমহংসদেব বলেন না…?
সেই সমাধি তো? জানি। যে-সমাধি হলে, উনি বলেন, লোকে আর ফেরে না, কদাচ দু-এক জনা ফিরে আসেন লোকশিক্ষা দেবার জন্যই? সেই তো? সেই কথাই তো কইছি আমি।
মার কিন্তু ভিন্ন মত ছিল। মা বলতেন, ছাই জানে ওই ডাক্তার। উনি এখন ব্রহ্ম সাক্ষাৎকারে রয়েছেন। দেবদেবীদের সঙ্গে মুলাকাত করছেন এখন।
একেবারে মূল ধরে টানতেন মা। সিরিয়াসলি বলতেন, কি ঠাট্টাতামাশায়-তা মা-ই জানেন!
মুলাকাতের কাতর দশা কাটিয়ে ফেরার পর বাবাকে আমি শুধিয়েছি, বাবা, তুমি নাকি ইন্দ্রলোকে চন্দ্রলোকে ঘুরে বেড়াচ্ছিলে? দেখা হয়েছিল মহাদেবের সঙ্গে? মা দুর্গাকে দেখেছ? দশ হাত নিয়ে লটর-পটর করছে মা? দশ-দশটা হাত নিয়ে কিছু অসুবিধা হচ্ছে না ওঁর! ঘুমোত পারছেন? পাশ ফিরে শোন কি করে?
মা হাসতেন আমার কথায়।-বোকা ছেলে কোথাকার। মার কি চোখ ঝুঁজবার ফুরসত আছে একদণ্ড? বিশ্বজোড়া এত ছেলেমেয়ের দায়ভাবনা ঘাড়ে নিয়ে…? এক মুহূর্তের জন্যে তিনি চোখ বুজলেই আমাদের চক্ষুস্থির! মায় মহাদেব সমেত সবার!
বলো না বাবা, কী হয়েছিল তোমার ওই? সমাধি না কী?
আমার কী হুঁশ ছিল রে! আমি বাঁচতে বসেছিলাম।
তার মানে, তিনি মরতে বসেছিলেন তখন। বাবা বলতেন, মন্দ কথা কখনো মুখে আনতে নেই। মুখের কথা ফুলে যায় অনেক সময়। তাই মরতে বসে না বলে ঘুরিয়ে অমনি করে বলা ঐ কথাটা!
বাবার জবাবে ডাক্তারের জবানির সায় ছিল যেন… .
অর্ধাচ্ছন্ন অবস্থায় আমার মনে হতে লাগল, বাবার সেই রোগটাই ধরেছে বুঝি আজ আমায়। উত্তরাধিকার সূত্রে মার হাঁপানি যেমন নাকি আমার পাওনা হয়ে রয়েছে, মা বলেছেন, তেমনি সেই জন্মসূত্রেই বাবার সন্ন্যাসের এই দায় আমার ঘাড়ে এসে চাপল এখন। বাবা সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে গিয়ে যে-পাহাড়ে ব্যাধিটা তাঁর জটাজুটে বেঁধে নিয়ে এসেছিলেন, হিমালয়ে না গিয়েই, ঘরে বসেই সেটা অমনি আমার জুটে গেল বোধহয়–নিখরচার এই আমদানি।
সেই কোমাই ধরেছে, ধরতে যাচ্ছে বুঝি আমায়?
কোমা? কোমাটা কী? আধা বেহুঁশ অবস্থায় নিজেকেই আমি শুধাই।
কোমা মানে কোমা-আবার কী? আপনার থেকেই জবাব পাই। বাক্যরচনার গোড়ায়, প্রথম পদক্ষেপেই যিনি দেখা দেন–সেই কমা-ই একরকম আর কি? ডাক্তারি ব্যাকরণে ঐ কোমা। অর্থাৎ বাক্য সম্পূর্ণ হয়ে সমাপ্তির দাড়ি টানার আগে, স্থানে অস্থানে মাঝে মাঝেই যিনি দেখা দিয়ে থাকেন। লাইফ সেটেনসের মাঝ-মধ্যের হলটিং স্টেশন–যার শেষে কিনা সেই ডেথ। অনিবার্য ডেথ সেনটেন্স?
আমি কি তাহলে দাড়ি টানার আগে সেই কমাতেই এখন দাঁড়িয়ে আছি?
রিনি গরম দুধের ভাঁড়টা রুমালে জড়িয়ে ধরে আনল, চোখের কোণে দেখতে পেলাম।
দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি যখন, তাহলে এখনো আমি হতজ্ঞান হইনি একেবারে।
কমার লক্ষণ নেই এখনো–এখনো আমি বাড়ার দিকেই রয়েছি। তবে? তাহলে?
হাঁ করিয়ে চামচেটা দিয়ে একটু একটু করে খাইয়ে দে তো ওকে। বললেন উনি, কিন্তু বসবি কোথায়? বসে খাওয়াতে হবে যে। সোফায় তোকে ধরবে না তো? কী করে খাওয়াবি তবে? তাহলে এই চেয়ারটায় বস না হয়। বসে বসে খাওয়া।
চেয়ারে বসে অ্যাদূর থেকে হাত বাড়িয়ে কি খাওয়ানো যায় বাবা? বলে রিনি চেয়ারটাকে হটিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
