বাড়ি তো গিয়ে পৌঁছুই আগে। বাবার কাছে চাইবো। তিনিই মিটিয়ে দেবেন তখন।
মার কাছে চাইলেও পারিস।
মা? বাব্বা! মার সামনে এখন আমি এগুচ্ছি না সহজে। আমাকে দেখলে আর রক্ষে রাখবে না মা–কী যে আমার অদৃষ্টে, ভগবানই জানেন!
রক্ষে রাখবে না? জেলে যাওয়ার জন্যে বকবে বুঝি খুব?
শুধু জেল! কতো কী! সে তুমি কি বুঝবে তার! সে গুমরায়।
মাকে এড়িয়ে কতক্ষণ থাকবি? বাড়িতে মার সামনে না পড়ে থাকা যায় নাকি?
ঢাল দিয়ে যেমন তরোয়াল আটকায় না? তেমনি আমি বাবার আড়ালে আড়ালে থেকে মাকে ঠেকাবো।
আমার বরাতে ঠিক উলটোটাই। আমায় মার আড়াল দিয়ে বাবাকে ঠেকাতে হয়। বাবার মার এড়াতে মার আবডাল লাগে আমার।
বাবা খুব মারে বুঝি তোমায়?
বাঃ! মারে না? না মারলে তো বাবা কিসের! মারবার জন্যেই তো বাবারা জন্মেছে রে! বাবার এক এক চাপড়ে পাঁচ পাঁচ আঙ্গুলের দাগ বসে যায় আমার গায়ে। মা তখন কতো আহা আহা করে হাত বুলিয়ে রুজে দেয় জায়গাটা-তখন ডবোল আরাম। তাইতেই পুষিয়ে যায় আমার। মার খাবার ইচ্ছে করে আবার!
আমরা যখন বেরুলাম জেল থেকে, জেল-ফটকের ঘড়িতে তখন সাড়ে তিনটা দেখেছি। এতক্ষণে চারটে বেজেছে মনে হয়। এখান থেকে আহিরিটোলা তো কমখানি পথ নয়, বেতো ঘোড়ারা যেমন ঢিমে চলছে না, এমনি টিকিয়ে টিকিয়ে যেতে যেতে বাড়ি পৌঁছতে সাতটা বেজে যাবে নির্ঘাত। বাবা নীচে নেমে এসেছেন ততক্ষণে। তার চেম্বারে রুগীপত্তর আসতে শুরু করেছে। বসে বসে তিনি রুগী দেখছেন তখন, দেখব গিয়ে আমরা।
বৈঠকখানার ঘরে বসে রুগী দেখেন? মা সেখানে আসেন না কখনো?
নেহাত দরকার পড়লে আসেন, নচেৎ নয়। রিনি কয়ঃ বাবা ঘুম থেকে ওঠেন কাঁটায় কাঁটায় চারটেয়-শীত কি গ্রীষ্ম কী! চানটান সেরে চা-টা খেয়ে তৈরি হতে পাঁচটা বাজে তাঁর। সাড়ে পাঁচটায় তিনি নীচের চেম্বারে নেমে আসেন। হকার সেই ভোরেই স্টেটসম্যান দিয়ে যায়, পড়েন বসে বসে। তারপর রুগীরা সব আসতে থাকে একে একে। আশপাশেরই তো রুগী যত, পাড়ারই বেশির ভাগ। তাদের দেখেন। যে যা দেয় তাই নেন।
আর দুপুর বেলায় করেন কী? পড়ে পড়ে ঘুমোন বুঝি আমার বাবার মতন?
ঘুমুবেন বাবা? তবেই হয়েছে। ওঁর খালি কাজ আর কাজ। কাজ ছাড়া কথাটি নেই। এগারোটা না বাজতেই খেয়েদেয়ে ফের তিনি বেরিয়ে পড়েন-শহরতলীর কোথায় কোন এক জুটমিলে চলে যান। সেখানকার বাধা ডাক্তার তিনি। মাস গেলে সেখান থেকেও হাজার আড়াই আসে তাঁর। সেই জুটমিলের থেকেই।
তার ওপর এখানে সেখানে উপরি কল তো রয়েছেই। নেই কি রে? ঘরে বসে রুগী দেখে তার থেকেও তা পান আবার? মোটামুটি জোটে তাঁর বেশ, কী বলিস? আমার অনুযোগ।
তা তো জোটেই। তবে বাবার বেশির ভাগ আয় ঐ জুটের থেকেই।
আর ওই এধারে-ওপারে যা জুটে যায়। তাই বা কম কী রে?
ডাক্তারদের উপায় কি কম নাকি গো? সেইজন্যেই তো ডাক্তার হতে এত সাধছিলাম তোমায়!…এবার তুমি সেরে উঠে পড়াশুনায় মন দেবে তো, কেমন? দেশোদ্ধার তো হয়ে গেল! দেখলে তো সব। এবারটি নিজেকে উদ্ধার করতে লাগো এখন।
বাঃ, এ কী হোলো! দেশের জন্যে প্রাণ দিতে হয় না? দিয়েছি কী?
দিতে বসেছিলে প্রায়। বুদ্ধি করে তোমায় বাঁচিয়ে আনলাম-তাই না? দেশের জন্য একবার করলেই হোলো, ছেলেমেয়ে তো কম নেই এদেশে। তারা করুক এবার। দেশোদ্ধারে– কাজ তো ভাই একজনের নয়–সবাই মিলে করবার-তাই না? তাদের সবাইকে চা দাও এবার। দেশের কাজ করার সবাই সুযোগ পাক। নিজেই একলা দেশটাকে টেনে তুলবে, এমন স্বার্থপর হয়ো না গো!
আহিরোটোলা পৌঁছুতে সাতটা বাজলো প্রায়। রিনির বাবা চেম্বারে এসে বসেছেন তখন। একজন রোগীকে দেখছিলেন খুব যত্ন করে। রিনি গিয়ে বলল, বাবা, গোটা কয়েক টাকা দাও তো, গাড়িভাড়া মেটাবো।
রুগী দেখার ফাঁকে চোখ তুলে তাকালেন একবার, একটি কথাও না বলে টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিতে বললেন ইশারায়।
রুগীদের ফীসের টাকা টেবিলের ওপরে ছড়ানো পড়েছিল, তার থেকে নিয়ে রিনি বেরিয়ে গেল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম চুপটি করে।
রিনি ফিরে আসার আগেই সে রুগীটিও ফী দিয়ে চলে গেছে। আমি আর দাঁড়াতে পারছিলাম না। সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে আসছিল কেমন। সামনের সোফাটায় গিয়ে বসে পড়েছি।
রিনিও এলো, আমিও এলিয়ে পড়েছি সোফায়।
বাবা, রামদাকে একটু দেখবে? কী হয়েছে ওর! রিনি বলল, কদিন ধরেই ও ভুগছে বেজায়?
শোনা মাত্রই ওর বাবা উঠে এসে আমাকে দেখতে বসলেন। রিনি তাঁর চেয়ারটা সোফার কাছে টেনে এনে রাখলো।
প্রথমে আমার হাত নিয়ে নাড়িটা দেখলেন তিনি। তারপর বুকে স্টেথোসকোপ বসালেন, তারপর পিঠের দিকে…ওরই ভেত্র এক ফাঁকে রিনিকে বলেছেন-ছোট সিরিঞ্জটা ধো তো বেশ করে। টেবিলের থেকে আমার ব্যাগটা নিয়ে আয়।
বেহুঁশের মত হলেও আমি হুঁশ হারায়নি তখনো। প্রায় আচ্ছন্নের ন্যায় হয়েও, টের পাচ্ছিলাম সব। শুনতে পাচ্ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম বেশ।
উনি আমায় একটা ইনজেকসন দিলেন আর বললেন–তোর মাকে ডাক তো একবারটি। দুধ গরম করে আনতে বল চট করে।
মাকে এখন বিরক্ত করার দরকার কী বাবা? মোড়ে মেঠাইওলার দোকানে তো পাওয়া যায় গরম দুধ। আনব?
তাই আন না হয়। ভাঁড়ে করে আনবি তো? ভাঁড়টা গরম জলে ভালো করে ধুয়ে দিতে বলিস গোড়ায়।
