ঘুম আসছিল না কিছুতেই। শুয়ে শুয়ে ছটপট করছিলাম। জ্বরটা বেড়েছে। পেটের মধ্যে অসহ্য যন্ত্রনা। বুকের ভেতরেও কেমন যেন করছিল। হার্টফেল করবো নাকি আমি?
রিনি প্রায় মার মতই সেবা করছিল আমার। জলপটি লাগিয়েছিল কপালে। রুমাল নেড়ে হাওয়া করছিল সে। হাত বুলাচ্ছিল গায়ে। আর মাঝে মাঝে অযাচিতই সারা মুখে মুখ বুলিয়ে দিচ্ছিল–বলছিল উঃ! কী গরমই না হয়েছে গাটা তোমার। আজ রাতটা কাটলে হয়। কাল সকালেই আভারটেকিং দিয়ে চলে যাব আমরা এখান থেকে। এখানে থাকে কেউ? এই নরকে.এমন নরকযন্ত্রনায়? এখানে থাকলে মারা পড়বে তুমি। কী ড্যাম্পো জায়গাটা বাবা! ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, পথ্যি নেই, কিচ্ছু নেই এখানে। আমাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ফেললে আমার বাবা দুদিনে সারিয়ে দেবেন তোমায়–দেখো না।
এমনি সব আবোল-তাবোল কতো কী যে বলছিল–যেমন করে ছেলে ভোলায়, তেমনি করে আদর দিয়ে, সান্ত্বনা দিচ্ছিল সে আমাকে।
আমার তো নেই-ই, তার দুচোখেও ঘুম ছিল না। মাঝরাতে হঠাৎ সে উঠে বসলো চুপটি করে শুয়ে থাকো, আমি একটু বাইরে থেকে আসি। এক্ষুনি আসব।
এত রাত্তিরে বাইরে কেন রে?
একটু বাইরে যেতে হবে যে। এক্ষুনি আসব।
জলবিয়োগে বুঝি? বুঝেছি। শীতের রাত্তিরে এত বেশী করে জল খায় নাকি কেউ?–খেলেই এই ঝঞ্ঝাট। যা তবে।
গিয়েই তক্ষুনি সে ফিরে এল-না, গেলাম না আর।
তার মানে?
দেবেনদা বাইরে দাঁড়িয়ে। দেখেই চলে এলাম।
আর কেউ নেই এখন বাইরে?
না, সে একলাটি দাঁড়িয়ে…কেন কে জানে!
কী করছে সে ওখানে? চল দেখি তো। আমি তোর সঙ্গে যাচ্ছি, চ।
বাইরে গিয়ে দেখি তাই বটে। চুপ করে একলাটি দাঁড়িয়ে রয়েছে দেবেন। কেন, কে মানে। দেবেন, তুমি? এত রাত্রিরে একলা দাঁড়িয়ে কী করছে এখানে?
পাহারা দিচ্ছি ভাই!
কিসের পাহারা? শুনে আমার তাক লাগে। কাকে পাহারা দিচ্ছো আবার?
পাছে কেউ জেল থেকে না পালায়। আমাদেরকেই আগলাচ্ছি। পাহারা দিচ্ছি তোমাদের সবাইকেই।
কেন, জেলের পাহারা নেই? তারা সব গেল কোথায়?
কে জানে কোথায়! জেলের গেট খোলা, দেখছো না? সদর গেট খুলে রেখে পাহারাওলারা ঘুমুতে চলে গেছে সবাই। কেউ কোথাও নেই, দেখছ না?
দেখছি তো, কিন্তু কেন বল তো? জেলে তো পাহারার ভারী কড়াকড়ি থাকে শুনেছি– এখানে এমনটা কেন?
এখানকার সবই অদ্ভুত! ডিসপেনসারিতে ডাক্তার নেই, সদর দরজায় পাহারা নেই! রিনির টিপ্পনি।
কর্তারা ইচ্ছে করেই খুলে রেখেছেন। জেল থেকে পালিয়ে যাবার জন্যে সুবিধে করে দিচ্ছেন সবাইকে। পালাতে ওসকাচ্ছেন জেলের ছেলেদের। এত ছেলের ধাক্কা সামলাতে পারছেন না তাঁরা-জেলের এত খোরাক যোগাতেও হিমসিম খেতে হচ্ছে বোধ হয়। ফতুর হয়ে গেল সরকার। তাই এই ব্যবস্থা নিয়েছেন মনে হচ্ছে। যার খুশি সে না জানিয়ে চলে যাক না! কোথাও কোনো বাধা নেই।
দিনের বেলায় আন্ডারটেকিং দিয়েও তো চলে যাওয়া যায় শুনেছি। যেতে পারে না ছেলেরা?
যায় বইকি কেউ কেউ। কিন্তু কারো কারো চক্ষুলজ্জায় বাধে না কেমন? তাই রাত্তিরে পালায় তারা, তাদের জন্যেই আমি…আমরা…জেলের দাদারা পালা করে পাহারা দেবার ব্যবস্থা করেছেন। ওরা গেট খুলে রাখলে কী হবে, আমরা কাউকে ওই গেট পেরুতে দিচ্ছি না, পালাতে দেব না কারুকেই। এখন আমার পাহারা দেবার পালা কিনা।
তাই বুঝি! তা রিনির–মানে–রিন্টুর যে একটু বাইরে যাবার দরকার পড়েছিল। দিনভোর ঢক ঢক করে জল গিলেছে তো তার জলাঞ্জলি না দিলেই নয় এখন।
যাক্ না! গেট তো খোলাই আছে…সেরেই আসুক গে চটপট। আমরা তো এখানে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভয়টা কিসের।
না না, ভয় কিসের দেবেনদা। কোনো ভয় করছে না আমার।
গেট পেরিয়ে সে বেরিয়ে যায়-বাইরের আলো-আঁধারি দিকটায়।
খানিক বাদেই তার আর্তনাদ আসে-শিব্রামদা-শিব্রামদা…শিব্রামদা…চট করে এসো তো একবারটি।
দাঁড়াও, দেখে আসি তো কী হোলো আবার। সাপে কামড়ালো নাকি ছোঁড়াটাকে।
আশ্চর্য নয়! গঙ্গার এ-ধারটায় গর্তে গর্তে খানাখন্দে ভরতি-সাপ-খোপ বেজায়। কিন্তু আমি তো ভাই এখান থেকে নড়তে পারবো না এখন। সে বলে : দাদাদের কড়া হুকুম। তুমি গিয়ে দেখে এসো গে। যদি ধরে নিয়ে আসতে হয়, একলা না পারো, তখন আমায় ডেকো। আমি যাবো।
আমি বাইরে বেরুতেই রিনি আমার হাত চেপে ধরে-চলো, এখুনি পালাই এখান থেকে। কেউ কোথাও নেই। রাস্তায় একটা ছ্যাকরা গাড়িটাড়ি পাকড়ে বাড়ি চলে যাই সটান! :
সাপে কামড়ায়নি তো তোকে?
না গো! তোমাকে বের করে আনার জন্যেই ওই ফিকিরটা বার করলাম… আর দেরি করো না, এক মুহূর্ত নয়। দেবেনদার সন্দেহ হতে পারে।
জেল ভেঙে নয়, পাঁচিল টপকে নয়, কোনো বীরোচিত ভাবের ধারকাছ দিয়েও নয়কো, নিতান্তই কাপুরুষের ন্যায় সেই রাত্তিরেই জেলের থেকে পালালাম আমরা। বুক টান করে গিয়ে সেই আমাদের পিঠটান দেওয়া।
.
৫২.
ডক্ এরিয়া ছেড়ে খানিকটা এগুতেই একটা গলির টেরে খানকয়েক ছ্যাকরা গাড়িকে খাড়া দেখলাম। তারই একশো এগারো নম্বরের একখানাকে ভাড়া করে রিনি গিয়ে চেপে বসল আমায় নিয়ে।
ভাড়া তো করলি, কিন্তু মেটাবি কি করে? আমি বললাম পকেট ফাঁকা, গড়ের মাঠ। একটাও টাকা নেই আমার।
তোমার তো খালি টাকাই নেই, আমার যে একটা পয়সাও নেই গো!
তা হলে?
