দু দিনের ওষুধ ছিল বুঝি? বলিসনি তো আমায়?
প্রত্যহ তিন দাগ-তিন ঘন্টা বাদ বাদ। লিখে দেয়নি শিশির গায়ে?
শিশির দিকে নজর দিলাম কখন? শিশির-সম্পাতে কি নজর দেওয়া যায়–চোখের সামনে সমুদ্র উথলালে?
যাক, খেয়ে ভালোই করেছ বোধ হচ্ছে। জ্বরটা ছেড়ে গেছে তোমার ওই জন্যেই মনে হয়।
জ্বর নেই যে কি করে টের পেলি? তুই কি থার্মোমিটার?
বাঃ, এক্ষুনি আঁচ পেলাম না? গা তোমার গরম নয় গাল ঠেকিয়ে দেখলাম যে!
দেখলি তো! না আঁচালে বিশ্বাস হয় না। আঁচ নিলি বলেই না…কিন্তু বাপু যাই বল, কাজটা তোর ঠিক হহলো না। উচিত হয়নি। কাল রাত্তিরে আমার অজান্তে আমার প্রতি বিমুখতা করেছিস, আর আজ সকালে এমনি করে আমাকে তোর গাল দেওয়াটা…এই অপমান? যাক, এখনকার মত সয়ে গেলাম। দাবী আমার রয়েই গেল। পাওনা আমার মিটলো না কিন্তু।
যেতে দাও তো আমায়। ছাড়ো এখন লক্ষীটি! ওষুধটা নিয়ে আসি গে। দেরি করলে ভারী ভিড় জমে যাবে ডিসপেনসারিতে। ফিরবার পথে ফের তোমার খাবারটা–খিচুড়িভোগ–নিয়ে আসতে হবে না আবার? কী বলবো ডাক্তারবাবুকে? জ্বরটা সেরেছে কিন্তু কাশি হয়েছে। বেজায়? এই তো!
আমিও যাব তোর সঙ্গে আজ। আজ তো আমার জ্বর নেই আর। তবে যাবার বাধা কোথায়?
এসো তাহলে চটপট।
ডক–জেলখানাটার এক টেরে ডিসপেনসারি। ডাক্তারের হাবভাব মোটে নেই এমন এক কম্পাউন্ডার মার্কা ডাক্তার বসে ঘরটার একধারে। তাঁর সামনে জনাদশেক রুগী দাঁড়িয়ে
আর পাশের টেবিলে প্রকাণ্ড এক কাঁচের জার-ভর্তি রঙচঙে কী এক মিকশ্চার।
তিনি ব্যাজার মুখে রোগবৃত্তান্ত শুনছেন, আর জার থেকে ওষুধ ঢেলে দিচ্ছেন সবাইকে।–আর বলছেন-দুদিনের জন্য দেওয়া হল। প্রত্যহ নি দাগ খাবে। তিন ঘন্টা অন্তর। আসতে হবে দুদিন বাদে।
কারো সর্দি, কানো সর্দিকাশি, কারো জ্বর, কারো আমাশা, কারো সেটা রক্তঘটিত, কারো বা পেটের অসুখ–কিন্তু সবার জন্যে সেই এক দাবাই। কারো নাড়ি দেখা কি বুকে নল ঠেকানোর কোনো বালাই নেই।
কিন্তু আশ্চর্য, সেই ওষুধ খেয়েই জ্বর ছেড়েছে আমার। কাশিটাও আমার কমল। কিন্তু তার পরেই এসে হাজির হোলো গলা ব্যাথা আর পেটের অসুখ।
একি ওষুধ রে বাবা! একটা সারায় তো আরেকটা এসে পাকড়ায়। আমি তাজ্জব হই-বুক সারলো তো এদিকে পেট ছাড়লো!
ওষুধ খেয়ে হয়নি। অসুখের উচিত পথ্য তুমি পাচ্ছো কী?–খিচুড়ি কি রুগীর পথ্যি নাকি? তাই খেয়েই তোমার এই পেটের অসুখটা। আমি বলি কি, এসব যা তা না খেয়ে এর চেয়ে বরং উপোস করে থাকো আজ দিনটা। শুধু উপোস করলেও অনেক বোগ সেরে যায়, বাবা বলেন।
বারে! বলছিস মন্দ না! পেটেও কিছু পড়বে না, মুখেও কিছু পড়বে নানা খেয়ে খেয়ে শুকিয়ে মরি আর কি!
সত্যি বলতে, উপোস দিয়ে রোগকে পোষ মানানোর পক্ষে আমি নই। আমার মতে না খেয়ে বাঁচার চেয়ে গান্ডেপিন্ডে গিলে মরাটা ঢের ঢের ভাল–গন্ডের খাদ্য আর খাদ্যপিড যদি এক সঙ্গে মিলে যায়।
তাহলে অমন পেট ঠেসে না খেয়ে কম কম করে খাও বরং।
পরদিন আমার আমাশা দেখা দিল–তারপর সেটা দাঁড়াল রক্তামাশায়। তারপর দিন জ্বরটা ঘুরে এলো তার ওপর। আবার এলো কাশিবাসের ধকল।
রোজ ডিসপেনসারিতে যাই। সেই ডাক্তার-কাম-কম্পাউন্ডারকে সবিস্তার রোগ বৃত্তান্ত জানাই। সেই একই জারের একমাত্র দাবাই কয়েক মাত্রা করে পাই। তাই খাই তিন ঘন্টা বাদ বাদ। খেয়ে যাই ঘন্টায় ঘন্টায়। দুদিনের দাবাই একদিনে সাবাড় করি। আবার যাই পরদিন।
ওষুধ খেতেও তুমি কম ওস্তাদ নও বাপু! দশদিনের দিন ডিসপেনসারি থেকে দশম শিশিটি এনে রিনি বললে–ডাক্তারেরও তাক লেগে গেছে দাদা! বলছিলেন যে, কোন রোগই সারছে না, এত ওষুধ যাচ্ছে কোথায়?
সেদিন আমি ডিসপেনসারিতে যেতে পারিনি-কাহিল হয়ে শুয়ে ছিলাম নিজের বিছানায়। দশকমের রোগ এসে আমায় শুইয়ে দিয়েছিল।
এই দশ দিনেই এই দশা আমার! এত রোগ! কোনটাই সারছে না, সবগুলোই বাড়ছে। আর বিশদিন বাদে যখন তুই থাকবিনে, আরো কী দুর্দশা হবে আমার কে জানে!
কেন, থাকবো না কেন আমি?
তুই তো এক মাসেই খালাস! আমার যে দু মাস রে! ছাড়া পেয়ে তুই চলে যাবি আমার চোখের ওপর দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে…আমি এখানে একলাটি পড়ে থাকব বেঘোরে।
তুমিও কেন সেই সময়ে চলে এসো না আমার সঙ্গে? শুনেছি আপিসে গিয়ে আন্ডারটেকিং দিলেই ছেড়ে দেয়…ছেড়ে দিচ্ছেও…ছাড়াও পেয়েছে নাকি কেউ কেউ।
আমার আন্ডারটেকার কে হবে? কে আছে এখানে আমার? আমার কথায় সে হাসল-বালাই ষাট! আন্ডারটেকার কী গো! আভারটেকার কাকে বলে তুমি জানো? ক্রীশ্চান ইস্কুলে পড়ো নি তো, জানবে কি করে? আমি সেন্ট মেরিতে পড়ি, আমি জানি…
তুই সেন্ট মেরিতে পড়িস, বলিসনি তো আমায়? এদিকে আমি দিনের পর দিন বেথুন ইস্কুলের সামনে মাথা খুঁড়ে মরছি…আর ওদিকে তুই কি…হায় হায়, আমার এত খাটাখাটনি সব বৃথায় গেল!
আমিই তোমার হয়ে আন্ডারটেকিং দেব না হয়। তুমি অসুস্থ তো, আমিই তোমার গার্জেন এখন। তোমার ভাই না আমি? খাতায় লিখে দিয়েছি তাই।
আচ্ছা, তাই হবে। তাই হবে না হয়। কিন্তু এই একটা মাসই কাটাই কি করে? এই মাসটাই কি কাটবে আর আমার? কাটলে হয়।
কিন্তু আশ্চর্য, সারা মাসটা আমার এক রাত্তিরেই কেটে গেল সেদিন…কি করে যে! অত! সেই রাত্তিরেই আমার তামাম রাত কাবার হলো!
