আমি কিন্তু চাই যে, আমার হোক। মাঝেসাঝে এক-আধটু হক আমার…প্রতিভাবান না হতে পারি, ওই হাঁপানিবান তো হতে পারব। বিবেকানন্দর ছিল নাকি ওই হাঁপানি, আর রবি ঠাকুরেরও নাকি…
হোক গে, থাকুক গে, তোমার হয়ে কাজ নেইকো…
আমিও সেটা ভাবি একেক সময়। কাল রাত্তিরে যখন কাশির ধমকটা আসছিল না, ভাবলাম, ধরল বুঝি হাঁপানিতে আমাকেও, মার মতন আমিও গেলাম বুঝি! সম্ভাবনাটায় একটুখানি সুখ হলেও ঘাবড়ে গেছলাম বেজায়। কাশির ধমকের ওপর আবার যদি আমায় হাঁপানির ধমকানি খেতে হয়, তাহলেই আমার হয়েছে। আর দেখতে হবে না। বারোটা বেজে যাবে আমার।
সর্দিটা সারাও দেখি বাপু দয়া করে…
সর্দি কোথায়? সেরে গেছে তো। তার বদলে কাশিই আমার এখন…
মোটেই সারেনি তোমার সর্দি। বসে গেছে বুকে। কাশি হচ্ছে সেই জমাট সর্দিকে তোলবার জন্যে শরীরের স্বাভাবিক প্রয়াস। বুঝেছ? বাবার মুখে শোনা আমার। জানো?
ডাক্তারের মেয়ে হয়ে শোনা কথার বিদ্যে ফলাচ্ছিস যে ভারী! আমি ঠাট্টা করি– লেডি ডাক্তার হবার আগেই তোর এই ডাক্তারি!
ঐ হাঁ করে থাকাটা বন্ধ করে দেখি। হাঁ করে ঘুমোনোটা বন্ধ করো তত তোমার…জেলের দাদাটি কী বলে গেলেন কালকে? শুনলে না? কানে তুলছ সে কথাটা?
কানেই তোলা রয়েছে, নাকে নামানো যায়নি। নাক বোজা থাকলে, বোঝাই থাকলে, আমি তার কী করব? নাক কি আমার বাধ্য নাকি? মুখও অবাধ্য! নিতান্তই অবুজ আমার মুখ, কিন্তু নাক আমার বেশ বুজদার। বুঝেছিস?
সারারাতই কাল বুঝতে হয়েছে আমাকে। বুজুতে হয়েছে। যতবারই হাত দিয়ে তোমার মুখ বুজিয়ে দিয়েছি না, পরমুহূর্তের দেখি তুমি ফের হাঁ করে বসে রয়েছে।
কি বললি? আমার মুখে হাত চাপা দিচ্ছিলিস তুই? আমি ফোঁস করে উঠি।
একবার নাকি? যখনই আমার ঘুম ভেঙে গিয়ে দেখেছি যে, তুমি বদন ব্যাদান করে শুয়ে, তখনই আমি…কেন, টের পাওনি তুমি?
টের পেলে কি রক্ষে রাখতুম তোর? তোকে এই অযথা হস্তক্ষেপ করতে দিতুম নাকি?
অযথা?
অযথা নয়? দস্তুর মতন অনধিকার চর্চা, আমি বলব। হাত হচ্ছে হস্তগত করার জন্য–পরের কিংবা পরীর পাণিগ্রহণের হেতু। কারো মুখ হাতাবার জন্য হয়নিকো। আর ঐ মুখের সঙ্গে সব সময়ই মুখোমুখি হতে হয়।
হলেই বা কী! তুমি তো তখন ঘুমোচ্ছিলে গো! টের পেতে কী করে? বাজে বরবাদ যেত কেবল।
যেত যেত আমার যেত-তোর কী! সে আমি বুঝতুম। আমি বলি- তুই তো ভারী কেপ্লন রে! আমি যে কতো ঘুম ভেঙে উঠে, তুই অঘোরে ঘুমুচ্ছিস দেখে, অকাতরে, অপব্যয়ের কথা বিন্দুমাত্র বিবেচনা না করে না, মেয়েরা ভারী হিসেবী হয় বলে যে, তা মিথ্যে নয়।
এখন বুঝলে তো! এখন দয়া করে তোমার ওই মুখটিকেও বোঝাও। বোঝাও এবং বোজাও।
বুঝেছি। এখন আমার খেসারত চাই। আমার ওপর তোর এই অনধিকার হস্তক্ষেপের…
তুমি যে শেষমেস এদিকেই ঠেলে আনছো তোমার কথার ধরনে আগেই তা টের পেয়েছি। সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে! তুমি হাঁ করলেই আমি তার আঁচ পাই, তা জানো? তা খেসারত তুমি পাবে কিন্তু তার আগে তোমাকে মুখ বুজে থাকতে হবে, নাক দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে হবে পাঁচ ঘন্টা!
আবার ঘন্টা! পাঁচন খাওয়ার মত মুখখানা করে জানাই-প্রাণায়াম আমার ধাতে পোষায় না–অঙ্কের মতই অবিকল। বাবা আমায় ছোটবেলায় অনেক শিখিয়েছিল জানিস? অষ্টাঙ্গ যোগের নাম শুনেছিস কখনো?
যাদব চক্কোত্তির পাটিগণিত? পাটিগণিতের যোগ আর জানিনে!
শিব্রাম চকরবরতির খাঁটি অ-গণিত। যোগফোগ সব অঙ্কের ব্যাপার, আতঙ্কের ব্যাপার আমার আছে। পাটিগণিতের যোগের মতই বাবার ওই প্রাণায়ামযোগ করা সহজ নয়, দারুণ কষ্টসাধ্য কৃচ্ছসাধন। আমার দ্বারা হবার নয়। আমি অমনি পেলাম তো পেলাম, ঐ উসিতরসে…যা বলেছিলাম। উসিতরসে পেলাম–তর হয়ে গেলাম। নইলে অত কষ্ট করে যোগের অঙ্ক কষে আমার অঙ্কশায়িনীকে যদি পেতে হয় তো আমার তা চাইনে।
তোমার ভালোর জন্যেই বলেছিলাম। হাঁ-করা ছেলেদের কোনো মেয়েরা পছন্দ করে না তা জানো?
কোনো মেয়েদের চাইছে কে? আমি সেই মেয়েটির অপেক্ষায় থাকব, যে নাকি বেশ সমঝদার, যা বোজাবার-যা যা বোঝাবার-মুখে মুখে বোঝাতে পারবে আমায়। তোর মতই যে কিনা আমি-হাঁ করলেই তার আঁচ পাবে, আর আঁচ পেলেই আঁচাতে দেবে আমাকেও। খাবার পরেই না আচাবার কথা!
আঁচিয়ে কাজ নেই তাহলে। তুমি ওই ই-করাটাই প্র্যাকটিস করে যাও। ওর একটা ভালো দিকও আছে ভেবে দেখলে। নাকডাকা বরকে নিয়ে ঘর করা যায় না। হাঁ করে থাকলে তোমার নাক ডাকবে না। সেটা মন্দের ভালো। কানের পাশে সারা রাত নাক ডাকলে, ঘুমোনোর দয়া রফা!
হ্যাঁ, কথাটা তোর খাঁটি। কানের গোড়ায় নাকের ডাকাতি হলে ঘুমটাই মাটি। কান পাতাই দায় হবে, চোখের পাতা বুজবি কি, তবে সে ভাবনা তোর কিসের! তুই তো আমায় বিয়ে করতে যাচ্ছিসনে…।
আহা, নিজের কথাই ভাবছি নাকি আমি। যে তোমার বউ হবে গো তার কথাটাই ভাবছিলাম…তোমার নাক ডাকলে তাকে নাকাল হতে হবে না?
তার ভাবনা তোকে ভাবতে হবে না। সে কোনোদিন হবার নয়… এসব আলতু-ফালতু কথার আগড়ম-বাগড়ম আউড়ে আসল কথা তুই ভুলিয়ে দিতে পারবিনে। খেয়াল আছে। আমার–খেসারত চাই। চাই-ই। নইলে ছাড়ছি না।
আচ্ছা নাছোড়বান্দা তুমি! সে তার গালটা এনে আমার হা-এর ওপর রাখে। একটুক্ষণ।–হোলো তো? এখন যাই, তোমার ওষুধটা নিয়ে আসি গে চট করে। পাঁচ দাগ তো ফাঁক করেছে, দুদিনের ওষুধ একদিনেই খেয়ে বসে আছো দেখছি…
