এমনকি আমি যথার্থই জীবিত কি না আমার সন্দেহ হয় মাঝে মাঝে।
তবে আর কী হবে? নিশ্বাস ফেলে রিনিও-তা হলে আরেক দিন হত আবার! কিন্তু জন্মদিন না থাকলে আর…
মৃত্যু দিনটা আছে ঠিকই। সেই দিনটি পেছোনোর জন্য যমের দুয়ারে কাঁটা দিতে ভাইফোঁটায় তোদর বাড়ি যেতেই হবে আমায়।
তা ছাড়া যাবে না আর? কীসের জন্যে আবার? বোন যদি সংসারের গভীরে হারিয়েই গেল–তা সে সহোদর বোন হোক, আর সুরভিত উপবনই হোক-সে তো তখন বোনও নয় বন্ধুও নয় আর! তার জন্যে হন্যে হয়ে নিরুদ্দেশে গিয়ে লাভ? সেই কন্টকিত বন্ধুর পথে শ্বাপদসঙ্কুল বনস্পতিদের আওতায় সেই মহারণ্যে রোদন করতে যায় কে? তবে হ্যাঁ, তোর জন্মদিনগুলোয় যাব আমি নিশ্চয়ই, সেদিনটি আমার মনে গাঁথা রয়েছে, আমার মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত যাব, তুই নিশ্চিত থাক। খুব ভালো হয় যদি তোর জন্মদিন আর আমার মৃত্যুদিন একদিনেই আসে। তার চেয়ে ভালো বুঝি আর হয় না। আমার শেষ খাওয়াটা খেয়ে চলে যেতে পারি বেশ। বেশ খাওয়াটা খেয়ে চলে যাই শেষটায়!
৫. সকালে চোখ মেলতেই
৫১.
পরদিন সকালে চোখ মেলতেই কানে এল আমার–প্রথম প্রশ্নেই রিনির কুশল জিজ্ঞাসা, কেমন আছো গো? ভালো তো? সর্দিটা কমলো?
কমবে কি রে? আরো জমলো বরং। বুকটা কেমন ভার ভার ঠেকছে। আমি বলি-তার ওপর কাশি হয়েছে আবার। ভারী কেশেছি কাল সারা রাত। জানিস?
তাই নাকি?
এত কাঁসি বাজালাম তোর কানে গেল না? আচ্ছা ঘুম তো তোর! এরপর যখন সানাই শুনবি টের পাবি তখন।
কিসের সানাই? বিয়ের?
বিয়ের নয়, হাঁপানির। বুকে সর্দি জমলে, কাশি হলে, ব্রঙ্কাইটিস হয়ে গোড়ার সেই সর্দি হাঁপানি হয়ে দাঁড়ায় শেষটায়। জানিসনে?
না তো!
জানবি কি করে, তোর মা তো হাঁপায় না আর। হাঁপানি আছে আমার মার। আমি জানি। যখন তা হয় না, এমন সাই সাঁই আওয়াজ বেরোয়–ঠিক যেন সানাইয়ের মই। আমি জানাই : সারা বাড়ি গমগম করে আওয়াজে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। তিন চারদিন এমন ভোগায় যে, সে দৃশ্য চোখে দেখা যায় না রে! যার হয় তার যে কী করে কে জানে!
সারায় না কেন তোমার মা? ওষুধ নেই হাঁপানির?
এখন অব্দি বার হয়নি। ওষুধ খেয়ে একটু কমানো যায় কেবল। একবার হলে তিন চারদিন ভোগাবেই। ডাক্তার নলিনী সেনগুপ্তর একটা মিকশ্চার খেয়ে মা খুব উপকার পান। আর ডাক্তার বিধান রায় একবার আমার চিঠির জবাবে প্যালল বলে একটা ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন, হাঁপানি থেকে সেরে ওঠার পর সেটা খেলে, নিয়মিত খেয়ে গেলে অনেকদিন ধরে তিনি ভালো থাকেন বেশ।
খেলেই হয় তাহলে।
তা তো হয়। খায়ও তো মা। কিন্তু হাঁপানি যখন হবার ঠিক হবেই। কিছুতেই আটকানো যাবে না। দিন কয়েক হমু ভোগাবেই তোমাকে। আর তাতে যে ভোগ তারই শুধু কষ্ট না, যাদের সেই ভোগান্তি দেখতে হয়, তাদের কষ্টও কিছু কম নয়। অন্য ব্যারামের সঙ্গে হাঁপানির কী পার্থক্য তা জানিস?
কী?
আর সব রোগ হলে একেবারে শুইয়ে ফেলে, শুয়ে থাকা যায় মজা করে বেশ, কিন্তু হাঁপানির বেলায় সেটি হবার নয়। হাঁপানি এসেই তোকে বষিয়েদৈবে।
বসিয়ে দেবে?
হ্যাঁ, শোবার নামটি নেই। বসে বসে হাঁপাও দিন রাত। কী কষ্ট, কী কষ্ট! একটুও শুতে দেয় না রে–আগাগোড়া ঠায় বসিয়ে রাখে।
ভারী খারাপ হতো!
খারাপ বলে! শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে যা কষ্ট হয় না–যেন প্রতি মুহূর্তে দম আটকে আসে দমকে দমকে আসে হাঁপটা-হাঁপানির ধমকটা।
কখন আসবে হাঁপানির ঐ ধকম আগের থেকে কি তা টের পাওয়া যায় না একদম?
যায় বইকি। প্রথম একটু সর্দি হয়, সবারই যেমন হয়ে থাকে। হয়ে থাকে, ফের সেরে যায়–কিন্তু হাঁপানি রুগীর বেলায় সেটি হয় না। সেই সর্দি শুকিয়ে গিয়ে বুকে বসে হাঁপানির সুখটান হয়ে দাঁড়ায় শেষটায়।
সর্দি না হতে দিলেই তো হয় বাপু!
তা তো হয়। ডাক্তার রায়ের প্যাললটা বোধহয় সেইজন্যই দেওয়া। লাংস-এর প্রতিরোধ শক্তি বাড়িয়ে সর্দিটাকে আটকায় গোড়াতেই
তুমি বাপু সাবধান হও তো! বাবার মুখে শুনেছি, কতগুলো ব্যারাম আছে যা বাপ মার থেকে ছেলেমেয়েতে এসে বর্তায়–ঐ হাঁপানি তার ভেতর একটা-উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মতই।
জানি তো। মা-ই বলেছে আমায় যে, আমারও হতে পারে। হবে হয়ত বা। তবে একটা সান্ত্বনার দিকও আছে জানিস? হেঁপোরুগীরা অনেকদিন বাঁচে, দীর্ঘজীবী হয় নাকি!
কাজ নেই ছাই অমন দীর্ঘজীবী হয়ে-কষ্ট পেয়ে কষ্ট দিয়ে ওরকম বেঁচে সুখ?
মার ধারণায় ওটা একটা আধ্যাত্মিক অসুখ। যাদের কিনা আত্মার আকূতি থাকে …আকূতি মানে জানিস?
উঁহু। …আকূতি আবার কী? তুমি জানো?
জানি না ঠিক। আঁকুপাঁকু গোছের একটা হবে বোধ হয়। ইঁদুর কলে পড়লে যেমনটা হয়, কিংবা তোর জন্যে মাঝে মাঝে যেমনটা আমার হয় না?…
আত্মারই বলে কোনো পাত্তা নেই। তার আবার আঁকুপাঁকু।
মানুষ যা মনের থেকে চায় না? যখন পায় না, যারা নাকি তা পায় না–অনেকে না পেলে কিছু মনে করে না, ভূলে যায় এক সময়, কিন্তু যাদের নাকি মনের ভেতরে তা চাপা থাকে–যারা কিনা সেই না-পাওয়াটা অন্তরে অন্তরে ফীল করে, তাদেরই নাকি ঐ হাঁপানিতে ধরে ভাই! প্রতিভাবান আর সাধক মানুষদেরই বেশি হয় এই ব্যারামটা।
চাইনে আমার প্রতিভাবান হয়ে। প্রতিভা আর হাঁপানিকে সে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিতে চায়।
