আমার জায়গায় অসহায় রিনিকে আজ যদি পায় সে। অফসাইড থেকেই ওকে কর্নার করবে। আর সেই পাল্লায় এই আমাকেও কোণঠাসা করবে নির্ঘাত। রিনিকে নিয়ে একটা গোল না বাধিয়ে ছাড়বে না সে।
খিচুড়ি, পাঁউরুটি আর মিকশ্চারের শিশি হাতে হাসতে হাসতে ফিরল রিনি।
ও বাবা! বাঁচলাম। হাঁফ ছাড়লাম আমি-যা ভাবনায় পড়েছিলাম না।
এই জগাখিচুড়ির জন্য এত ভাবনা। সে প্লেটটা আমার সামনে রাখে নাও, ধরো, খাও। এখন বাঁচলে তো!
খিচুড়ির জন্যে ভাবছিলুম বুঝি! হা কপাল! জানতাম যে মেয়েরা বেশ বুঝদার হয়! কিন্তু তুই দেখছি তার অন্যথাই।
কী তাহলে ভাবছিলে এত শুনি?
ভাবছিলাম যে, দেবেনটা তোকে অফসাইডে পেয়ে সেখান থেকে পাসিয়ে ক্যারি করে কোথায় নিয়ে গিয়ে ফেলেছে কে জানে! সেন্টার ফরোয়ার্ড-এর খেলোয়াড় সে, বলছিল আমায়। যা ভাবনা হচ্ছিল আমার না!
দেবেন কোথায়? দেখতেই পেলাম না তাকে। সে এই ইন্দ্রলোকের ছদ্মবেশী কোনো দেবীকে নিয়ে কোন নন্দনবনে বিহার করছে এখন কে জানে!
বাঁচি তাহলে! আহা, তাই যেন হয়। তোর মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। কোনো দেবীর সঙ্গে যদি তার একটা হিল্লে হয়ে যায়, মনের মত মেয়ে নিয়ে ঘর বেঁধে সুখে ঘরকন্না করে–তার চেয়ে ভালো আর কিছুই হয় না। তারও, আমারও।
তা আমার জন্যে তোমার এত ভাবনা কিসের গো!
ভাবনা নেই? তুই বলিস কী রে! তুই-ই তো আমার একমাত্র ভাব আর একটি মাত্র ভাবনা।
ভাব হতে পারি, কিন্তু ভাবনা নয়। বোনের জন্য কেউ ভাবে কখনো? বোন আর কদ্দিন? কদ্দিন ভাব রইবে তার সঙ্গে? সে তো পরের জন্যেই, পরের বাড়ি যাবে, পর হয়ে যাবে–একদিন না একদিন! তার জন্যে কেউ ভাবে নাকি?…পরের জন্যেই জন্মেছে সে-পরই তো। এক কথায় আমায় সে ভাবনামুক্ত করতে চায়।
হ্যাঁ, মানি সে কথা। মায়ের পেটের বোন হলে তাই হয় বটে, কিন্তু পেটের না হয়ে প্রাণের বোন হয় যদি? তার জন্যে প্রাণ আইঢাই করে না? যখন পর হবে, যখন হবে তখন, কিন্তু তার আগে পর্যন্ত সে তো আর পর নয়–পরীই বটে…প্রাণের বোন, বুঝলি কি না, প্রাণের মতই-প্রাণ যখন যাবে তখন যাবে, কিন্তু তার আগে অবধি যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ!
আমার আশা রাখা কি আশায় থাকা তো উচিত নয় তোমার-সে কয়–তুমি আমায়– কোনোদিন বোনের চোখে দেখতে পারবে না দেখছি। ঠিক ঠিক বোনের মতন ভাবতে। পারবে না। তাকে বেশ ভাবিত দেখা যায়। এমন কি, বন্ধুর মত ভাবতে পারলেও বাঁচতাম।
বোন আর বন্ধুর মধ্যে তফাৎটা কী? কোনো তারতম্য আছে কিছু?
নেই? সব ভালোবাসাই কি এক নাকি?
এক নয়? একই রকমের তো সব। আমার তো তাই মনে হয়। যেমন কি না মায়ের প্রতি টান তেমনিই ওই ছেলেমেয়ের ওপর, যেমন বন্ধুর জন্যে মন কাঁদে, বোনের জন্যও তেমনটা। মন কেমন করার থেকে আদর করা পর্যন্ত–সবই তো প্রায় এক ধারার…এর ভেতর তারতম্যটা কোথায়? কেবল ই বউয়ের বেলাতেই যা একটু ইতরবিশেষ। সেই ইতরতম পর্বটা বাদ দিলে তো একই পার্বণ ভাই-একই মহোৎসব সব। …এমন কি, ওই ভগবানকেও যদি একান্ত আপনার করে পেতে চাই, কান্তভাবে ভজনা করি যদি…।
কথা হচ্ছে দাদা-বোনের সম্পর্ক নিয়ে তার মধ্যে এই সব গভীর তত্ত্ব আসছে কোত্থেকে? আমি বলি কি, বলছিলাম যে–দাদার অধিকারেরর সীমানাটা কোনখানে? তুমি তো জানো না ঠিক। দাদার দৌড় কদ্দূর?
আমি কী জানি তার। আমার কি নিজের বোন আছে যে জানব। আমার তো পরের বোন সব-পরীর মত হলেও তারা বোনের মতন…দূরের মাঠ যেমন আরও সবুজ, পরের বোন তেমনি আরো মধুর, গভীর, মায়াময়–সেই বোনান্তরালে কতো কী রহস্য আরো–কতো না আলো-আঁধারি–তার কিছু জানি, কিছু জানিনে!
এ তো গেল তোমার কাব্যকথা, আমার কথার ঠিক জবাব হোলো না তো!
মোল্লার দৌড় জানি মসজিদ পর্যন্ত, কিন্তু দাদার দৌড় কর তার আমি কী বলব! দিদিরাই জানেন! তুই-ই বলবি তো।
দাদার দৌড় বোনের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত–(যদ্দিন সে পরের না হয়–তদ্দিনই তার বোনের ওপর অধিকার) তার পর আর না।
বললেই হোলো! আমি ফোঁস করে উঠি : তার পর আমার বার্থরাইটটা চলে যাবে বুঝি? গেলেই হোলো?
যাবে না? তোমার কি আর আমার নিজের দাদাদেরই কি–আমার ওপর ওই বার্থরাইটটুকুই তো খালি। তার পরে বিয়ের পর আমার কপিরাইট অন্য লোকের হয়ে গেল না? যার কপিরাইট তারই অধিকার তখন।…কপিরাইট মানে জানো?
কেন জানব না? সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত। সে তো শুধু বইয়ের বেলাতেই রে।
বউয়ের বেলাতেও তাই। যার সেই রাইট আছে, বইয়ের মত, বউয়ের ও মুদ্রণের, প্রকাশের, যন্ত্রস্থ করার তারই অধিকার। সে যেমন খুশি ছাপাবে, বাঁধাবে, যেমন করে ইচ্ছে তার শো-কেসে সাজিয়ে রাখবে। অন্য কারো কিছুটি কওয়ার নেই।
না থাকে নাই থাকলো! সর্বসত্ত্ব চাইছে কে! আমসত্ত্ব আমার থাকলেই ঢের। মিষ্টি জিনিস পেলেই খুশী–চাইলেই যেমন আমি তা পাই–তাই হলেই হোলো। নিজের বোনকে আদর করার সেই আমার বার্থরাইট আমি ছাড়চিনে ভাই!
তা অবশ্যি থাকবে তোমার। বছরে দুদিন মাত্র–ভাইফোঁটার দিনটিতে আর আমার জন্মদিনে। আমার আর সব ভাইয়ের সঙ্গে তোমারও বাঁধা বরাদ্দ।… হ্যাঁ, আরেক দিনও হতে পারে, তোমার জন্মতিথিতে। ভালো কথা, তোমার জন্মদিনটা কবে গো?
জানিনে। আমার দীর্ঘ নিশ্বাস পড়ে-এবার আমি জন্মেছি কোথায়, জন্মালাম কবে। সত্যি বলতে আমি জন্মাইনি এখনো। এ জন্মে আর জন্মলাভ হল না আমার।
