তিনি কিন্তু বোঝাই করে যান–নাক দিয়ে নিশ্বাস নিলে হয় কী জানো? বাতাসটা নাকের গোড়ার শ্লৈষ্মিক ঝিল্লির ভেতর দিয়ে যাবার কালে পরিশোধিত হয়ে লাংসে গিয়ে পৌঁছয়-ঘুরপথে যাবার জন্যে একটু গরমও হয়ে যায় আবার। কিন্তু হাঁ করে নিলে, বিশেষ করে এই শীতকালটায়, বাতাস গরম হতে পায় না তো, সোজাসুজি বুকে গিয়ে সেঁধোয়-সরাসরি ঠাণ্ডা লাগিয়ে দেয়। ফলে এই সর্দি। তার ফলে এই নাক বোজা। তরুণ ঐ হাঁ করে থাকাটা। প্রতিফলে ফের আবার বুকে ওই ঠাণ্ডা লাগাটা-তার ফলে বুকে শ্লেষ্মা জমা হওয়া, তাই আবার নাকে এসে জমাট বাঁধা, তস্য ফল তোমার নাক বোঝাই, তার দরুণ তোমার ঐ হাঁ করে থাকা, পরিণামে ফের আবার ঠাণ্ডা লাগা-ফের আবার…সদি নাক বোঝাই, হাঁ করে থাকা, তার ফলে ফের তিনি হাঁকড়ে যান এক নাগাড়ে।–ফের আবার ঐ সর্দি লাগা…আবার ফের… বারম্বার সদির ফেরেববাজির তিনি ফিরিস্তি গান।
ফলতঃ এই পাকচক্র–যা আপনি বলতে চাইছেন। আমি বুঝতে পেরেছি।
তাঁর ওই কমপ্লেকস্ সেনটেনস, যা মোটামুটি আমার ডেথ পর্যন্ত গড়াতে পারত, এক কথায় সেরে দিয়ে তার সেই ডেথ সেনটেনসের হাত থেকে অব্যাহতি পাই। সেই বচ্চক্রের ব্যুহ ভেদ করে বেরুতে পারি।
যাক, যা হবার হয়ে গেছে। এখন ওষুধ খেতে হবে, যাতে আর না বাড়তে পারে। খোকা, তুমি আমার সঙ্গে এসো। জেলের ডাক্তারখানাটা কোথায় জানোনা বোধ হয়। দেখিয়ে দিচ্ছি আমি। ডাক্তারবাবুকে রোগের ব্যাপার খুলে বলবে। সীমটম সব বুঝিয়ে ওষুধ নিয়ে আসতে পারবে তো? মিকশ্চার ট্যাবলেট যা উনি দেন। আনলেই হবে না, নিয়মমত খাওয়াতে হবে। ন্যাসাল ডুপের মতন কিছু পাওয়া যায় কি না খোঁজ কোরো, তাই এ-নাকে এক ফোঁটা ওনাকে এক ফোঁটা দিলে তক্ষুনি সাফ হয়ে যায় নাক। শুপিয়ে সেটা ডাক্তারবাবুকে, কেমন?
নম্র খোকাটির মত তাঁর কথায় সায় দিয়ে রিনি তাঁর সঙ্গে যায়-যায়, এমন সময় জেলের সদর থেকে ঢনৎকারের আওয়াজ এলো। সব এলোমেলো হয়ে গেল সেই আওয়াজে।
রিনির ঢঙ দেখে হাঁ হয়েছিলাম, তার পরে এতক্ষণ ধরে ভদ্রলোকের মুখে বাতাসের নাসিক শহরে গতিবিধির পর্যটন কাহিনী শুনছিলাম হাঁ করে, কিন্তু সদরের এই ঢঙঢঙানি শোনার পর মনে হল, আমার ওই হাঁ করে থাকাটা রিনির ঢঙ দেখে নয় ঠিক, বা এই নাসিক অবরোধের দরুণ হাওয়া খাওয়ার হেতুও না, আসলে সকাল বেলাকার প্রাতরাশের প্রত্যাশাতেই।
কারণ নিজের গর্ভগৃহেও ঐ ঘন্টার প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল।
রিনিকে ডেকে বললাম, যাচ্ছিস যখন, লোহার প্লেটগুলোও নিয়ে যা। ওষুধ নিয়ে ফেরার পথে তখন তোর-আমার খাবারটাও নিয়ে আসবি ঐ সঙ্গে।
জ্বরের ওপর জেলের খাবার খাবে ও? রিনি ওঁকে শুধোয়।
এখানে সাবু বার্লি কোথায় পাবে! ঐ লপসিই খেতে হবে বাধ্য হয়ে। দ্যাখো, যদি পাঁউরুটি-টুটি পাও কিছু-খোঁজ নিয়ে হাসপাতালে।
তা তো আনবিই, আমি বলে দিই : কিন্তু ঐ সঙ্গে খিচুড়িটাও চাই আমার। খিচুড়ি দিয়ে আমি পাঁউরুটি খাবো।
তোমার খালি খাই খাই। খাওয়া ছাড়া আর কিছু শেখোনি তো! রিনি বলে তার কথার ভেতর কোনো গুহ কথার কিছু কি উহ্য থাকে?-বুঝলেন মশাই, আমার দাদাটি বিদ্যাসাগর মশায়ের আদর্শ একটি সুবোধ বালক–যাহা পায় তাহাই খায়। তার ওপর যাহা খাওয়া উচিত নয়, পেলে পরে তাহাও ছাড়ে না।
ভদ্রলোক তার জবাব শুনে হাসেন।–তাই বটে! জেলের লপসিকে বলছে কিনা খিচুড়ি! অখাদ্যও ওর কাছে খাদ্য।
না না! পাঁউরুটি পাই আর না পাই-খিচুড়ি আমার চাই। চাই-ই চাই।
আচ্ছা আচ্ছা! তাই হবে গোয় মাথা হেলিয়ে হেসে চলে যায় সে।
রিনি যাবার পর আমি ভাবনায় পড়লাম আবার। ফিরতে এত দেরি হচ্ছে কেন ওর? জেলের গেট আর আপিস তো সামনেই, ডিসপেনসারিটা আর কর হবে? এইটুকুন তো পথ! সামান্য ওষুধপথ্য নিয়ে ফিরে আসতে এত দেরি হয়?
দেবেনের খর্পরে পড়ল না তো?
যাবার পথে ভাবার কিছু ছিল না। দাদুজনোচিত দায়িত্ব নিয়ে জাঁদরেল গোছের যে কজনা দাদা জেলের মধ্যেকার ছেলেদের ওপর অযাচিত মোড়লী করতেন, তাঁদের একজনার সঙ্গেই গেছে সে। কাজেই মাঝখানে পড়ে হামলা করার সাহস হবে না দেবেনের।
কিন্তু সেখান থেকে একা ফেরার পথে রেহাই কোথায় তার? পাকড়াবেই তাকে সে-যে করেই হোক। নির্ঘাত।
সকাল থেকেই ওর রিনিদির ভাই রিনটুর জন্যে ও যে বাইরে ওত পেতে ছিল, সেকথা আমি হলফ করেই বলতে পারি। কিন্তু অভাবিত এক দাদার সাথে ওকে বেরুতে দেখে আগ বাড়িয়ে গা-পড়া হয়ে তখন না এলেও তাদের পিছু পিছু ফলো করেছে সে নিশ্চয়। (ছেলেদের কোনো মেয়ে বা মনের মত কাউকে এই ফলো করে যাওয়ার রহস্য আমার অজানা নয়, কলকাতার পথে আমিও কিছু কম যাইনি–যদিও ফলোদয় আমার ভাগ্যে কাঁচকলাই!) কিন্তু দেবেনের বরাতে অন্য রকম ফলার জুটতেও পারে। কী সুন্দর তার চেহারা! অমন ফলোয়র পেলে কোন্ অগ্রণী নায়িকাই না ফিরে তাকাবে, থমকে দাঁড়াবে ওর জন্যে? আঙুলের স্পর্শ থেকে আঙুরের অভ্যর্থনা নিয়ে তৈরি থাকবে না?
আর, যদি থমকি থেমে যাও পথ মাঝে/আমি চমকি চলে যাব আন কাজে-বলে সরে পড়ার পাত্রই নয় সে! রবিবাবুর নায়কের ন্যায় অমন লজ্জাকাতর নয় আদৌ।
আর কী খেলেয়াড় ছেলে সে, টের পেয়েছি প্রথম রাত্রেই। তাকের ওপর ফাঁকে পেয়ে যা ফাউল খেলছিল না। তার শটের চোটে পদাহত বলের মতন ফিল্ডের থেকে প্রায় পাস আউট হয়ে যাই আর কি! পড়তে পড়তে কোনোমতে আপনাকে সামলেছি!
