শুনে আমি চুপ করে থাকি, জবাবদিহির ভাষা খুঁজে পাই না।
রাগ কোরো না লক্ষ্মীটি! যাই আমি, ওষুধটা নিয়ে আসি গে তোমার। চুপটি করে শুয়ে থাকো ততক্ষণ। আমি যাব আর আসব।
না, আমিও তোর সঙ্গে যাব তাহলে ডিসপেনসারিতে।
না। তোমার গিয়ে কাজ নেই। নড়াচড়ায় জ্বরটা বাড়বে। বাবা বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জায় কমপ্লিট রেস্ট। আমি তোমার সিষ্ট বলে ওষুধ আনতে পারব। ডাক্তারের মেয়ে না আমি? ওষুধ চিনি।
কিন্তু ওই দেবেনটা যে ওত পেতে আছে ওখানে…
দেবেন মোটেই ওখানে বসে নেই। ছেলেরা ছটফটে হয়–জানো না? দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এক জায়গায়? কোথায় চলে গেছে এতক্ষণ। দেবেনের সঙ্গে আমি মিশব না, তাকে আমার সঙ্গে মিশতে দেব না কথা দিচ্ছি, গায়ে পড়ে মিশতে এলেও আমি পাশ কাটিয়ে চলে যাবো তক্ষুনি।
বেশ, যা তুই। কিন্তু যদি সে এই ফাঁকে একটুখানিও মিশে নেয়, আমার কত ক্ষতি হবে যে…! সেই ক্ষতিপূরণ কে দেবে আমায়? সেই ক্ষতিপূরণটা দিয়ে যা তুই তা হলে।
পরে দেব। রাত্তিরে। মাঝ রাত্তিরে সবাই ঘুমোবার পর–সেই কালকের মতন…
না। এখন। আগাম চাই। বেশি না, মোটমাট পাঁচটা। তা না হলে ছাড়ব না…
চার দিকে সবাই তাকিয়ে রয়েছে দেখেছো? এর ভেতর মেয়েরাও সব রয়েছে…বেশি বেশি নজর দিচ্ছে তারাই…না, তুমি যতই বলল, তাদের সামনে নিজের মান আমি খোয়াতে পারব না। কিছুতেই না। তারা কী ভাববে বলো তো!
তবে তোর ভাবনা নিয়েই তুই থাক্। ওষুধ আনতে গিয়ে কাজ নেই তোর। শান্তিতে মরতে দে আমায়।।
আচ্ছা চুমোখোড়ের পাল্লায় পড়লাম তো! কী মুশকিলেই যে পড়েছি…
বয়সে বড়ো একজনা যাচ্ছিলেন আমাদের তাকের পাশ দিয়ে। রিনির কথায় থমকে দাঁড়ালেন-কী হয়েছে? কী মুশকিল! কিসের মুশকিল শুনি?
দেখুন না, কাল রাত্তিরে ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হয়েছে দাদার, জেলের হাসপাতালে গিয়ে ওষুধটা নিয়ে আসব, কিছুতেই দিচ্ছে না আমাকে…বলছে, তুই থাক এখানে। এদিকে দেখুন! দাদার গাটা কী গরম হয়েছে যে!…
বলে সে তার গালটা আমার কপালের ওপর এনে রাখল–ইস্! পুড়ে যাচ্ছে আমার মুখখানা! কী গরম!
তারপর কপালীটোলার থেকে নেমে তার মুখ আমার গালের ওপর এসে থামল, ইস্ট। গালুডি স্টেশন থেকে গালুডি ওয়েটে চলে গেল সটান-মাঝখানের মধুপুর জংশন ছুঁয়ে ছুঁয়ে জানান দিয়ে–একবার নয়, এমনি পাঁচবার।
রেলওয়ে ভূগোলে এমনটা ঠিক না মিললেও সেদিনের গণ্ডগোলে কেমন করে যেন মিলেছিল? ভেবে এখন অবাক হই।
যে নাকি এতক্ষণ ধরে এত ওজর করছিল, এতজনের নজরের পরোয়া ছিল যার, সেই কিনা এখন প্রায় এক দাদুতুল্য লোকের চোখের ওপর অকাতরে অম্লানবদনে…এক লহমার এক ম্যাজিক দেখিয়ে দিল যেন!
আশ্চর্য এক ভেলকি খেলাই দেখলাম।
.
৫০.
এত ঢঙও জানে মেয়েরা!
যদিও তখন অব্দি রিনিই আমার কাছে অদ্বিতীয়, তার বাইরে দ্বিতীয় কোনো মেয়ের দেখা আমি তখনো পাইনি, তবুও এই চকিতদর্শনেই চরাচরের তাবৎ মেয়ের সাক্ষাৎ আমি পেয়ে যাই। এই রিনির এই চাল থেইে দুনিয়ার সব মেয়ের হাঁড়ির খবর মিলে যায় আমার। তাদের সহজাত স্বয়ংসিদ্ধির সংবাদটাও অবিদিত থাকে না।
রিনির যে কাণ্ডে আমি থ, থই পাচ্ছিনে, সেই দৃশ্য দেখেও নেতৃস্থানীয় ঐ দাদাটি কিন্তু অবিচলিত। তাঁর মুখে কোনো বিকার দেখলাম না। আশেপাশের কেউ কোনো ক্ষেপ করেছে, তা আমি দেখতে পেলাম না। সেদিকে আমার চোখই ছিল না আদপে। দাদাটি আমার কপালে হাত ছোঁয়ান-হ্যাঁ, একটুখানি গা গরম হয়েছে বটে। এমন কিছু নয়। ঠাণ্ডা লেগে সর্দি হয়েছে-সর্দির জন্যই এটা হবে।…নাক টানো তো!
কার নাক? আমি জিগ্যেস করি।
হাত বাড়িয়েও গুটিয়ে নিতে হয়।
ওর নাকটা ধরে টানতে বলছেন আমাকে?
ওর কেন, তোমার নিজের নাক নেই?
তা তো আছে। বলে আমি চুপ মেরে যাই। নিজের নাক-কান ধরে খামোখা টানাটানি করতে যাব কেন আমি ভেবে পাই না। তাছাড়া, ব্যাপারটা পছন্দসই বলেও বোধ হয় না আমার। নিজের কান কিংবা ঐ নাকই হোলো-টেনে কি কেউ কখনো আরাম পায়?
কি করে নাক টানতে হয় জানো না বুঝি? গলাখাঁকারির মত তিনি নাক খাঁকারি করে দেখান–এমনি করে টানতে হয়।
বুঝেচি। আপনি নাক ঝাড়তে বলছেন।
ওঁর অনুকরণের প্রয়াস পাই কিন্তু নাক আমার ডাকে সাড়া দেয় না।-ঝাড়া যাচ্ছে না যে, কী করব? নিরুপায় হয়ে কই- নিশ্বাস ফেলতে পারছি না, ঝাড়ব কি করে?
নিশ্বাস নিতে পারছ না, বলছ কী হে? তিনি বিস্মিত হন–বেঁচে আছে কী করে?
হাঁ করে। আমি জানাই-নাক বোজা আমার, সর্দিতে বোঝাই। মুখ দিয়ে তাই নিতে হচ্ছে নিশ্বাস-বাধ্য হয়েই। হাওয়া খাচ্ছি একরকম–বলতে পারেন।
এখন ধরতে পারলাম। ঐটেই হচ্ছে তোমার ব্যায়রাম। ওই হাঁ করে থাকাটা। মুখ বুজে থাকতে হয় সব সময়-বুঝেছ? মুখ হচ্ছে খাবার জন্যে-খাবার খাতিরেই শুধু যা ঐ হাঁ করবে, তা ছাড়া নয়। (তাঁর কথায় বাধা দিয়ে বলার ইচ্ছে হয়েছিল, বহুৎ খাদ্য আবার মুখ বুজেও খেতে হয় মশাই। কিন্তু গুরুজন না হলেও লোকটা দাদুস্থানীয় আর বেশ গুরুগম্ভীর–তাই কোনো উচ্চবাচ্য করি না। মুক্তকণ্ঠে তিনি কন- আর নিশ্বাস-প্রশ্বাসের জন্যে রয়েছে নাক-বিধাতার ব্যবস্থায়। বিধাতাই বলল আর প্রকৃতিই কও, তার অন্যথা করলে অসুখে পড়তে হবে বই কি।
আমি কোনো জবাব দিই না, চুপ করে থাকি। সর্দির জন্যই নাক বোজা না নাক বোজায় হেতুই এই সর্দি-বোঝা আমার পক্ষে সহজ হয় না।
