আমি চাইলেই তারা চাইবে কেন ভাব করতে-ভূতের মতো চেহারা এই আমার সঙ্গে মিশতে কেন যাবে? আমি নিশ্বস ফেলি-আমার সঙ্গে কোনো মেয়েই মিশতে চায় না–এমন কি তোর দিদিও নয়।
মেয়েরা চেহারায় ভোলে না গো। মন বুঝে মেশে। যার সঙ্গে মনের খাপ খায় তার সঙ্গেই মেশে তারা, বুঝেছ? তার সঙ্গেই ঘর বাঁধে গিয়ে শেষটায়।
অতত মন বোঝাবুঝির গরজ নেই আমার। একে তো মেয়েদের মন বোঝাই যায় না লোকে বলে! বইয়েও লেখে তাই। এখন নতুন করে মেয়ের মন বুঝতে যাবার সময় নেই আমার! কষ্টেসৃষ্টে যে একজনের একটুখানি বুঝতে পেরেছি তাই বজায় রাখতে পারলেই বাঁচি! ও! বুঝতে পেরেছি। আমি এদিকে নতুন মন বোঝার চেষ্টায় হয়রান হই গে, আর তুমি ওদিকে দেবেনের সঙ্গে গিয়ে ভাব জমাও! না বাবা, সেটি হচ্ছে না। গাছের ফলে হাত বাড়াতে গিয়ে হাতেরটা আমি খোয়াতে চাই না।
ঘাবড়াচ্ছো কেন তো? আমি তো হাতের পাঁচ, হাতেই আছি যাচ্ছি কোথায়? যেমন তলারটা কুড়োবে তেমনি গাছেরটা পেলে আরো ঢের মজা না? তাছাড়া, তারা প্রত্যেকেই খুব সুন্দর–আমার চেয়েও। দুরণ সুন্দর সব! দেখো তুমি।
সুন্দর না ছাই। আমি কারো সঙ্গে আলাপ করতে চাইনে। দেখতেও না।
মেয়ে যে তা তুমি টের না পেলেও, সুন্দর যে সেটা দেখলেই মালুম হবে-ওই ছেলে সেজে থাকলেও। ওই তো একজনা ওধারে দাঁড়িয়ে প্যাট প্যাট করে তাকিয়ে রয়েছে এই দিকে–আমাদের দিকে নজর দিচ্ছে, চেয়ে দ্যাখো না! . আমার দরকার নেই দেখবার। সেদিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিই আমি–একটি যে আমার আছে তাই বেঁচে বর্তে থাকলেই ঢের, তার বেশি আমি চাইনে। তুই ওদেরকে দেবেনের সঙ্গে ভাব করিয়ে দে বরং, দেখিয়ে দে দেবেনকে। যা শত্রু পরে পরে…ওদের ওপর দিয়েই ফাঁড়াটা কেটে যাক আমার।
আমার দরকার করবে না দেখাবার। দেখবার হলে তারাই নিজেরাই ঠিক দেখে নেবে। বলে সে নিশ্বাস ফেলে-ভালোই করেছিলাম তোমার, আরো আরো মেয়ের সঙ্গে ভাব করিয়ে দিচ্ছিলাম কেমন। বোনের কাজ, বন্ধুর কাজই করছিলাম। অনেকের সঙ্গে আলাপ হলে তুমি নিজের মনের মতনটিকে খুঁজে পেতে তার ভেতরে…সুখী হতে পারতে হয়ত একদিন…
আবার সেই এক কথা! বলছিনে সুখী হবার আমার দরকার নেই। এই বলে ভুলিয়ে তুই যদি আমায় ছেড়ে যেতে চাস, তোকে অতত করে বোঝাতে হবে না, এমনিই সোজাসুজি চলে যা। আমার ঘাড়ে আর কাউকে গছিয়ে দিয়ে যেতে হবে না। আমিও নিশ্বাস ফেলি-তোকে না পাই না-ই পাবো, আর কাউকে আমি চাইবো না। চাইও না। কক্ষনো নয়।
আমি ঠিক তোমার মনের মতটি নই, আমি জানি কিন্তু তুমি তা জানো কি? এখন না জানলেও আর সবার সঙ্গে মিশলে তুলনায় জানতে পারতে তখন। জানো, আমাকে চাইলে পরে অনেক কষ্ট পেতে হবে তোমায়। আমায় নিয়ে বৃহৎ দুঃখ আছে তোমার বরাতে–অনেক ভোগাভি জীবনে…
আমি জীবনের মত চেয়েছি কি? তুই তো বোনের মই হতে চেয়েছিস–তাহলে আর দুঃখটা কোথায়? বোনরা কি কষ্ট দেয়? বন্ধুর মত পেলেই আমার ঢের।
সেভাবে পেতে হলেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে তোমাকে। আমার মনের মতটি হতে হবে তোমায়। বন্ধুরাও বেশ কষ্টদায়ক হয়-তা জানো? যে বন্ধু তোমার সত্যিকার ভালো চাইবে, সে তোমায় দুঃখ না দিয়ে পারবে না। আমার বন্ধু হতে হলে গোড়াতেই তোমায় আলসেমি ছাড়তে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, পরের প্রত্যাশায় থাকলে চলবে না, আমি মোটেই অপরের প্রত্যাশায় নেই। পরের কারো কাছে কিছু প্রত্যাশা করিনে, যদি করি তো কোনো পরীর…
কথা ঘোরালে চলবে না। একটু আগেই তুলসীদাসী দোঁহা আউড়ে কতো কী গেয়েছে, ভুলে গেলে এর মধ্যে? তুমি পরের ভরসাতেই থাকো কি ঐ পরাৎপরের ভরসাই রাখো, ফল একই। তোমার ভবিষ্যৎ ফর্সা। স্বখাত সলিলে ডুবে মরলে জগন্মাতাও দশ হাতে তোমায় টেনে তুলতে পারবে না। কোমর বেঁধে তাঁর শরণ নিয়েই যদি ডোবো, তাহলেও নয়।
জগন্মাতা তার আগেই বাঁচাবেন আমায়, নির্ঘাৎ জানি। খাত কাটতেই দেবেন না আমাকে। স্বখাত হলে তবে তো সলিল জমবে, ডুবে মরতে হবে? সেই খাল কেটে কুমীর আনতে আমায় দিচ্ছে কে? আমি কই : তাহলে তুই গাইতিস কেন চাঁচলে–নিশিদিন ভরসা রাখিস/ওরে মন হবেই হবে/যদি তুই পণ করে থাকিস/সে পণ তোর রবেই রবে। গাইতিস কেন তাহলে?
ওসব হচ্ছে ভাবের কথা-কাব্যে গানেই শোভা পায়। উচ্চ কথারা যতো তুচ্ছ কথাই। অভাবের মুখে পড়লে কোথায় যে এ সব তত্ত্ব উড়ে যায় তার পাত্তাই মেলে না।
এত সব তুই শিখলি কি করে? কোত্থেকে? ভারী যে পাকা পাকা বুলি ঝাড়ছিস?
মেয়েরা অনেক কিছুই জানে, মনেতে চেপে রাখে, মুখের বাইরে আনে না। সব সময় তাদের চোখ কান খোলা থাকে তা জানো? চারদিকে নজর রাখে, দেখে শিখতে পারে তারা। ছেলেদের সেখানে ঠেকে ঠেকে শিখতে হয়। ঠকে ঠকে শেখে তারা। তাই বলছিলাম, যদি জীবনে কোথাও ঠেকতে না চাও, ঠকতে না চাও তাহলে আগে নিজেকে মানুষ করে গড়ো, তারপর অপরকে মানুষ করো, দেশের সেবায় লাগো।
কি রকম মানুষ হতে বলছিস তুই? কার মতন মানুষ?
কেন, ঐ সুভাষ বোস, কি ঐ দেশবন্ধু! আগে হয়েছে, পেয়েছে–তারপরে দিয়েছে, বিলিয়েছে। তোমার কোনো কিছু পুঁজি নেই-না স্বাস্থ্য না অর্থ না বিদ্যে–এই দুআনার মানুষ হয়ে তুমি দুঃখ পাবে, দুঃখ দেবে, দুঃখ বাড়াবে পৃথিবীর। ষোলো আনা হয়নি যে, নেই যার, সে কি ষোলো আনা দিতে পারে? এই ভাবে চললে দেখো তোমার হাড়ির হাল হবে একদিন। তোমার দুঃখে দেশের শেয়ালকুকুর কাঁদবে।
