মার কাছে শোনা তুলসীদাসের দোঁহার গাওয়া আমার!
তার মানে?
যে যার শরণ নেয়, সেই তার লজ্জা বাঁচায়, রক্ষা করে। মাছরা সব নদীর আশ্রিত তো? তারা বিপরীত স্রোত কাটিয়েও অনায়াসে কেমন উতরে যায়। কিন্তু মহাশক্তিধর মদমত্ত ঐরাবতও স্রোতের মুখে পড়ে কুটোর মতন কোথায় যে ভেসে যান তার হদিশ মেলে না। তেমনি কেউ যদি ঠিক ঠিক ভগবানের প্রত্যাশায় থাকে সে কখনো ভেসে যায় না, বুঝলি?
ভেসেও যায় না, ডুবেও যায় না হয়ত সে ঠিকই, কিন্তু তার ঐ ভেসে থাকাটাই সার হয়। নাই বা সে তুলালেলা, কোনোদিন সে কোথাও পৌঁছতেও পারে না কখনো, তাও ঠিক। তুমি কি ফকির বৈরাগী ভিখিরিদের দ্যাখোনি, খালি ভগবানের প্রত্যাশায় হাঁ করে বসে থেকে কী দশা হয়েছে তাদের?
দেখব না কেন? মামাকেই দেখেছি আমার। ভালো চাকরি করতেন, কোন্ সদাগরী আপিসে, সুখদেব না দুখদেব কোন্ এক গুরুর পাল্লায় পড়ে চাকরি-বাকরি ছেড়েছুঁড়ে হরিনাম কীর্তনে মজেছেন, আর সেই গুরুদেবটা তাদের আশ্রমে চাকরের মত খাটাচ্ছে তাঁকে-তার মতন আরো সব শিষ্যদের বিনা বেতনের খানসামাগিরিতে। কী দুর্দশা যে তাদের কী বলব! মামাকে আমি বলেছিলাম, কৃষ্ণকে ভজে আর গুরুসেবায় মজে তোমার এ কী হাল হোলো মামা। মামা আবার তাঁর সাফাই গান–যে করে আমার আশাকরি তার সর্বনাশ ॥ তবু যদি না ছাড়ে আগ/হই আমি তার দাসের দাস।
তাতে লাভ? কী এল গেল আমার?
তাই তো বলে কে? আমারই বা দাস হবার দরকার কী তাঁর, আর তাঁকেই বা দাসের দাস বানিয়ে কী চতুর্বর্গ লাভ আমার? তোর কথাটা যে মিথ্যে তা আমি বলিনে! তবে আমি ভগবানের ভরসা করিনে রে। ভগবানের দ্বারা কারো কখনো কিছু ভালো হতে আমি দেখিনি। তাঁর কাছে হাজার প্রার্থনাতেও কচু হয়। আমি তাঁরই প্রত্যাশা করি ভাই, সবাই যাঁর প্রত্যাশায়, এমন কি ঐ ভগবানও, স্বয়ং শিবও যার দুয়ারে ভিখারী।
কার?
আমার মার। আমীর মা, তোর মা, আমার মারও মা সবার মা, সারা বিশ্বের মা বিশ্বজননীর। তাঁকে ডেকে কেউ কখনো ভিখিরী হয়ে যায় না, না চাইলেও তিনি তোর দুহাতের মুঠো ভরে দেবেন মুহুর্মুহু দশ দিক থেকে দশ হাতে। তাঁরই ভরসা করি আমি। করবও চিরকাল।
আমার বাবা কী বলেন জানো? ভগবানকে ডাকো–তাঁর কাছেও চাও, আবার সেই সঙ্গে তোমার প্রাণপণ চেষ্টাও চালাও-দুইই চালিয়ে যাও–তবেই হবে তোমার। কে একজন জেনারেলও এই কথা বলে গেছেন নাকি। প্রে টু গড বাট কীপ ইওর পাউডার ড্রাই–যদি যুদ্ধে জিততে চাও। সংসার-সগ্রামেও ঠিক সেই কথাই।
তোর কথাটা মিথ্যে না, তোর বাবার কথাও সত্যি। জেনারালি কথাটা খাটে কিন্তু সব কিছুরই ব্যতিক্রম আছে না? সত্যকে যা প্রমাণ করে? আমি আমার মার কথাটাই মানব। কথাটা আমার মনের মত।
তার মানে, কথাটায় তোমার কুঁড়েমির সায় পাও কিনা। মোটেই খাটতে চাও না তুমি। তোমার মা-ই তোমার মাথা খেয়েছেন বুঝতে পারছি।
আর আমার মা কী বলে জানিস? তুই-ই আমার মুভুটা চিবিয়ে খেয়েছিস। বখিয়েছিস আমাকে।
সবার মা-ই সেই রকম বলে। সব মা-ই একরকম। তাঁরা নিজের ছেলেমেয়েদের কোনো দোষ দেখতে পান না, বিশ্বাস করেন না–পরের ছেলেমেয়েদের দায়ী করেন তার জন্যে। জানি আমি।… বেশ তো, তোমার মার কথাটাই মানো না।.সেই বিশ্বমায়ের ওপর ভরসা রেখেই ছেড়ে দাও আমাকে। তোমার ওষুধটা নিয়ে আসিগে। ভয়টা কিসের? তিনিই দশ হাতে আমাকে সামলাবেন-দেবেন-টেবেন সবার খর্পর থেকে বাঁচিয়ে, তোমার হাতে তুলে দেবেন শেষ পর্যন্ত।
তা তুই যা-ই বল, তোর কথায় আমি ভুলছিনে। ছাড়ছিনে তোকে। তুই এখানে থাক–আমার কাছটিতে বসে। মার কথা মতন আমি সেই মার ভরসাতেই থাকি বরং, দ্যাখ তুই, আমি বিনা চিকিৎসায় কোনো অষুধ-বিষুধ না খেয়েই সেরে উঠছি কিনা। তাহলে তো তখন বিশ্বাস হবে তোর?
নেচারেও সারে। সারে নাকি? বাবা বলেন, ন্যাচারালিও সারা যায়, কিন্তু ভুগতে হয়। ওষুধ থাকতে অকারণে ভোগবার দরকারটা কি?
মাই বল, আর নেচারই বল, তার ভরসার থেকে বরং নাচার হবো, তবু কারো ভরসাতেই আমি তোক ছাড়তে পারব না। আমি জানি, দেবেনটা তোর জন্যে ওত পেতে আছে বাইরে। হাড়ে হাড়ে শয়তান। তাকে আমি চিনিনে!
সব ছেলেই তোমার মতন নয়। উদার মন অনেকের। কেন, অন্য ছেলের সঙ্গে মিশলে কি আমি ক্ষয়ে যাবো নাকি? কই, আমি তো তোমার মতন নই। তুমি অন্য মেয়ের সঙ্গে মিশলে আমার তো কোনো রাগ হয় না, মনের কোণেও কোনো সন্দেহ জাগে না, হিংসে কর না মোটে।
মিশব যে, মেয়েটা কোথায়? তাহলে প্রমাণ পাওয়া যেত তোর কথার। হাতে হাতে বাজিয়ে দেখতাম।
মিশতে চাও তুমি?
মেয়ে কোথায় এই জেলে? আছে এখানে কোনো মেয়ে!
আছে বইকি। আমার মতই আছে কত। তোমারা ধরতে পারবে না। আমাদের চোখে ধরা পড়বে। ধরতে পেরেছি আমি কজনাকে। তারাও আমায় ঠাউরে নিয়েছে ঠিক।
বলিস কি রে? এখানে…আমি জানতে চাই–এসেছে কেন তারা?…দেশের জন্যে? নাকি, বন্ধুদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার নেশায়?
তারাই জানে! তবে তুমি যে বলো ওই ব্যক্তি স্বাধীনতা সবাই চায়, এমন কি ঐ মেয়েরাও। কেন, মেয়েরা কি ব্যক্তি নয়?
কে বলে নয়? তুই তো রীতিমতই এক অভিব্যক্তি।
আবার এমনও হতে পারে, বাড়িতে বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল, সেদিকে এখন মন নেই ওদের, এই সুযোগে ই ছুতো করে পালিয়ে এসেছে বাড়ির থেকে…তুমি কি ওদের কারো সঙ্গে ভাব করতে চাও? চাও তত বলল।
