বুঝেছি। রাতদিন পাহারা দেবে আমায়–বুঝলাম। কাজকর্মের ধান্দায় বেরুতে হত না তোমাকে?
আমার আবার কী কাজ? এক বৌ-ই তো বহু কাজ। তার ওপর কারো কাজ আছে নাকি আরো? থাকে নাকি?—
খেতে কী?
সে আমি ঠিক খেতাম। ঠিকই খেতাম, খাওয়ার ব্যাপারে কিছু অবহেলা, কোনো ত্রুটি থাকত না আমার।
তাতে পেট ভরত না মশাই। আমি বলছিলাম, অন্নবস্ত্র জুটত কোত্থেকে শুনি? কাজকর্ম না করলে।
মা অন্নপূর্ণা যোগাতেন। তিনিই যুগিয়ে যেতেন ঠিক ঠিক। সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। মার একটা গল্প বলি শোন্ তাহলে–উসিতরসের গল্প। শুনেছিস এর আগে?
না তো। উসিত সেটা কী? কে?
এক সাধু। গল্পটা বলি তোকে। একবার এক সাধু নাকি আমাদের রাজবাড়ির পিলখানায় এসেছিল। এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাতীদের খাওয়া দেখছিল সে। বড় বড় গামলা ভর্তি চাল, গুড, কলার ঘোড়, আরো কত কী-মেখেচুখে বড় বড় গরাসে করে মাহুতরা হাতীদের খুঁড়ে ধরে দিচ্ছে আর তারা অ্যায়সা আরামে চোখ বুজে আয়েস করে চিবুচ্ছে-প্রত্যেক হাতীর জন্যেই আধ মণ করে বরাদ্দ। সবচেয়ে বড় দাঁতালো হাতী মোহনপ্রসাদের জন্যে তার ওপর রাজাবাহাদুরের পাঠানো নিত্যকার রাজভোগ–তার প্রিয় খাদ্য এক হাঁড়ি বাণিজ্যার দোকানের ইয়া বড়ো বড়ো রসগোল্লা। তাই দিয়ে রাজোচিত মর্যাদায় তার মধুরেণ সমাপয়েৎ হোত রোজ। একজন মাহুতকে সাধু নাকি শুধিয়েছিল, কেন, এমন করে এদের খাইয়ে দিতে হচ্ছে কেন? এরা কি গোরু-ভেড়ার মত চরে খেতে পারে না, নিজেরা মুখে তুলে নিতে পারে না? খেটে খুটে খেতে শেখেনি? কি পাখিদের মতন খুঁটে খুঁটে? না সাধুজী। জবাব দিয়েছিল মাহুতটা, হাতী সেরকম জানোয়ার নয়। এদেরকে এমনি করে খাইয়ে দিতে হয়। নইলে এরা এমনিতে খাবে না। মুখে তুলে না দিলে কিছুই মুখে তুলবে না কিছুতেই। উসিতরসে খিলানে হোগা। খোদা এইসা বানায়া এলোগ কো না! উনহি ইসি তরে বানায়া, উহি উসিতরসে খিলাতা!
তারপর?
শুনে তো সাধুটি হাঁ; তারপর করল কি সে, রাজবাড়ির শ্রীরাম মন্দিরে গিয়ে হত্যা দিয়ে পড়ল-পড়ে থাকে দিনরাত, খায় না টায় না, কারো কাছে কিছু চায় না। পূজারী পুরুতরা রামচন্দ্রের প্রসাদ এনে ধরে দিল ওর সামনে, ও ষ্টুলো না, শুধু বলল, উসিতরসে। যে কিছু ভালোমন্দ খাবার-দাবার ফলমূল নিয়ে আসে–সাধু ছোঁয় না–খায় না-খালি বলে, উসিতসে। রাজাবাহাদুর খাবার নিয়ে এলেন, রানী কাকিমাও এলেন তাঁর সঙ্গে-সাধুর শুধু ঐ এক বুলি–উসিতরসে। সবাই হাঁ করে তাকায়, হতাশ হয়ে ফিরে যায়, ওর কথার মর্ম কেউ বোঝে না।
সাতদিন এইরকম ঠায় উপোসে পড়ে থাকার পর একদিন শেষরাতে কে নাকি এসেছিল তার কাছে খাবার হাতে করে-খাওয়ার জন্য সাধতে। তার বহুৎ সাধ্যসাধনায় চি চি করে সাধু বললে-ঐ এক কথাই! উসিতরসে। শুনে লোকটা যেই না তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে গেছে, অমনি সাধু গরাসটা ফেলে দুহাতে পাড়ে ধরেছে তার পা-ঠাকুর! এইবার তো ধরেছি তোমায়। ধরা পড়ে গেছ তুমি। আর তো তোমায় ছাড়ছিনে! আর কোথায় পালাবে! যিনি হাতাঁকে খাওয়ান, তুমিই সেই তিনি! আমার ভগবান! তুমি ছাড়া তো আমার এই কথাটার মানে আর কারো জানবার কথা নয় ঠাকুর।
ভোর রাতের সেই কান্ডটা কেউ দেখেছিল নিজের চোখে? রিনি শুধোয়।
কেউ না। কে জেগে বসেছিল তখন? তবে তার পরদিন সকালে কেউ আর সে সাধুটির দেখা পাইনি। শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর দিব্য অঙ্গ মিশিয়ে গেল কি না কে জানে!
তুমি এসব বিশ্বাস করো?
মা বলে তাই বলছি। মার কথায় কি কেউ অবিশ্বাস করে?
তোমার বাবা কী বলেন এ বিষয়ে?
বলেন, গাঁজাখুরি। তিনি আবার কবিতাও আওড়ান, মহাকবি হেমচন্দ্রের। ছিল বটে আগে তপস্যার বলে/কার্যসিদ্ধি হত এ মহীমন্ডলে/আপনি আসিয়া ভক্ত-রণস্থলেসগ্রাম করিত অমরগণ/এখন সেদিন নাহিক রে আর/দেব আরাধনে ভারত উদ্ধার হবে না হবে না খোলো রবার/এসব দৈত্য নহে তেমন।
তোমার বাবাই ঠিক কথা বলেন। দেবতার সাহায্যে, দৈবলীলায় যেমন ভারত উদ্ধার : হবার নয়, তেমনি কেউ নিজেকেও উদ্ধার করতে পারবে না। তুমিও পারবে না। তোমাকে। কাজ করতে হবে-রীতিমতন, সবার মন। প্রাণপণে কাজের মানুষ হতে হবে, মানুষের কাজ করতে হবে… উসিতসের কৃপা কখন বর্ষে তার ভরসায় হাঁ করে বসে থাকলে চলবে না।
বাবা আরো কী বলেন জানিস? বলেন উদ্যোগিনঃ পুরুষসিংহ উপৈতি লস্মী/ দৈবেন দেয়মিতি কাপুরুষা বদন্তী। এর মানে হচ্ছে…
বলতে হবে না, আমি জানি। দৈবের কৃপায় কিছু মেলেনা, সব কিছুই চেষ্টা করে পেতে হয়-এই তো! তোমার বাবার কথাই ঠিক।
তুই তো বলবিই। তোর কথার সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে মিলছে কি না! কিন্তু আমি ওকথা মানিনে। চেষ্টা করে কিছুই আমি কখনো পাইনি, যা আমি চাই–আমি যা পাবো বলে কখনো ভাবতেই পারিনি, তাও কেমন করে কে জানে আচমকা পেয়ে গেছি। দৈবাৎ আমি পেয়ে যাই।
দৈবাৎ পাও? দেবতার কাছে প্রার্থনা করে পাও? কোন্ দেবতার কাছে শুনি?
কোনো দেবতার কাছেই কিছু প্রার্থনা করিনে। এমন কি চাইতেও হয় না। এমনিতেই আসে…এই যেমন তুই! এলি না এই আমার জীবনে? ঠিক সেইরকমটাই।
এমনিতেই মিলে যায়? তা কি করে হয়! হতে পারে কখনো? আশ্চর্য তো।
তাই তো দেখছি জীবনভোর। কবি তুলসীদাসের একটা কথা বলেন মা। যো যাকো শরণ লিয়ে/সো তাকো রাখে লাজ। উলটু জলে মছলি চলে/ভাসি যাওয়ে গজরাজ।
