কি আর করবি। সত্যি! ছেলের মতই কাজ করেছিস। কিন্তু সেই পার্কের থেকে থানায় আসার পথে কোন্ ফাঁকে যে সে তোকে দিদি বলে ডেকেছিল, আমি তো টেরই পাইনি।
আমিও না। এর আগে তার সঙ্গে আলাপই হয়নি আমার। দিদি হওয়া তো দূরের কথা। …হয়তো মনে মনে ডেকে থাকবে।
ভারী মিথ্যুক তো ছেলেটা। এমন রাগ হতে থাকে আমার দেবেনের ওপর-এক : নম্বরের লায়ার। হামবাগ কোথাকার। ফেথলেস, ট্রেজারার্স, বিশ্বাসঘাতক।
ছেলেরা ওরকম বানিয়ে বলে, বাড়িয়ে বলে থাকে, এতে কোনো দোষ হয় না। পরের মন-রাখা কথা কইতে ওরা ওস্তাদ। পরী হলে তো কথাই নেই।
ওরমন-রাখা কথা আমি বার করছি! বদমাইসের ধাড়ি। পাজি ইস্টুপিড গাধা আহামোক…
আহা, রাগছো কেন এত?
রাগব না? পরের দিকে হাত বাড়াতে চায়? পরের জিনিস লুফে নিতে হাত বাড়ায়। লোফার একটা!
রাগ করছো কেন? রাগের কী হল? ভাই-ভাই কি ভাই-বোন, এসব সম্পর্ক কি খারাপ?
বাঃ! আমি দাদা হতে পেলুম না, তুই আমায় দাদা বলে ডাকলিই না কোনো দিন–আর ও হতভাগাটা কোথা থেকে উড়ে এসেই না দাদা হয়ে গেল হঠাৎ?
দাদা হতে চাও তুমি? দাদা হবে আমার? বললেই হয়! সঙ্গে সঙ্গে সে সতর্কৰ্বাণী আওড়ায়–ডাকতে কী আর! কিন্তু মনে রেখো, দাদা হলে কিন্তু দাদাই হয়ে গেলে চিরদিনের মতন–তারপর আর আপসোস করতে পারবে না। কোথাও যদি কিছুতে আটকায়, আমার কোন দোষ নেই, সেটা কিন্তু বলে রাখলাম।
কোথায় আটকাবে? কোনো বাধা আমি মানলে তো? কেন, দাদাদের কি নিজের বোনদের আদর করার রাইট থাকে না?
তা থাকে। দাদার তো বার্থরাইট আদর, তবে যতটা শোভা পায় ততটাই। আদর করতে পাবে তুমি আমায়–কিন্তু ঐ বোনের মতই। মনে রেখো।
তবে আর কোথায় আমার আটকালো শুনি? তার বেশি আর আমি চেয়েছি কী? আসলে, পেলেই হলো আমার।
যখন আটকাবে তখন টের পাবে।…এখন তার কী।
তাহলে আর কোথায়, কখন আমার আটকাতে পারে… শুনি? শুনিই না?
গোধূলিলগ্নে গিয়ে। সে মুখ টিপে হাসে-যদি আমাদের বিয়ে আটকায়?
গোধূলিলগ্নীকৃত দশায় সেই সুতহিবুকযোগের সমস্যাটা আমি আমলই দিই না। অদ্যভক্ষ্য ধনুর্গণ, চিরকালের বাউন্ডুলের ভবিষ্যৎ ভাবনার বালাই নেই।
কোথায় বিয়ে তার ঠিক নেই। আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলি। আমি মানুষ হলে তবে তে তুই আমায় বিয়ে করবি…আমি ডাক্তার হব, শরীর ভালো করব, খুব টাকা কড়ি উপায় হবে আমার…তোকে দোষ দিইনে, সব মেয়েই তাই চায়। নিছক ভালোবাসার জন্যে কখনো কাউকে বিয়ে করে না মেয়েরা–আমি ভালোই জানি। নভেলেও পড়েছি বিস্তর। তা আমিও মানুষ হয়েছি, আর তুইও আমায় বিয়ে করেছিস! দুই-ই শিবের অসাধ্য। শিবরামের সাধ্য কী! সাত মণ তেল পুড়লে তবেই নেচেছে আমার রাধা! আমি বলি-না, আমি অত গাধা নই ভাই! গাছের মেওয়ার জন্যে হাতের নগদ লাভটা ছাড়তে যাই কেন? তার আগে, ঢের আগেই–এখনই তো আমি দাদা হতে পারি যখন!
তা পারো। হতে চাও তো বলল।
হ্যাঁ, চাই হতে। এক্ষুনি–এই দণ্ডেই…
বেশ, ডাকছি তবে। দাদা…দাদা…দাদা…
কী বললি? শুনতেই পেলাম না। কানেই এল না–কথাটা ভালো করে বলবি তো? যেমন করে বললে শুনতে পাব তেমনিভাবে বল, যাতে বেশ করে টের পাই আমি।
খুব চেঁচিয়ে বলব? গলা ফাটিয়ে? জেলখানা চৌচির করে?
তাহলেও কানে ঢুকবে কি না কে জানে। আমার সন্দেহ থাকে–কান ফাটিয়ে বললেই কি শোনা যায় রে সব কথা। কান দিয়ে শোনাও যায় না–শোনাবারও নয় সব অন্যরকমের বলতে হয়, শুনতে হয়-তবেই কিনা শোনা যায়।
যে কথায় কর্ণপাত করা যায় না, দৃম্পাত করারও নয়, তা বুঝি মুখপাতে মুদ্রিত হলেই ভালো হয়। কিন্তু আমার সেই ধারণা ব্যক্ত করার আগেই কালকের রাতের অপ্রত্যাশিত শিলাবৃষ্টির মতই আচম্বিতে অকালবর্ষণ নেমে আসে…
শিব্রামদা…শিব্রামদা…শিব্রামদা… মৃদুল ছোঁয়ার রিনিঝিনি শুনি ওর মুখে শিব্রামদাঃ! হয়েছে? টের পেয়েছে তো?
হ্যাঁ, পেয়েছি। এতক্ষণে টের পেলাম।
যথোচিত কথাটা যথাযথভাবে কইলে কে না শুনতে পায়? কে-বা না বুঝতে পারে? কার বা বোঝার অসুবিধে?
.
৪৯.
হলো তো? এবার ছাড়ো তাহলে লক্ষীটি! জেলের ডাক্তারখানা থেকে তোমার ওষুধটা নিয়ে আসিগে, কেমন?
জেলের ডাক্তারখানা কোথায় তুই জানিস?
দেবেনদার সঙ্গে গিয়ে দেখে আসব আজ।
না, দেবেনের সঙ্গে যেতে পাবিনে।
আজই তো খালি। কাল থেকে আমি একলাই যাবো। আজ দিনটা কেবল।
না। আজকেও না। কারো সঙ্গে আমি তোকে যেতে দেব না। আজও না, কালও না, কোনোদিনও না।
বাবারে বাবা! দেবেনদা কি খেয়ে ফেলবে আমায়?
না খেলেও। আমি প্রাণ ধরে তোকে আর কারো সঙ্গে ছাড়তে পারব না বলে দিচ্ছি সাফ। তাতে ওষুধ না খেয়ে মরে যাই সেও আমার ভালো।
ইস্! কি হিংসুটে গো তুমি! ভারী সন্দিগ্ধ মন তো তোমার। ভাগ্যিস্, তুমি দাদা পাতিয়েছ সেই রক্ষে! বড়ডো ফাঁড়াটা কেটে গেছে আমার। বৌ হলে তো তুমি বোরখা পরিয়ে রাখতে আমায় বোধ হয়।
মোটেই না। আমি নিজেই তোর বোরখা হয়ে থাকতুম দিনরাত। বোরখার মতই তোকে ঘিরে রাখতুম সব সময়। কারো নজর পড়তে দিতুম না তোর ওপর।
কি রকম?
কোনোদিকে তাকাবার ফাঁক পেতিসনে তুই। তোর পূর্বে আমি, পশ্চিমে আমি, উত্তরে আমি, দক্ষিণে আমি…এক আমি একাই একশ। যেমন কিনা, আমাদের এই বঙ্গদেশ। উত্তরে হিমালয়, পূর্বে ব্রহ্ম, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে বিহারের দ্বারা পরিবেষ্টিত, তেমনি…।
