না। তুই কাল সারা রাত আমায় গাল দিয়েছিস, আমি তার কোনো জবাব না দিয়ে ছাড়বো? তার সোথ আমি নেব না–ভেবেছিস তুই?
না না না। এখানে এত লোকে সামনে, এত জনার চোখের ওপর…কে কোথায় তাকিয়ে আছে, লক্ষ্য করছে আমাদেরকে জানে! এখানে না, এখন না, দোহাই লক্ষীটি। দেশের জন্যে জেলে এসে এমন করে নিজেদের মুখ পোড়াতে নেই।
না…আমি শুনব না…কিছুতেই না…
ওমা, সত্যি তো! মুখটা তো পুড়িয়ে দিলে সত্যিই! কী হয়েছে তোমার গা? গালটা এমন ছাঁৎ কর উঠল যে আমার?
কিচ্ছু হয়নি-কী আবার হবে আমার? কেন, এখন আবার যে?… আমায় গাল দিচ্ছি, যে বড়ো? না সাধতেই নিজের থেকেই দিচ্ছিস যে ফের?
তোমার গা এত গরম কেন গা? জ্বর হয়েছে বোধ হয়। রাত্তিরের সেই কাঁপুনি দেয়া ঠান্ডাটা লেগেই… ভালো করে আমার আঁচ নিয়ে তার পরে সে আঁচায়
বেশ জ্বর। ইনফ্লুয়েঞ্জাই হবে হয়ত। তোমার এমন জ্বর হয়েছে আর তুমি তা টের পাচ্ছ।?
তুই থাকতে তোকে ছাড়া আর কিছুই আমি টের পাই না। টের পেতেও চাই না আর কিছু।
দাঁড়াও, তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করি আগে। বিছানার ওপর সে উঠে বসে-বসে চারদিকে তাকায়-জেলের আপিসে গিয়ে খবর নিই গে। জেলখানায় ডাক্তারখানা থাকে আমি জানি। সব জেলেই থাকে, না থেকে পারে না। এখানেও আছে নিশ্চয়। হাসপাতাল, ডিসপেনসারি সব আছে। আমার বাবা যখন মহকুমা শহরে কাজ করতেন তখন তিনি যেমন জেলার ডাক্তার, তেমনি ঐ জেলের ডাক্তারও ছিলেন। রুগী দেখতে বাবাকে নিয়মিত যেতে হত জেলখানায়।
না, তোকে কোথাও যেতে হবে না। এখানে থাক। আমার কাছে থাক। তুই থাকলেই ভালো থাকব আমি।
কতক্ষণের জন্যে গো? যাব আর আসব তো। তারপর সারাক্ষণই থাকব এখানে। আমার তো জেলে থাকা ছাড়া কোনো কাজ নেই আর। খালি খাওয়া আর শোয়া।
আমারও কাজ প্রায় তাইতো ভাই! শোয়া আর খাওয়া। শুয়ে শুয়ে খালি খাওয়া কেবল।
সেকথা বলছিনে। বলছি যে এখানে নাওয়া-টাওয়া তো নেই একদম–সে পার্টই নেই যে দুমাস এখানে আছি। যা-ব্যান্ডেজ বেঁধেছি না, কাউকে আর টের পেতে হবে না আমাকে। কিন্তু নাইতে গিয়ে খালি গা করলেই হয়েছে।
দরকার কি নাইবার? নেয়ে-টেয়ে কে কবে বড়লোক হয়েছে। আমিও তো নাইব না। শীতে আবার নায় কে?
কেন, তোমার আবার কী হোলো? নাইবে না কেন? নাইতে কী হয়েছে তোমার? আমারো খালি গা হতে লজ্জা করে ভারী। এত লোকের সামনে…সবার কেমন সুগঠিত শরীর–আর তার মধ্যে আমার এই হাড়-জিরজিরে চেহারা নিয়ে সকলের চোখের ওপর…
ব্যায়াম করতে বলছি তো সেই জন্যেই গো! দেখতে না দেখতে ওদের মতই হয়ে যাবে দেখো।
ওদের সব জন্ম থেকে পাওয়া–ব্যায়াম করে পায়নি কেউ। তবে কেউ কেউ তার ওপরেও ফের ব্যায়াম করে কিছু বাড়িয়ে থাকতে পারে-ঐ দেবেনের মতই হয়ত।
একই কথা। কেউ বড়লোক হয়ে জন্মায়, কাউকে আবার জন্মাবার পর বড়লোক হতে হয়। বড়লোক হওয়া নিয়ে কথা।
তবে হ্যাঁ, বাহাদুরি বটে তোর। কথাটা আমি পালটাই : যা একখানা ব্যান্ডেজ বেঁধেছিস। তোর বাঁধুনির তারিফ করতে হয়। তুই ডাক্তারি পড়লে পারিস-বড়ো লেডি ডাক্তার হবি। নির্ঘাৎ!
হবো তাহলে। পড়বো তাহলে–যদি তুমি ডাক্তারি পড়ো, ডাক্তার হও–আমি কথা দিচ্ছি তোমায় তুমিও ডাক্তার হবে, আমার সঙ্গে তোমাকেও হতে হবে কথা দাও তবে।
ইস, কী মুশকিলে যে পড়লাম! তুই আমায় মানুষ না করে ছাড়বি না দেখছি-ততর মতন মেয়ের পাল্লায় পড়লে ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে কারো কিছু থাকে না আর। আমি হাঁফ ছাড়ি-আচ্ছা, হবো ডাক্তার। হবই না হয়,কী হয়েছে? এখন তো নয়, পরে। পরের কথা। পরে। যখনকার কথা তখন। যখন হব তখন দেখা যাবে।
এখনকার কথা হচ্ছে, এখানকার ডাক্তারের খবর নেওয়া। এক্ষুনি যাই–দেরি করলে বেশি বেলায় ডিসপেনসারিতে ভিড় জমে যায় বেজায়।
আলতো করে একটুখানি আদর চুঁইয়ে সে উঠে পড়ে-চুপ করে শুয়ে থাকো লক্ষীটি। নেমেটেমো না। বেরিয়ে না বাইরে। জেলের গেটের কাছেই আপিসটা তো? যাবো আর আসবো।
একটু বাদেই ফিরে এসে জানাল–হ্যাঁ, আছে এই জেলে ডাক্তারখানা। ওষুধ দেয় রুগীদের-তবে এখানে তারা কেউ তোমায় দেখতে আসবে না, সেখানে গিয়ে দেখাতে হবে।
বলল বুঝি আপিসে?
না, আপিস পর্যন্ত যেতে হয়নি। বেরুতেই তোমার বন্ধুটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, তার কাছেই জানলাম। এর মধ্যেই সে এখানকার সব কিছু জেনেছে…দেবেনদাই বলল আমায়।
অ্যাঃ, তুই কী বললি? ফোঁস করে উঠলাম আমি শুনেই না–এর মধ্যেই দেবেনটা তোর দাদা হয়ে গেছে? দেবেনা?
বাঃ রে। সে আমায় গোড়ায় রিনিদি বলল যে? দাদা না বলে আমি কী করি তখন?
রিনিদিও বলা-টলা হয়ে গেছে বটে? টের পেয়েছে সে এর মধ্যেই? সমস্ত?
হ্যাঁ, আমাকে ও রিনিদি বলেছে বটে, কিন্তু আমাকে ঠিক বলেনি। আমার সঙ্গে দেখা হতেই সে-ই আগ বাড়িয়ে এসে শুধোলো-তুমি রিনিদির ভাই না? তাই না? তক্ষুনি আমি যা সামলে নিয়েছি না! বলেছি-কী করে টের পেলেন? সে বলল, রিনিদির মতই দেখতে কিনা অবিকল। তোমার নামটি কী ভাই? আমি বললাম-রিনটু। আবার কেমন সামলে নিয়েছি দ্যাখো। তখন সে বলল, বাঃ, বেশ নাম তো! রিনি নম্বর টু রিনটু! রিনিদিকে আমি দিদি বলি তো। তুমিও তাই বলো! আমরা তাহলে ভাই ভাই হলাম আজ থেকে, কেন কিনা? তার জবাবে তখন আর আমি কি করি? বললাম, হ্যাঁ, দেবেনদা। আজ থেকে তাই। আমি ঘাড় নেড়ে সায় দিয়েছি তার কথায়, কী করব?
