ভালো নয়? গদির মতন নাদুস-নুদুস না হলেও…তাহলেও গদগদ হবার মতই চেহারা বইকি।
বুঝেছি।
আমার মনে গুমোট নেমে আসে, আমি কোনো কথা কই না আর। দেবেনের ওপর এমন রাগ হতে থাকে আমার যে…! কিন্তু সেই অন্তর্দাহের ওপরেই রিনির সদুপদেশের কথামৃত বর্ষিত হতে থাকে।
খালি যদি তোমার শরীরটাই বানাও, স্বাস্থ্যটাই মজবুত করো, কেবল দেহটা বাগাতে পারলেই অর্ধেক মানুষ হওয়া যায়। তার পরে ফের কিছু বিদ্যে সাধ্যিও হয় যদি বাকী আট আনাও এসে গেল তোমার। তার ওপর যদি টাকাকড়িও হয় আবার…এমনটা হলে হতে বাধ্যই, তখন তো ষোলো আনার ওপর আঠারো আনাই হোলো- পুরোপুরিই মানুষ হয়ে গেলে।
মানুষ হয়ে কাজ নেই আমার। কোনো গরজও নেই তেমন।
আর কিছু নয়, রোজ একটুখন আলাদা করে সময় রেখে একটুখানি ফ্রি-হ্যান্ড একসারসাইজ করলেই হয়। তাতেই ঢের। আমার দাদারা তো তাই করে। তাদের শরীর দেখেছো কেমন? তোমার ওই দেবেনের মতন অত সুঠাম না হলেও ভালোই বলতে হবে। তাও যদি না পারোনা করতে চাও তো মাইলটাক রোজ দৌড়লেও হয়। বাবার মতে দৌড়টাও কিছু খারাপ ব্যায়াম নয়। এমন কি, জোর কদমে কিছুক্ষণ হাঁটলেও হয়, তাতেও দম বাড়ে। সেও অনেকখানি।
কার জন্যে দৌড়ব শুনি?
কেন, আমার জন্যেই। রোজ সকালে কি বিকেলে, যখন তোমার সুবিধে, আমাদের বাড়ি বেড়াতে আসবে। আমি অপেক্ষা করব তোমার জন্যে। আর তোমার সেই আসাটা নেহাত পায়চারিতে না হয়ে এক দৌড়েই হয়ে গেল না হয়! একটু তাড়াতাড়িই এসে পৌঁছবে তাহলে।
যাব যে, তোদের বাড়ির ঠিকানা কি দিয়েছিস আমায়?
ঠিকানা দিতে লাগে না। কতো বড় রাস্তা আহিরিটোলা, কখানা বাড়ি সেখানে। একটা রাস্তায় কজনা ডাক্তার থাকে গো? পাড়ার সবাই সেখানকার ডাক্তারকে চেনে। চিনে রাখে, এলাকার প্রায় সবাই পেশেন্ট, কখনো না কখনো যেতেই হয় ডাক্তারের কাছে–খবর রাখতে হয় ডাক্তারের।
খবর কেউ কখনো দেয় নাকি কাউকে? কলকাতার লোকদের তুই এখনো চিনিসনি রিনি। কাউকে যদি শুধোই তিন্ন নম্বর বাড়িটা কোথায় দাদা? বলবেন দয়া করে? তক্ষুনি তার জবাব আসবে, ঐ যে, বাহান্ন নম্বরের ঠিক পরেই-বুঝলে দাদু? যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপান্ন। লাও ঠ্যালা।
আহা, নাই কেউ জানলো, তাই বলে কি কোনো ডাক্তারের পাত্তা পাওয়া যায় না নাকি? ডাক্তারের বাড়ির সদরে দরজার গায়ে তাদের নেমপ্লেট লাগানো থাকে না? তাই দেখেই তোবোঝা যায়, কে ডাক্তার, আর কে ডাক্তার নয়কার নাম কী। তার থেকেই তুমি ঠাওর পেতে কোন্ বাড়িতে আমি থাকি। পেতে না?
তা না হয় বুঝলুম। কিন্তু আমি এধারে তোর জন্যে ছুটোছুটি করে মরি আর তুই ওধারে পাড়ার কোনো মাসকুলার বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে পড়িস বেড়াতে। আমার আসার আগেই ফুড়ুৎ!
তা কখনো হয় না গো। বাজিয়ে একবার দেখলেই না হয়?
না বাজিয়েই তোর যা ঢং দেখছি না! আমার ঢনৎকার ওর কথায় : বাজালে তো তোর ঢঙের আর অত থাকবে না!
রিনি বলে, আমি কোথাও নড়বো না বাড়ির থেকে–তুমি দেখো। তুমি আসবে আর আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব, তোমার ওপর কি একটুখানিও টান নেই আমার–তুমি বলতে চাও?
বেশ, সেটা হাতে হাতেই বাজিয়ে দেখা যাক না। আমার ওপর যা তোর টান তা বোঝাই গিয়েছে। আমি তক্ষুনি তাকে টেনে দেখতে চাই।
না না না। দেখছ না কখন সকাল হয়েছে। এতক্ষণে জেগে উঠেছে সবাই। কেউ আর এখন কম্বলের তলায় মুখ গুঁজে শুয়ে নেই।
কেউ তোর দিকে তাকাচ্ছে না। তুই তো আর মেয়ে নোস যে, তোর দিকে তাকাবে। আমি ছাড়া তোর দিকে দৃকপাত করার কে আছে এখানে আর?
অনেকে আছে। তুমি জানো না–তুমি কিছুই জানো না। সুন্দর ছেলেকেও লোকে। তাকিয়ে দ্যাখে। তা জানো?
সে খালি তোরা মেয়েরাই তাকাস–এই ছেলেদের দিকে।
না মশাই, অতো নেকনজর নেই আমাদের ছেলেদের ওপর। আমরা মেয়েদেরই বেশি লক্ষ্য করি। মেয়েদেরও ঠিক নয়, তারা কী পরেছে আর কেমন সাজগোজ করেছে তাই দেখি আমরা। কিন্তু তোমাদের ছেলেদের দুদিকেই নজর–মেয়েদের দিকেও তাকাও, আবার ছেলেদের দিকেও লক্ষ্য থাকে।
তোর ওপর এখানে তাক পড়েছেও নাকি কারো? কারো নজরানা পেয়েছিস তুই?
বলব কেন? আর বললেও তুমি বুঝতে পারবেনা। সে অন্য রকম চাউনি–যার জন্য কেবল সেই বুঝতে পারে, আর কেউ নয়। যে বোঝে, সেই বোঝে কেবল। সে আরেক রকমের দৃষ্টি!
কি রকমের দৃষ্টিটা? দেখে মূৰ্ছা যাবার মতন? নাকি, একটু একটু সন্দিগ্ধ? হয়ত তুই ঠিক ছেলে নোস তাই ভেবেই…?
না না, সে সব নয়। সে রকম সন্দেহ কারো হয়নি। কি করে হবে, যা একখানা ব্যান্ডেজ বেঁধেছি না ধরবার যো নেই কারো।
তবে আবার কী ভাবে তাকাবে…আহা মরি চাউনি যদি না হয়। রকমারি নজরের কোন আমি ঠাওর পাই না। তার কোনো নজির কখনো পাই নি তো?
সে তুমি বুঝবে না। সে আমি তোমায় বলে বোঝাতে পারব না। সে যেন কেমন একরকমের চাওয়া! যাকে চায় সেই টের পায় কেবল।
বুঝেছি। ওই বলে তুই আমায় ভোলাতে পারবিনে। তুই যে তোর বাসায় আমার মুখাপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে থাকবি আমি তার প্রমাণ চাই। সেটা আমি হাতে হাতে পরীক্ষা করে দেখতে চাই…।
হাতে হাতেই?
হাতে হাতে নয়, মুখোমুখি। আমার সম্মুখেই…এখানেই…এক্ষুনি।
কক্ষনো না। বাড়ি যেয়ো আমাদের–তখন যত চাও, যত খুশি… যত ইচ্ছে তোমার…
