তিনখানা কম্বলে কি এই শীত শানায় রে! তার বাহুবেষ্টনে কম্পান্বিত আমি কই।
আরেকটা কম্বল এখন কোথায় পাই!
কম্বল নয়, লেপ হলে হতো… লেপের বদলে তুই হলেও হয়…তুই যদি কিনা সেই লেপ হয়ে যাস্! গায়ের ওপর তোকে লেপের মতন টেনে বিছিয়ে নিতে হয়। তা হলে তোর চাপে আর গায়ের তাপে শীতটা যায়। কিন্তু তা কি আর হয় নাকি! সেটা তো অভদ্রতা হয়ে যাবে। তাই না?
সে চুপ করে থাকে। তাকে ভাবিত দেখা যায় যেন।
থাক গে। তা চাই না। তার চেয়ে তার চে-চে-চে-চে. হিহিকারের সাথে আমার হাহাকার ব্যক্ত হয়-আজ রাত্তিরেই আমার হাটফেল হয়ে যাক না-হয়! রাত আরো গম্ভীর হলে শীত আরো পড়বে। শেষ রাত্তিরেই…।
রাত্রিশেষ অবধি এগুতে হয় না, তার আগেই সেই মুহূর্তেই সে নিজেকে আমার ওপর বিছিয়ে দিয়েছে–প্রলেপের মতই।
স্বর্গীয় উত্তাপে সঙ্গে সঙ্গেই গরম হয়ে উঠেছে আমার মন। আর মন, যেকালে দেহেরই অঙ্গীভূত, অথবা দেহই মনের অঙ্গীকার-সঙ্গীভূত হয়ে সেও গরম তৎক্ষণাৎ।
বাব্বা! এতক্ষণে কাঁপুনিটা থামলো তোমার? যা কাঁপছিলে না! কিন্তু এভাবে আমাদের কেউ দ্যাখে যদি,কী ভাববে কে জানে!
দেখছে কে? এই শীতে কম্বলের বাইরে মুখ বাড়িয়ে বসে আছে কেউ? সবাই এখন গুটিসুটি মেরে কুকুরকুন্ডলী। তা ছাড়া, ভাববেটা কী? তুই তো আর মেয়ে নোস। ছেলেই এখন। একটা ছেলের ওপরে আরেকটা ছেলে শুয়ে-তাতে কার কী ভাবার আছে? ভাবাভাবির কী আছে এতে?
তুমি জানো না, ভাবুক লোকরা ভাবেই। না ভেবে তারা পারে না। সে তার ছোট্ট মাথাটি নাড়ে, সবতাতেই তারা ভাবে, সব কিছু নিয়েই ভেবে থাকে। ছেলেদের এই বেয়াড়াপনাও তাদের ভাবনার বিষয় হতে পারে। যারা নিজেরা কাউকে ভালোবাসেনি, বাসে না, বাসতে পারে না, তাই কেউ কাউকে ভালোবাসলে তাদের ভারী খারাপ লাগে। বেজায় বিসদৃশ লাগে তাদের কাছে।
লাগুক গে, বয়েই গেল আমাদের। আমাদের কাছে তো অমৃতসদৃশ! তাহলেই হলো। কিন্তু আমি কী ভাবছি জানিস? বলে একটুখানি ভাবি-বলবো কথাটা?
বলো।
মুখ ফুটে বলা যায় না যে কথাটা। মুখ বুজেই বলতে হয়। আর, মুখটি বুজেই শুনতে হয়–বুঝলি? মুখ বুজেই কথাটা বুঝবার, তা বুঝেছিস?
বুঝেছি, আর বলতে হবে না। সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে। তুমি হাঁ করলেই তোমার
কথার আমি আঁচ পাই। পেয়ে যাই এক আঁচড়ে–তা জানো?; আঁচ পেলেও, না আঁচাননা পর্যন্ত ঠাওর পাওয়া যায় না ঠিক। মানে পাওয়া যায় না প্রমাণে। কথাটা বৈষ্ণ পদাবলীরই একটা কলি, কিন্তু মুখের ভাষায় তার তত্ত্ব ঠিক ব্যক্ত হয় না, গানের ভাষাতেই বলা যায় বোধ হয়। কিন্তু যেভাবে মুখর হব, সুরের সেই গলা কই আমার?
বৈষ্ণব পদাবলীর সেই কলিকে অগত্যা আমার সম্মুখেই প্রস্ফুটিত করি–কথাটা কী জানিস, এখন আমার যা মনে হচ্ছে না, তার কথাটাই রয়েছে এই কথায়। বৈষ্ণর কবির এই কথাটা রে! প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর। হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাঁদে। পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বাঁধে।
বুঝেছি। কিন্তু বুঝলেই বা আমি তার কী করছি! তোমার এ কান্না থামানেনা তো আমার কম্ম নয়। বিয়ে করে টুকটুকে একটি বউ নিয়ে এসো ঘরে। সে-ই যথাসময় যে তোমার এই দুঃখ দূর করবে। তাতেই গিয়ে সুরাহা হবে তোমার।
আমাকে আর এখানে সেখানে রাহাজানি করে বেড়াতে হবে না বলছিস? কিন্তু তেমনটি পাই কোথায়! সেই বহুরত্ন–তোর মতই হুবহু আরেকটা কি কোথাও পাওয়া যায়?
তপিস্যে করো। সে বলে আমরা যেমন বর চেয়ে শিবরাত্রি করি…
আমার তপস্যা করা লাগে না। না চাইতেই পেয়ে যাই সব। আমার মা-ই আমায় পাইয়ে দেয়। এই যেমন, অযাচিত তোকে এখন আমার বুকের ওপরেই পেয়েছি…আমার মুখের এত কাছটিতেই…
আমি ঐরূপ বলি। আর বলতে বলতে বৈষ্ণব পদাবলীরই আরেকটি কলি আমার মুখের ওপর ফুটে ওঠে–
আজু রজনী হাম ভাগে পোহায়নু
পেখনু পিয়ামুখ চন্দা/
জীবন যৌবন সফল করি মাননু…
দশদিশ ভেল নিরদন্দা/
আজু মঝু দেহ/দেহ বলি মাননু/
আজু মঝু গেহ ভেল গেহা/
আজু বিহি মোহে/অনুকূল হোয়অল/
টুটল সবহু সন্দেহা/পাঁচ বান অব/
লাখ বন হোউমলয় পবন বহুমন্দা/
আজু রজনী হাম ভাগে পোহায়নু…
চুপ! এক কথায় সে চুপ করিয়ে দেয় আমায়–যে কথাটা মুখ বুজেই বইতে হয় আর মুখ বুজেই শুনতে হয় নাকি সব সময়। হাঁ-করা নেহাত অবুঝ ছেলেরও বুঝবার দেরি হয় যে কথা!
.
৪৮.
সকালে ঘুম ভাঙতেই চোখ মেলে দেখি সে আমার পাশটিতে শুয়ে। বক্ষ বিহারের থেকে কখন সে আমার পাদেশে নেমে এসেছে কিছুই টের পাইনি।
নামলি কখন? টের পাইনি তো!
যখন তোমার কাঁপুনিটা থামল, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ দেখলাম–তার পরেই।
ঘুম হয়েছিল তোর?
ঐ ভাবে শুলে কখনো ঘুম আসে? অমন করে ঘুমোনো যায় নাকি?
আমি তো তোর গরমের আওতায় চমৎকার ঘুমিয়েছি। কিন্তু আমি তোর লেপের আরাম পেলেও তোকে তো আর গদির মজা দিতে পারিনি…খটখটে এই কখানা রে খট্টাঙ্গে শুয়ে…সত্যিই। যথার্থই আমার দুঃখ হয় ওর জন্যে।
শরীরটা বাগালেই পারো। কষ্ট করে দিনকতক নিয়মমত একটু ব্যায়াম করলেই মাসকুলার বডি বানানো যায়। তোমার বন্ধুর মতই চমৎকার চেহারা হতে পারে।
বন্ধু আবার কেটা আমার? কার কথা কইছিস?
দেবেন তোমার বন্ধু না। তার কথাই বলছিলাম।
তার চেহারাটা খুব ভালো বুঝি? ওর কথায় আমার কান জ্বালা করে, প্রাণে জ্বালা ধরে যায়।
