তুমি যাচ্ছেতাই হয়ে যেতে চাও?
পদে পদে বাধা পেয়ে বাঁচতে চাই না। প্রতি-পদে বাধ্য হয়ে বেঁচে কী সুখ? সামনে ঘোর অমাবস্যা নিয়ে? আমি চতুর্দশীর চোদ্দ কলায় পূর্ণ হয়ে বাঁচতে চাই–যখন কিনা সামনে আমার পূর্ণিমা। মানে, তুই বা তোর মতই কেউ আমার সম্মুখে। তখন আমার মুখে যা আসে বলব, করব।
নাঃ, তোমাকে মানুষ করতে পারলাম না। দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল তার–আমি চাইছিলাম তুমি মানুষ হও, মানুষের মত মানুষ হও একটা।
আমাকে মানুষ করতে চাইছিলিস নাকি? আমার মা হার মেনে গেল আর তুই পারবি? আমি হাসলাম –তবে হ্যাঁ, কখনো যদি তুই হার ম্যাজেষ্টি হোস তখন কী হয় বলা যায় না। তখন আমার হার অনিবার্য।
যাঃ-ওঃ!
তবে এ মণিহার আমায় নাহি সাজে-এ কথা আমি বলবই। তা হলেও এমনই হার চাই আমি, যে-হার কিনা কবির ভাষায় মুক্তোর হারই হবে নির্ঘাৎ! তা হলেও আমার সে হার… সেই হার…কবির ভাষায়…তোমার কাছে যে হার মানি সেই তো আমার জয়। জয় আবার ইংরিজি বাংলা দুই বানানেই হয়। এক কথায়, পরাjoy স্বীকার।
কথা শিখেছ খুব। আজেবাজে যত নভেল পড়ে বেজায় পেকে গেছ এই বয়সেই। পাকা পাকা কথা, কইতে পারো খুব। সে বলে, তোমার মত কোনো ছেলের মুখে এ সব কথা–এ ধরনের কথা কখনো শুনিনি।
তারা সব বিদ্যাসাগর হবে–সাগর না হলেও বিদ্যের আড়ত হবে নিশ্চয়ই। আদব কায়দায় রপ্ত হয়ে কায়দাকানুনে পোক্ত হয়ে একেকটা দিগজ হবে তারা। আমি সে অসুবিধার মধ্যে পড়তে চাই না…
অসুবিধার মধ্যে?
অসুবিধা নয়! যখন যা খুশি করতে পারব না, যা ইচ্ছে খেতে পাব না, তার চেয়ে ঘোরতর আর কী আছে? সাধারণ লোকের নানান সুবিধে, অসাধারণের তা নেই। ধর, আমি রাস্তায় আলুকাবলি খেতে পারি…খেতে খেতে যেতে পারি, কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু বিদ্যাসাগর হলে? লোকে আঙুল দিয়ে দেখাবে–বিদ্যাসাগরটা কী করছে দ্যাখোনা। আমার ওপর নজর থাকবে সবাইকার। আমি কাউকে নজর দিতে পারব না, নজরানা তো নয়ই। তা হলেই নিন্দে রটবে। আমার নিন্দের আমি পরোয়া করিনে…অতো নিন্দে-মন্দর ভয়ে ভয়ে চললে বাঁচার মতন বাঁচাই হয় না কিছু করা যায় না জীবনে। নিজের কলঙ্ক কেয়ার করিনে, কিন্তু বিদ্যাসাগর-গোত্র হয়ে সারা বিদ্যাসাগর সমাজের মুখে কালিম! লপন করতে চাইনে আমি।
রাস্তায় ওই আলুকাবলি খাবার খাতিরেই?
কেবল আলুকাবলি কেন, আরো কত কীই তো খাওয়া যায় রাস্তায়। রাস্তা ছাড়া জায়গা কোথায় খাবার? আমার কি বাড়িঘর আছে? আমার খাবার রাস্তা ওই রাস্তাতেই। খাবার রাস্তাও সেইখানে। ভালোমন্দ কিছু খেতে হলে, পেতে হলে, ওই পথচলতি। পথে যেতে যেতেই খেতে হয় আমায়।
কোনো ভদ্রলোক কখনো রাস্তায় খায়?
ভদ্রতার বালাই অনেক, বলছি না? ভদ্রলোক হতে চাইনে সেই কারণেই। এমন কি, চলার পথে সাথী, মনের মত সঙ্গী হলে–কবির কথায়, আমার পথ চলাতেই আনন্দ! দুজনে মিলেই খেতে খেতে যাও না! বাধা কী? কিসের অসুবিধে? এমন কি, যে জিনিস দুজনে মিলেই খাব, খাওয়া যায় নাকি যুগপৎ, পেলেই খায় আর খেলেই পায় যে জিনিস, তাও
তুমি ওই যেতে যেতেই খেতে পারো, খেতে খেতেই যেতে পারো…
সেই যুগপৎ জিনিস? রাস্তায়? শুনেই সে হাঁ হয়ে যায়।
হাঁ-করা মেয়ে আমার মোটেই সহ্য হয় না। বিশেষ করে চোখের সামনে। আমি সেই হাঁকারটা অবলীলায় বুজিয়ে দিতে যাই…
কিন্তু আমার মুখবন্ধের ভূমিকাতেই সে হাঁ হাঁ করে ওঠে–ও কী হচ্ছে? বারণ করলাম না তোমাকে?
না দিস নাই দিলি! তার জন্যে তোর সঙ্গে মারামারি করতে চাইনে। জানি তো, এই ধন কেহ নাহি নিতে পারে কেড়ে। যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে। তবু যতই বেড়ে হোক না, কেড়ে নেবার জিনিস নয়। তবে একথাও কই, একটা না হোক, আধখানা দিতে পারতিস। চাঁদমুখের অর্ধেক দিয়ে ওইভাবেও কি আমায় অর্ধচন্দ্র দেওয়া যেত না?
অমন করলে এখান থেকে উঠে যাবো-একতলায় শোব গিয়ে।
তোর কম্বল-টম্বল সব নিয়ে? তাই যা। কোন দুটি তোর, মার্কা মেরে রাখিনি তো। ওপরের দুটোই টেনে নে তাহলে…
দুটো চাইনে, একটাই ঢের। একটাতেই হবে আমার। সেটাই পাতবো, তারই আধখানা গায়ে জড়ানো যাবে। একটাতেই হবে।
শীত করবে না?
আমাদের মেয়েদের অতো শীত করে না গো। দার্জিলিঙের ঠাণ্ডাতেও মেয়েরা ফিনফিনে শাড়ি পরে ঘোরে, দ্যাখোনি?
কবে আর দেখলাম! তোরা বড়লোক, দার্জিলিং গেছিস- আমার এজন্মে দার্জিলিং নেই। তবে হ্যাঁ, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেছি বটে, আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে দেখা যায় আকাশ ফাঁকা থাকলে।…আরেকবার দেখেছিলাম বটে কাঞ্চনজঙ্ঘা… সেই ছাদেই… আমার মনে পড়ে। –সে-সে-সে-সে-সেই কা-কাকা-কানচন… কথাটা মুখে আনতে দাঁতে দাঁতে খিটিমিটি বাধায়, কাঁপুনির মধ্যে কাঁদুনি হারিয়ে যায় আমার।
ও মা! এ কী, কাঁপছ যে তুমি?
ই-ই-ই-হাঁ-হাঁ-হাঁ… হি হি করতে করতে আমি হাঁ হাঁ করি।
এত শীত করছে তোমার?
করবে না? একটু আগে বর্ষাটা হয়ে গেল না? তারই বর্শা এসে আমায় বিদ্ধ করছে এখন। এতক্ষণে। কী রকম করছে যে! দারুণ শীতে মানুষ হাটফেল করে তা জানিস?
বাবার মুখে শুনেছি বটে। তুমি এমন শীতকাতুরে তা তো জানতুম না। সে আমার গায়ে হাত দিয়ে দ্যাখে-হ্যাঁ, কাঁপছে তো সত্যিই!
এক হাতে শক্ত করে জড়িয়ে আমার কাঁপুনি সে থামাতে চায়।
