অনেক দুঃখ কষ্ট সয়ে বড় হয়েছিলেন তাতে কী, বড় হতে হলে অমনি করেই হতে হয়। তাতেই জীবন সার্থক।
কে বলেছে? ছোট হয়েই বড় সুখ। ছোটখাটতেই যতো সুখ আর মজা আর আনন্দ। অনেক কিছু ছেড়ে ছেড়ে, অনেকখানি ছেড়ে দিয়ে তবেই গিয়ে বড় হতে হয়। বহু ছাড়াছাড়ির পর একটুখানি বাড়াবাড়ি। আমি জীবনের কোনো কিছুই ছাড়তে চাইনে, ছাড়তে পারব না, সব কিছুই পেতে চাই, সব কিছুই হতে চাই আমি। সর্বত্যাগী বিদ্যাসাগর হয়ে কোনো সুখ নেই রে! অনেক আত্মত্যাগ করেই বিদ্যাসাগর আর অনেক আত্মসাৎ করেই আমরা-সর্বসাধারণ! তাঁর দিয়ে যাওয়া আর আমাদের হয়ে যাওয়া। মুহূর্তে মুহূর্তে আদান-প্রদানের মুহুর্মুহু এই হওয়া আমাদের।
তোমায় বলেছে। তার মানে তুমি মোটেই পরিশ্রম করতে চাও না– শ্রম বিমুখ–সেই কথাই বলো? অনেক বিদ্যা আয়ত্ত করলেই বিদ্যাসাগর হওয়া যায়। বিস্তর পড়াশুনা করতে লাগে। বিদ্যার্জন করতে করতেই তো বিদ্যাসাগর হয়।
আর, ওইটিই আমার দ্বারা হবার নয়। বিদ্যার্জনে আমার উৎসাহ নেই। আমার বিদ্যাস্থানে ভয়ে বচ—
অথচ ভয়ের কিছু নেই তো পড়াশুনায়। রোজ রোজ অল্প অল্প বিদ্যালাভ-তার ফলেই মহাবিদ্বান হওয়া যায়। বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠা যায় এক দিন। বিন্দুর সঙ্গে আরেক বিন্দু জল–এই মিলেই বিন্দু বিন্দু জলযোগেই সাগর হয় তা জানো?
বিন্দু বিন্দু জলযোগে ডিসপেপসিয়াও হতে পারে তেমনি আবার। স্বাস্থ্য সমাচারে আমি পড়েছি। যখন-তখন টুকটাক খেয়ে খেয়েই অম্বল দাঁড়ায় একদিন।
যেটা কিনা তোমার ব্যারাম। সব সময় মুখ নড়ছে। চলছে টুকটাক…।
পেলে তো খাই, খেলেই তো পাই। টুকটুকে দেখলেই টুকটাক খাই… কিন্তু পাচ্ছি কোথায়?
হচ্ছে কী? বলেছি না যে, কেউ দেখলে পরে তক্ষুনি ধরে জেলের বার করে দেবে? ঢুকতে দেবে না এখানে আর?
না দেয় বয়েই গেল আমার! এখানে আসার জন্যে প্রাণ যেন কাঁদছে এমন!
না আসতে চাও নাই এলে! কে আসতে বলছে জেলে? কিন্তু এখান থেকে বেরিয়ে পড়াশুনায় মন দেবে বলল। আমিও তাই করব। ইস্কুলে ফিরে যাব আবার। তুমিও যাবে তো, কেমন? পড়াশুনা না করলে মানুষ হবে কি করে? মানুষের মত মানুষ? বিদ্যাসাগর না হতে পারো উপসাগর তো হতে পারবে। মাথা থাকলেই হওয়া যায়।
মাথা থাকলেই হওয়া যায় না মশাই, হৃদয় থাকা চাই। মাথা তো কতজনারই দেখা যায়, কিন্তু হৃদয় কজনার হয়? বিদ্যাসাগরের মতন অমন হৃদয়–আছে আর কারো? সেই তাঁর ছিল আর আছে এই চিত্তরঞ্জনের।
অতশত জানিনে বাপু, বিদ্যালাভ হচ্ছে অর্থলাভের জন্যে এই বুঝি। বিদ্যে না হলে টাকাকড়ি হবে না তাই জানি। আর টাকা কড়ি না হলে কোনো সুখই নেই জীবনে।
বিদ্যার মানেই জানিসনে তুই। বিদ্যে তোর ওই পুঁথিগত নয়–অত সোজা নয় ওর মানে।
বিদ্যালাভ যে সহজ নয় সবাই জানে। রিনি বলে : কিন্তু সহজ না হলেও ওই বইপত্তর পড়েই তা আয়ত্ত করতে হয়, বুঝলে?
বিদ্যা মানে বিদ্যামানতা। সেটা পুঁথিগত নয় মোটেই, অস্তিত্বগত। সোজা কথায়-হওয়ার মধ্যে। বিদ্যে বিদ্যে তো সবাই করে, কিন্তু তার মানে জানে কটা লোক? জানে শুধু আমার মা-মার কাছ থেকেই জানা আমার।
মোটেই সহজ মানে না। তা জানি।
নয়ই তো। বিদ্যার মর্ম বোঝা মোটেই সহজ নয়, বিদ্যাটাই সহজ। বিদ্যা সর্বদাই হচ্ছে–আমাদের দেহে মনে জীবনে–হচ্ছেই। হয়ে চলেছি অবলীলায়। যেমনটা নিশ্বাস প্রশ্বাস, যেমন কিনা রক্ত সঞ্চালন, তার মতই হচ্ছি সহজে। সেটা টের পাবার বুদ্ধি যখন তোর হবে…তোর কিংবা আমার, কিংবা অপর কারো–তখনই তার বিদ্যাবুদ্ধি হয়েছে, বুঝলি?
ছাই বুঝলাম।
তুই নিজে হচ্ছিস তা বুঝতে পারিস না? কিসে হচ্ছিস, কিসে তোর নিজের অস্তিত্ব টের পাচ্ছিস, সেটা ঠাওর হয় না তোর? বলিস কি রে! সেই অস্তিত্ববোধ হওয়াটাই তো বিদ্যমানতা–সেইটেই বিদ্যা। মনের মধ্যে একটা ইচ্ছে হলে তো জানা যায়, যায় না? সেটা মনের বিদ্যমানতা। মনের সেই ইচ্ছাটাকে কর্মের দ্বারা জীবনে বিদ্যমান করা, মানে কিনা, রিয়্যালাইজ করার কৌশলই হচ্ছে বিদ্যা-কৌশলই বল আর বুদ্ধিই বল। বিদ্যা আর বুদ্ধি প্রায় এক জিনিস-হরিহরাত্মা। একটা হলেই আরেকটা হয়।
এই হচ্ছে বিদ্যার মানে?
হ্যাঁ, এই বিদ্যার দ্বারাই, সেই যে বিদ্যয়ামৃতমতে বলেছে না–সেই অমৃত লাভ করা যায়। আমার বাবা কথাটা প্রায়ই আওড়ান কিন্তু মানে জানেন না মোটেই–জানে আমার মা। এবার তো বুঝলি?
বিদ্যায় অমৃত লাভ করা যায়? অমৃতটা কী? সেই যে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধে লেখা থাকে দেখেছি–যেনাহাং নামৃতাস্যা নোহং কিম কুৰ্য্যাম? সেই অমৃত?
সেই অমৃতই। একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেবো?
দাও। সে ঘাড় নাড়ে।
ধর এখন আমার মনে যে ইচ্ছাটা বিদ্যমান, যে ইচ্ছেটা হচ্ছে, সেটা যদি আমার কাজ দিয়ে এই জীবনে ফলাও করি তাহলে যা হয় কিনা তাই হোলো বি-বি-বি-বি
বিদ্যা বিতরণে বাড়ে। বিতাড়িত বিস্তৃতি লাভের পর আমার মুখ ফোটে–এই যে আমরা মুহূর্তের জন্য বিদ্যমান হলুম না? পরস্পরের অস্তিত্ব বোধ করলুম তো? সেই বিদ্যাটাই হোলো গে অমৃত। আর তাই হেলো গে আমাদের হওয়া।
তুমি মোটেই কোনো শিষ্ট আচরণ শেখোনি। হচ্ছে একটা সিরিয়াস কথা, তার মধ্যে এই ছ্যাবলামি? এটা কি শিষ্টতা?
সেই জন্যেই তো বিশিষ্ট হতে চাইনে রে। বিশিষ্ট হতে গেলে শিষ্ট হতে হয় গোড়াতেই। বড় হওয়ার ভারী অসুবিধে। ব্যক্তি-স্বাধীনতা চলে যায়। আত্মপ্রকাশের সুযোগ থাকে না। যা খুশি হওয়া যায় না, যা ইচ্ছে করা যায় না। যা ইচ্ছে তাই হওয়ার করার অধিকার চলে যায়।
