কোন্ কথাটা শুনেছি মার? জীবনে কোন্ কথাটা রাখলাম! মার কথা শুনলে তো মানুষ হয়ে যেতাম রে। এ দশা কি হতো আজ আমার! চাই কি কোনো মহামানব হয়ে যেতেও পারতাম হয়ত। কী সর্বনাশটা যে হতো আমার তাহলে!
মহামানব হওয়াটা কি সর্বনাশের?
কোনো স্বাধীনতা থাকত না তখন কোনো কিছুর। আষ্টেপৃষ্টে বাঁধাছাঁদা ছক বাঁধা গণ্ডীর ভেতর একলাটি–এদিকে ওদিকে তাকাবার যো নেই–এ পাশে সে পাশে বেড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাবে যে, উপায় নেই তার। সর্বদা ঘেরাওয়ের মধ্যে বাস করো। ঘোরো ফেরো দিন রাত।
তোমায় বলেছে! কেন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ হওয়াটা কি খারাপ?
কে বলেছে? তাঁরা সব ওপর থেকে নামেন, একটা উদ্দেশ্য নিয়ে আসেন-ভগবানের বিশেষ নির্দেশ নিয়ে। তাই পালন করতে আসা তাঁদের। এ কথা তো মা-ই বলেছেন। আর আমরা? মাটি খুঁড়ে উঠেছি সব-ভুইফোড় সবাই। যা খুশি করার, যা কিছু হওয়ার স্বাধীনতা গেলে সবই গেল, আমাদের রইলো কি আর। ব্যক্তিস্বাধীনতা সবার চেয়ে বড়ো। তা জানিস? একথাটাও মারই বলা। কিন্তু এটা আমার মনের মতন কথা। এটাই আমি মানলাম। এত উল্টোপাল্টা কথা বলে না মা!।
মানেটা কী ওর? ঐ ব্যক্তিস্বাধীনতার?
কে জানে কী মানে! তবে মোটামুটি আমি বুঝেছি যা-বিবেকানন্দ, বিদ্যাসাগর হতে গেলে আর রঙ্গলাল হওয়া যায় না।
রঙ্গলালতা কে আবার?
সেই যে–যিনি বলেছিলেন–স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে কে বাঁচিতে চায়?
সে হচ্ছে ইংরেজের অধীনতার থেকে মুক্তি–সেই স্বাধীনতার কথাই ওতে বলেছিলেন কবি।
আমি সেটা সব রকমের স্বাধীনতায় ধরে নিয়েছি! স্বাধীনতার কি আবার ভাগাভাগি আছে নাকি? যোগবিয়োগ হয়? তবে তুই যে বললি, আমি উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়েছি–কোথায় চাপালাম শুনি?
পদবলী কীর্তনে ছিলটা কী, আমার মনে নেই নাকি? ছিল যে, সখিরে হামারি দুখের নাহি ওর/এ ভরা বাদর মাহ ভাদর/ল্য মন্দির মোর। বলতে বলতে সে গুনগুনিয়ে ওঠে মৌমাছির মতইঃ তিমির দিক ভরি/ঘোরা যামিনী/অথির বিজুরিকো পাতিয়া/কান্ত পাহনুবিরহ দারুণ/ফাটি যাওত ছাতিয়া…
এই ছিল?
এই ছিল, নয় তো-বিদ্যাপতি কহে কৈসে গোঙায়ব/হরি বিনু দিন রাতিয়া……এও হতে পারে।
বিদ্যাপতি খুব বিদ্বান লোক হতে পারেন কিন্তু সত্যবাদী নন। আমি বলব।
সত্যবাদী নন?
এ ক্ষেত্রে যে না, তা আমি বলতে পারি। বাদলার দিনে মোটেই হরির জন্যে বিদ্যাপতির প্রাণ কাঁদছিল না…।
তবে কার জন্যে শুনি?
হলে পরে বিদ্যাপত্নীর জন্যেই হবে…।
শুনে সে হাসে-বিয়ে না হতেই বউয়ের কান্না কাঁদতে লেগেছো? বউ-এর বিরহ বুঝতে শিখেছ? টের পেয়ে গেছ এর মধ্যেই? বটে?
বৈষ্ণর পদাবলীর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের নিজের মনে কী জিজ্ঞাসা ছিল তা জানিস?–শুধু বৈকুণ্ঠের লাগি বৈষ্ণবের গান? বলেছিলেন না তিনি–তাঁর কবিতায়? পড়িসনি?
পড়েছি তো।
আবার নিজেই সেই প্রশ্নটার জবাবও দিয়ে গেছেন। বৈকুত কুতিত রহে নিজ কুঠাভরে। বৈষ্ণবের গান শুধু বৈষ্ণবীর তরে।
কোথাও বলেননি এমন কথা, আমার মনে আছে বেশ। এটা তুমি মুখে মুখে বানালে এক্ষুনি।
মুখে মুখে বানাবো এত বড়ো কবি আমি হইনি এখন। মুখে মুখে শুধু একটা জিনিসই আমি বানাতে পারি, কবিতাই হয়ত সেটা, না হলেও কবিতার মতই প্রায়। বানাবো? বানাবো এখন? একটা মোটে! আমি সাধি–কিংবা আধখানাই–যদি বানাই?
না না না। সে নিজের মুখ চাপা দিয়ে কয়, এখানে ওসব নয়। কেউ যদি দেখতে পায় না-পেলেই আমাদের ধরে জেলের বার করে দেবে। দুজনকেই। ব্ল্যাক লিস্টে নাম তুলে দেবে আমাদের। কক্ষনো আর জেলে ঢুকতে দেবে না। তোমার এই ব্যক্তি স্বাধীনতা শিকেয় উঠবে–কি করে রঙ্গলাল হবে তখন?
.
৪৭.
বেশ কিছুক্ষণ গুম থাকার পর গুমোট কাটে ওর। তুমি অবাক করে দিয়েছ আমায়। বড়ো হবার বাসনা নেই তোমার? বিদ্যাসাগর হতে চাও না তুমি?
চাইলেই হওয়া যায় বুঝি? বিদ্যাসাগর হওয়া কি এতই সোজা ভাই। আমি গুমরাই।
চাইতে দোষটা কী? সবাই বড়ো হতে চায়। উচ্চাশা পোষণ করে। তুমি কেমন সৃষ্টিছাড়া যেন! বাবা বলেন, সাত হাত লাফাতে চাইলে তবে লোকে পাঁচ হাত লাফাতে পারে সেটাও কিছু কম নয়। সকলেই ধনে মানে জ্ঞানে গুণে বড় হতে চায়; তুমি যেন কী?
আমি কিছুই না। আমার সায় তার কথায় : কিছুই হতে চাইনে আমি। আমি শুধু আমিই হতে চাই আমিত্বের এই অহমিকা ছাড়া কিছুই আর নেই আমার, বুঝেছিস। কিছু না হওয়ার মজাটাই কিছু কম নয় রে!
বুঝেছি। কিন্তু ওই আমিত্ব ফলিয়ে চলা তোমার চলবে না–তোমাকে মানুষ হতে হবে–মানুষের মত মানুষ। বড় হতে হবে, উঁচুতে উঠতে হবে–আরো–আরো–আরো…
রক্ষে কর। আমার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই-মনের কোনো কোণেও না। উঁচু নজর নেই আমার, নীচু নজরও নেই অশ্যি তেমনটা, আমার ইচ্ছাটা কী জানিস? সবার সঙ্গে সমান–সবার মতন সাধারণ হতে চাই–যাকে বলে সমদৃষ্টি-সমতার প্রতি মমতা…
তুমি বড়ো হতে চাও না! আশ্চ!ি ঘুরে ফিরে তার মুখে সেই এক কথা। আমার নিরাকাঙ্ক্ষা নিয়েই তার মাথাব্যথা যত না!
বড় হওয়ার মত বড় দুঃখ আর নেই। বড় হওয়ার ভারী কষ্ট–তা জানিস? বিদ্যাসাগর মশায়ের জীবনী তুই পড়েছিস? চন্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা, বাড়িতে আছে আমাদের। তোদের পাড়ার লাইব্রেরি থেকে আনিয়ে পড়িস না! পড়লে জানবি তখন। অনেক দুঃখে তিনি বড় হয়েছিলেন, বড় হয়ে অনেক দুঃখ পেয়েছিলেন। অত দুঃখ কষ্ট সইবার সামর্থ্য আমার নেই ভাই। আমি অমন কষ্টসহিষ্ণু না।
