তাই হবে না হয়। তার দ্বিমত দেখি না-শিবরাম আর আরাম একাধারে নিয়ে না হয় মোয়া যাবে এখন।
আর তিনখানা কম্বল এক করে যদি গায়ে চাপাই? তা হলে শীতের বাবাও সেই দুর্গ ভেদ করতে পারবে না। তিনগুন শীত পড়লেও।
বেশ, তবে তাই হোক।
সন্ধ্যের খাবার সেরেই না কম্বলের ঘরে গিয়ে সেঁধুলাম দুজনায় ঘুমোনো যাক এবার, কী বলিস?
হ্যাঁ। যা ঘুম পাচ্ছে না!… বলতে বলতে ওর চোখের পাতা বুজে এসেছে। সেদিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে থেকেই আমিও কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনে।
মাঝরাতে গুদামঘরের ছাদে ঝমঝম বৃষ্টি নেমেছে। সেই আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেছে আমাদের
ও কি গো? কিসের শব্দ ও?
বৃষ্টি পড়ছে বোধ হয়। শীতকালে মাঝে মাঝে অকালবর্ষণ হয় না?
এটা তো মাঘ মাস। খনার বচন আওড়ায় সে-যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।… ইংরেজকে তা হলে ধন্যি বলতে হয়। কী বলে?
ইংরেজ আমাদের রাজা নাকি? তার রাজত্বের প্রজা আমরা? এখনো তাই আছি নাকি? আমাদের হচ্ছে গান্ধী মহারাজ-তিনিই ধন্য। তাঁকেই ধন্যবাদ! আর পুণ্য আমাদের এই ভারতভূমি।
চড়বড় করে আমার কথাটার সাড়া পাওয়া গেল ছাদের ওপর। রিনি চমকে উঠে বসেছে তৎক্ষণাৎ। শিল পড়ছে। শিল পড়ছে। তার উৎসাহ দেখবার মতন।
কুড়িয়ে আনব বাইরে গিয়ে? কেউ কিছু বলবে না তো?
পাহারাওলারা গার্ড দিচ্ছে না বাইরে? পাকড়ায় যদি?
কী করবে আমার? জেল তো হয়েইছে, তার ওপর আবার কী হবে? আবার জেল দেবে নাকি? দেয় দিক, না হয় আরেক মাস জেল দেবে, তাই খাটব, তার কী হয়েছে?
রিনি বলে, তোমার ক মাস হয়েছে গো?
দুমাস। তোর?
মোটে এক মাস। আমার সঙ্গী আর যারা ছিল, তাদের দুমাস, তিন মাস করে সব।
জজসাহেব তোর চাঁদপানা মুখ দেখে ভুলে গেছে, বুঝেছিস? তাই তোর এত কম। এক যাত্রায় পৃথক ফল সেই জন্যেই। বঙ্কিমবাবু বলে গেছেন না, সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র।
আমি বঙ্কিম দৃষ্টিতে ওকে নজর দিই। বঙ্কিমের নজরানাও।
বঙ্কিমবাবুর বউ খুব সুন্দর ছিল বোধ হয়, তাই না?
সে আর বলতে! জান কী হয়েছিল একবার? বঙ্কিমজীবনীতে আমি পড়েছি। বঙ্কিম সস্ত্রীক যাচ্ছিলেন ট্রেনে। কোন ষ্টেশনে গাড়িটা দাঁড়িয়েছিল। একটা ছোকরা তাঁর বউয়ের দিকে ঘুরেফিরে আড়চোখে তাকাচ্ছিল আর ঘুরঘুর করছিল তাঁর কামরার সামনে। বঙ্কিম তাকে ডাকলেন, জিজ্ঞেস করলেন, কী করো তুমি, কতো মাইনে পাও, এই সব। তারপরে বললেন, দেখ বাপু, তাকাতে হলে ভাল করে তাকাও। কোনো আপত্তি নেই। দোষও নেই কোনো-সুন্দর জিনিস দেখবে–তাতে কী! সুন্দর তো দেখবার জন্যই হে, তবে অমন চোরা চাহনি হানা কিসের জন্যে? ও তো কিছু ঘোমটা টেনে বসে নেইকো। তাকিয়ে দ্যাখো ভালো করে! দেখবার মতন মুখখানা বটেই তো। তবে মুখ দেখেই যা, মন পাওয়া ভার। আমি আড়াই হাজার টাকার চাকরে, মাসকাবারে সব টাকাটা পায়ের গোড়ায় ধরে দিয়েও মন পাইনে ওঁর। আর তুমি কি ওই সামান্য টাকায় পাবে আশা করো?
ছেলেটা বোধ হয় মাথা নামিয়ে চোঁচা দৌড় দিয়েছিল তার পর?
কে জানে! তা আর লেখেনি বইটায়। তবে আমি ভাবছি কি, বাইরে গেলে পাহারাওলারা তোকে ধরে যদি…
ধরে ধরুক। আমার কুড়োনো শিলের আদ্দেক ভাগ দেবো না হয়…।
তারা যদি অতত সুশীল না হয়। তাতে না ভোলে যদি…এমন কি, তোর এমন সুন্দর মুখ দেখে?
এর জন্যে আরো এক মাস জেল হয় যদি আমার? ভালোই হবে তা হলে বলব। দুজনে মিলে এক সাথে বেরুতে পারব এখান থেকে।
আরে না না, সে কথা ভাবছিনে। ধর যদি তোকে পাকড়ে নিয়ে জেলখানার বাইরে ছেড়ে দিয়ে আসে। বলে যে, যাও ভাগো হিয়াসে। চরে খাওগে যেখানে খুশি-এখানে আর তোমার ঠাঁই হবে না। তা হলে?
তা হলে তো মুশকিল। সেটা ভাবনার বিষয় বটে। ওর মুখে গুমোট দেখা দেয়।
তোর চেয়ে আমার ভাবনা আরো। বৈষ্ণব পদাবলীর একটি কলি, ঠিক গুঞ্জন-ধ্বনিতে নয়, আমার বেসুরো গলার গঞ্জনায় দক্কা গমক হয়ে বেরয়…তিমির দিক ভরি ঘোরা যামিনী/অথির বিজুরিক পাতিয়া/এ ভরা বাদর মাহ ভাদর/কৈসে কাটাও দিন রাতিয়া।
রাখো! কী সব উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপাচ্ছো-বলো তো!
কি রকম? এটা মাঘ মাস নয় তাই বলছিস বুঝি। বৃষ্টি পড়লেই বাদলা হলেই মাঘ মাস ঘনিয়ে আসে। ঋতুতে না হলেও–মনের মধ্যে। মানে মনের মাঘ-বুঝেছিস?
আহা! আমি জানিনে বুঝি? পদাবলীর বই পড়িনি নাকি? তোমাদের বাড়ির সব বই-ই তো তোমার কাছ থেকে নিয়ে নিয়ে পড়েছি–কেবল একটা বাদে। একটা সংস্কৃত বই–তবে তার সঙ্গে বাংলা মানে দেওয়া ছিল। বাৎসায়ন না কার যেন-কামসূত্র না কী! বইটা তুমি আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়েছিলে, পড়তে দাওনি।
খুব খারাপ বই কিনা তাই। তার মধ্যে বিচ্ছিরি সব কথা। আমার হাতে একদিন দেখে না মা আমাকে পড়তে মানা করেছিলেন–এই বয়সে ওসব বই পড়তে নেই নাকি।
তুমি পড়োনি?
আগাগোড়া। কামসূত্রের তামাম আমার পড়া। লুকিয়ে লুকিয়ে আমি পড়েছিলাম, টের পায়নি মা। টের না পেলেই তো হলো। মার মনে দুঃখ না দেওয়া নিয়ে কথা।
কী ছিলো সেই বইটায়, শুনি?
সেসব কথা মুখে আনা যায় না। মানেও বোঝা যায় না ঠিকঠিক। আন্দাজে বুঝে : নিতে হয়–তবে একটুখানি ওঁর আঁচ পেয়েছি তার মধ্যেই। এককথায়, সেসব বলবার নয়, বলনীয় না, করণীয়।
তাহলে মার কথাটা তুমি রাখোনি? শোনননি একেবারে?
