মানেটা কী এর শুনি?
যাই মানে হোক, ভগবানের কিছু নয়। আমি ভগবানের হাসি কখনো দেখিনি ভাই–তুই হয়তো দেখে থাকতে পারিস। আমি মা কালীর জিভ ভ্যাঙানি পর্যন্ত দেখেছি…..দেখলে ভয় করে। তবে হ্যাঁ, আমার মা দুর্গার মুখ টিপে টিপে ঐ হাসিটা আমি ভালোবাসি। কী মিষ্টি যে! তবে এই চর্মচক্ষে নয়, দেখেছি তোর ঐ প্রতিমাতেই। তুইও দেখেছিস। সকলেরই দেখা।
গানের মানে…মানে, তার মর্মটা তুমি কী টের পেয়েছিলে বলো তো?
মানে, এই যে আমার সামনেই। তোর হাসি তো তুই নিজে দেখতে পাসনে, কী বুঝবি তার! ভগবান তোদের নিজেদের দিকে দেখতে দেননি, নিজেকে দেখতে পাস না তাই রক্ষে-নইলে তোরা কি কোনোদিন এই সব কালো ভূত ছেলেদের দিকে ফিরে তাকাতিস! কোনো ছেলে কি তোদর কৃপাদৃষ্টি পেতে আর? নিজেদের দেখে, নিজেদের নিয়েই মশগুল হয়ে থাকতিস! ভুলেও তাকাতিসনে আমাদের দিকে।
এই বুঝি সেই গানের মর্ম?
আমার মনে হয়েছিল কী–বলব? মনে হয়েছিল যাবার আগে, সেই যে আমরা বিকেলে রোজ মাঠের ধারে ধারে ঘুরতাম, পাটালি গুড দিয়ে চিড়ে খেতাম না? যাবার আগে সেই কথাটাই গানের ছুতোয় মনে করিয়ে দিচ্ছিলি তুই আমায়। সেদিন দুজনে দুলেছিন বনের মানে হচ্ছে সোজা বাংলায় গদ্য করে বললে, গুড চিড়ের দোলনায় সেদিন আমরা যে ঝুলে পড়েছিলাম, সে কথাটা যেন তুমি কখনো ভুলে যেয়ো না।…
এই তুমি বুঝেছিলে! চিঁড়ের ডোরে চিরতরে বাঁধা পড়ে গেছি আমরা–এই?
গানটায় তো তোর কথা ছিল না, আমার মনের কথাটাই ছিল যে। যে কথাটা নাকি আমার বলবার, সেইটাই তুই আমার হয়ে বলে দিয়েছিলিস! ওটা আমারই মর্মের গাথা ছিল…আমার মর্মেই গাঁথা হয়েছিল…সেই আমার মমগাথা এখনো এই মর্মে গাথা হয়ে আছে…এইখানটিতে। ওই সুরের ভিতে আমার মর্মর-গাঁথনি খাড়া করি নিভৃতে-আসল কথাটা হচ্ছে, তোর গানের কোনো তুলনা হয় না–যেমন কিনা আমার কাছে তোর কেউ সমতুল নেই। এত গান আর এত এত সুর তুই তুলোর মতন আমার মনের মধ্যে ধুনেছিস না! তাতে তোকে আমার জীবনের সুরধুনী ছাড়া আর কিছুই আমি ভাবতে পারিনে।
এক কথায় ওর গানের সঙ্গে ওকে আমি তুল্যমূল্য করি। ধুনে ধূল পরিমাণ করে দিই।
এতক্ষণে বুঝলাম! ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো আমার! সে হাসতে থাকে।
তুলনাহীন যে হাসিটি নাকি আকাশে আকাশে ছড়ানো ছিল সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখার আমার ফুরসত নেই তখন–তাই যেন নিমেষের মধ্যে আমার সকাশে সুরের নিঝরিণী হয়ে প্রকাশ পায়–সেই রিনি!
এমন সময় সদরে ঘণ্টা পড়ে।
তৎক্ষণাৎ আমি সচকিত গান থাক, খাবার ডাক পড়েছে এখন। চল আপিসে যাই, তোর নাম লিখিয়ে লোটা কম্বলগুলো নিয়ে আসি গে…
লোটা কম্বল? লোটা কম্বল কিসের?
দুখানা করে জেলের কম্বল দেবে না আপিস থেকে? বিছানা করে পাতবার আর গায়ে দেবার জন্যে নিতে হবে তাই। সেই সঙ্গে রুটি তরকারি ইত্যাদি-রাত্তিরের খাবার যা দেয় তারপর।
আর ঐ লোটাটা কিসের জন্যে?
জল খেতে-লোটা মার্কা গেলাস দেবে একখানা। তাকে ঘটিই করো আর বাটিই বানাও।
রিনির নাম রেজেস্ট্রি করে আপিসের থেকে কম্বল দুটো জোটানো গেল।
চল, এখন বিছানাটা পেতে ফেলা যাক গে…
আর খাবার?
খাবার এসে দিয়ে যাবে সীটে সীটে ওয়ার্ডাররা। একটু বাদেই দেবে আর। থালা রেডি করে রাখতে হবে।…খিদে পেয়েছে বুঝি তোর?
তা একটু পেয়েছে…তবে খুব নয়…
বাস, খাবার পর আর তো কোনো কাজ নেই। খেয়েই ঘুম। সারা রাত যত পারিস ঘুমো না! তবে শীত এখানে বেজায়, ঘুমোতে পারলে হয়। মাঝ রাত্তিরে না, হাড় কাঁপিয়ে দেয়–বলতে কি!
কিন্তু কম্বলগুলোও বেশ ধক্কর দেখা যাচ্ছে। খুঁটিয়ে দেখে সে বলে-ঘোড়ার কম্বল।
জায়গাটা গঙ্গার ওপরেই তো, দারুণ ড্যামেজেটাও বেশ স্যাঁতসেঁতে। রাত্তিরে গোটা গুদোম জুড়ে যা কাশির সাড়া পড়ে যায় না–একাধার থেকে যা ঐক্যতান শুরু হয়। …এটা গঙ্গার পশ্চিম কূল কিনা কে জানে!
তার মানে?
বাবা বলেন যে, গঙ্গার পশ্চিম কুল বারাণসী সমতুল। কাশীক্ষেত্রের মতই সেটা পুণ্যভূমি নাকি! এটা তাই হবে বোধ হয়। কাশীবাসের পুণ্যফলে কাশীপ্রাপ্তি না হয় শেষটায়…হাড় কখানা এখানেই না রেখে যেতে হয় আমাদের।
তোমাকেও ধরেছে নাকি কাশিতে? সারা রাত তুমি কাশবে নাকি গো? তাহলে তো ঘুমোতে দেবে না দেখছি।
এখনো তো ধরেনি কাশিতে, পরে কী হবে কে জানে।
গুদোম ঘরে ঢুকে দেখি আমাদের তাকটা একেবারে ফাঁকা। আমার কম্বলগুলো পড়ে রয়েছে কেবল। দেবেন তার কম্বল গুটিয়ে কোথায় চলে গেছে। যতদূর চোখ যায় তাকে পর তাক তাকিয়ে দেখি, কোনো ফাঁকে কোথাও আর তাকে দেখা যায় না। কোনখানে গিয়ে আস্তানা গেড়েছে কে জানে!
এই উপরের তাকটায়…এই যে আমার কম্বল পাতা রয়েছে…দেখছিস তো? উঠতে পারবি এই তিনতলায়?
অক্লেশে। তোমাদের দেশে গিয়ে কতো পেয়ারা গাছে উঠতাম দ্যাখোনি? তবে এটার একতলা দুতলা সবই তা খালি পড়ে রয়েছে–এগুলোয় বিছানা পাতলে হয় না?
পাতা যায়। তবে বললাম না, ঠাণ্ডটা বেজায়। ওপর থেকেও পড়ে আবার নীচের থেকেও ওঠে-ড্যাপো কিনা জায়গাটা। তেতালায় যা ঠাণ্ডা একতালায় তার তিন ডবল হবে বোধ হয়। এক কাজ করা যাক, আমাদের দুজনের চারখানা কম্বল তো? একটা কম্বল শুধু পাতি, তাতেই দুজনের কুলিয়ে যাবে–যাবে না? শীতের রাত্তিরে হাত-পা না ছড়িয়ে গুটিসুটি মেরে শুতেই আরাম…।
