আহা! কী আমি এমন হ্যাঁণ্ডসাম। কী রূপের ছিরি আমার। আমার চেয়ে ঢের ঢের সুন্দর মেয়ে দুনিয়ায় আছে, আমারই চোখে পড়েছে। বুঝলে? অনেক দেখেছি আমি।
আমি দেখিনি। একটাও দেখিনি এখনো। আমার নজরে পড়েনি অন্তত। থাকে থাকুক গে। আমার বয়ে গেল। আমি তা দেখতে চাইনে। তবে একথা আমি বলবই, হ্যাঁণ্ডসাম মেয়ে আরো থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু তোর মতন এমন লেগসাম মেয়ে আর দুটি নেই।
যাও। তোমার যততা ফক্কুড়ি কথা…
একটা কথা বলবো, রাখবি? তুই কখনো ভুলেও শাড়ি পরিসনি, ফ্রক পরে থাকিস চিরটাকাল… বুঝেছিস?
কেন, শাড়ি পরলে কী হয়? ভালোই তো দেখায় গো। আরো ভালো দেখায় মেয়েদের।
তা হলে তোর এই সুন্দর পদপল্লব তো আমি আর দেখতে পাব না।…
তাতে কি। মুখপদ্ম তো দেখতে পাবে। বলেই সে কী মিষ্টি না হাসে যে।–তাতেই তোমার লোকসান পুষিয়ে যাবে মশাই।
.
৪৬.
কাঁটাতারের বেড়ায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল রিনি, দুজনেই আমরা গঙ্গার দিকে তাকিয়ে।
সেই গানটা একটু গা না রিনি, গাইবি? পরশু মীর্জাপুর পার্কের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গাইছিলিস যেটা? গুন গুন করে ধরেছিলি যে সেই
তার দিকে তাকাই। তার রূপ গুণ দুই-ই বুঝি একাধারে পেতে চাই।
সেখানে আবার কী গান গাইলুম গো? সেই পার্কে? সেটা কি গান করবার জায়গা ছিল নাকি?
আহা! চাপা গলায় গাইলি না একটুখানি? আপন মনেই গেয়েছিস, মনের ভুলেই হয়ত বা। টের পাসনি তুই-কিন্তু বেশ লেগেছিল আমার। সেই যে…বহুদিন পরে/বঁধুয়া এলে/দেখা না হইতো/জীবন গৈলে। পদাবলী কীর্তনের এই কলিটা ধরেছিলি না তুই। ঐ একটা কলিই.তারপর সভায় কে একজন হোমরাচোমরা লোক এসে গেল, আর তোর কলিটা ভালো করে ফুটতে না ফুটতেই ঝরে পড়ল। সে আসতেই যা চেঁচামেচি পড়ে গেল না! তুইও থেমে গেলি তখন।
সে কলি তো সেদিনের গো, আজ আবার কেন? আজ তো সে কলি ফুল হয়ে ফুটেছে। এসে গেছি তো আমরা।…সে গান ফের এখন কিসের জন্যে?
সেই সুরটা কানে লেগে রয়েছে কিনা আমার এখনো, শুনছি সব সময়। তাই বলছিলাম। কী মিষ্টি যে গাইছিলি না।
সেদিনের আত্মবিস্মৃতক্ষণের তার স্বগতোক্ত সম্ভাষণের সেই অস্ফুট কলিতার সুমৃদু সুরভি এখনো যেন আমার কানে লেগে। কোনদিন প্রস্ফুটিত না হয়েই অকালে যদি ঝরেও যায়, তবু বুঝি তা চিরকালের মতই আমার প্রাণে লেগে থাকবে।
জেলখানায় কি কেউ গান গায়? এই কি গান গাইবার জায়গা? রিনি বলে-উপযুক্ত পরিবেশ কী এটা?
নয় কেন? যেখানে কিনা একটি বেশ পরী আমার পাশটিতেই, তার মতন পরিবেশ–আর আছে নাকি? আমার সামনে গঙ্গা আর পাশেই এই সুরধুনী-এর চেয়ে চমৎকার আর কী হতে পারে বল?
গঙ্গা আর সুরধুনী আবার আলাদা নাকি? অবাক করলে!
গঙ্গা সবার আর সুরধুনী শুধু আমার-শুধু আমারই। আমার ভাষ্যকরণঃ তুই-ই আমার সুরধুনী!
আমি আবার কিসের সুরধুনী!
প্রথম সুর আমি তোর গলাতেই শুনি। সুরের সাড়া আর আমার প্রাণের সাড়া পাই তোর কাছ থেকেই। তোদর দিকের বারান্দা থেকে গাইতিস না, এধার থেকে আমি শুনতাম…কতো শুনেছি…সেই যে একদিন গেয়েছিলিস, ও গো দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে/আমার সুরগুলি পায় চরণ/আমি পাইনে তোমারে।…তোর ওই গানটা শুনেই না আমার প্রাণে সাড়া পড়ল প্রথম। প্রথম যেদিন এই গানটা শুনি…আমাকে লক্ষ্য করেই গাইছিলিস তো?
রিনি হাসতে থাকে। তোমার মাথা! কী না কী! ছেলেরা কী যে সব আলতু-ফালতু ভাবে…কিসের থেকে কোথায় আসে, নিজের মনেই কতো কী যে ধরে নেয়!…আশ্চয্যি। এটা যে রবিঠাকুরের গান গো, তাও জানো না? ভগবানের উদ্দেশে রচনা-কোনো মানুষটানুষের উদ্দেশে নয় আদপেই! তোমার জন্যে গাইতে যাবো কেন–কোন দুঃখে?
না গাইতেও পারিস, কিন্তু আমার তাই মনে হয়েছিল, তাই আমি বলছিলাম। রবিবাবুর গানগুলো সব কেমনধারা! সব কিছুতেই খাপ খায়–সবখানেই লাগে। মশারির মতন চারদিকেই খাটানো যায়। গানটাকে তুই ভগবানের জন্যে বলছিস? তাও হতে পারে, সত্যি! ভেবে দেখছি তাও হয়। কিন্তু অন্য কাউকে বাগানোর জন্য হলেও এমন কিছু মিথ্যে হয় না।…আমি ভাবছিলাম তুই আমার কানটাকে হাতের নাগালে পাচ্ছিস না, কান ধরে টানতে পারছিস না আমার, তাই ওই সুরের আঁকশি বাড়িয়েছিস! কিন্তু যাই বল তুই, ওই গানটা, কানে আসা মাত্রই তোদর বাড়ি ছুটে গেছলাম, মনে আছে তোর?
তুমি তো হরদমই আমাদের ধারটায় ছুটে আসতে তোমাদের ভাঁড়ারের দরজার ছিটকিনি খুলে–তা যে আমার জন্যেই আসতে তা কী করে জানব। আমি ভাবতাম বুঝি খাবার লোভেই। মা তোমাকে এটা ওটা সেটা খাওয়াতেন না…
এখন তো জানলি!…..তাতে কী হয়? বিস্কুটের জন্যে গেলে আর অমৃত হাতে পেলে…কিংবা যদি একটু ঘুরিয়ে বলি, অমৃতের নাগালে যেতে অযাচিত বিস্কুট গালে এলে এমন কি ইতরবিশেষ হয় শুনি? কোনো পাওয়াটাই তাতে মিথ্যে হয়ে যায় না। তারপরে তোর সেই গানটা? আমার বকুল বনে/যেদিন প্রথম ধরেছে কলি/তোমার লাগিয়া/তখনই বন্ধু! গেঁথেছিনু অঞ্জলি! এটা…এটাও কি তোর সেই ভগবানের জন্যেই গাওয়া? ভগবানের জন্যেই বাঁধা কবির এ গানটাও?
জানিনে বাপু! ছেলেরা এত কিছু ভাবতেও পারে! এমন সব ধরে নেয় যে, তার কোনো মাথামুণ্ডু যদি পাওয়া যায়?
তারপর, তোদর সেই কলকাতায় চলে আসার দিনটায় সকালে সেই আমাদের ছাদে ছুটে এলি না? সেদিন যে গানটা তুই গেয়েছিলি, এখনো তা আমি ভুলিনি…..সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে/ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা/ভুলো না…ভুলো না! সেদিন বাতাসে কী ছিলো তা জানো?তোমারই মনের মাধুরী মাখান/আকাশে আকাশে আছিলো ছড়ানোতোমারো হাসির তুলনা…!
