খাতার পরে হিসেব কষতেই আমি পোক্ত নই, এমনি মাথাগুনতিতে পাত্তা পাবো?
দেবেনও এসে জুটেছে একটু পরে।
খানিকবাদে ঘণ্টা বাজল সদরে। সদর ফটকের কাছটায়।
কিসের ঘন্টা ভাই? শুধালাম একজনায়।
খাবার ঘণ্টা। সে বললে–খিদে পায়নি তোমাদের? ব্রেকফাস্টের ঘন্টা পড়ল। লসি দেবে এবার। তোমাদের থালা বাটি নিয়ে গিয়ে দাঁড়াও গে! লাইন দিতে হবে–জানো?
তাই নাকি? আমি আর দেবেন আমাদের থালাবাটি আনতে দৌড়ই। ঘুম ভাঙার পর থেকেই খিদের ঘণ্টা বাজছিল পেটে। সকালের খিচুড়িভোগের ভিড়ে গিয়ে ভিড়তে মোটেই দেরি করি না।
গাদাখানেক লপসি গেলার পর শীতটা যেন কাটলো সত্যিই। শীত শীত ভাবটা গেল। একটু গরম হোলো হাত-পা।
এতক্ষণে যেন বাঁচলাম–উঃ! হাঁফ ছাড়লাম আমি।–ঠাণ্ডাটা কাটলো ভাই।
ইস, কী ঠাণ্ডাই যে, গেছে কাল রাত্তিরে। কী বলব ভাই, সারা রাত্তির আমি ঘুমোতে পারিনি…।
নাক ডাকিয়েছ সমানে। আমি বাধা দিয়েছি তার কথায়।
সে ওই তন্দ্রার ঘোরে। মাঝে মাঝে তন্দ্রা লাগে না? না ঘুমোলও? লাগে না? সেটা তাই।
তোমার তন্দ্রায় আমারো ঘা লেগেছে ভাই…বলতে যাই।
সে বলে-ঐ দারুণ শীতে কি ঘুমোনো যায় নাকি? একটা কম্বলে শানায় কখনো? ওরকম চারখানা কম্বল হলে তবে যদি গিয়ে এই বাঘা শীত কাটে।
তা বটে। আমার কোনো দ্বিমত ছিল না এ বিষয়ে।
দুপুরের খাওয়ার পর স্টীলের তাকে গিয়ে গড়িয়েছি খানিক। তারপর ঘুরে বেড়িয়েছি সারা ঘরে। বিরাট গুদাম ঘরে যেন তার চেয়েও বিরাট এক মেলা বসেছিল–মেলাই ছেলে মিলে জমজমাট চারধার।
কোথাও তাস পিটছে কয়েকজনায়। দাবা নিয়ে বসেছে ফের কোথাও কোথাও আবার স্বদেশী গান গাইছে কেউ কেউ।
মাঝে মাঝে কয়েকটা ছেলে দেখি টেক্সট বই নিয়ে বসে গেছে–পড়াশোনায় মন দিয়েছে ওর মধ্যেই।
আলাপ হোলো ওদের সঙ্গে।
টেস্ট পরীক্ষায় পাস করে এসেছে তারা সব। তাদের অভিভাবকরা বইপত্তর জমা দিয়ে গেছল আদালতে। জজ সাহেব এখানে বই আনতে কোনো বাধা দেননি। ফাইন্যালের জন্যে তৈরি হচ্ছিল তারা। দু-এক মাস করে জেল তো সবার। বেরিয়ে গিয়েই তারা পরীক্ষা দিতে বসবে। তারপরে ফের জেলে আসবে। ফের আবার-ডাক পড়ে যদি।
ভালো ছেলে তারা সবাই। আমার মতন বাউণ্ডুলে ভবঘুরে নয়।
বিকেল একটু গড়াতেই গুদামের ভেতরে ঠাণ্ডা ছড়াতে শুরু করেছে।
বাইরের চত্বরে চলে এলাম। বিকেলের পড়ন্ত বোদ এমন মিষ্টি লাগে যে
দেবেন একা একাই ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখা গেল।
তোমার অপেক্ষায় ছিলাম হে! কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম জেলখানাটা।…আগাপাশতলা দেখলাম।
খানা আবার কোথায়? একখানাই তো ঘর মোটে।–যদিও একটু বড়োসড়ো। জেল বলতে হয় তো হ্যাঁ, আমাদের প্রেসিডেন্সিকে। কত সেল, কতো ঘর–কখানা তাক। কতোরকমের কয়েদী যে। ফাঁসীর আসামীও রয়েছে তার ভেতর-কনডেন্ড সেলে–একেবারে পৃথক। ফাঁসিকাঠ দেখতে পাবে তুমি, যেখানে ক্ষুদিরাম, কানাইলাল হাসতে হাসতে ফাঁস পরেছিল গলায়। সেই হচ্ছে জেল-যার ভেতর দিয়ে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে এখন। জাগ্রত গঙ্গা-সেই দেশবন্ধু! এটা কি জেল নাকি? এটা তো স্রেফ ডক ইয়ার্ড। জেলের নামে ইয়ার্কি একটা।
তা হোক, তোমার সে জেল তো আমি দেখিনি ভাই! এখানে একখানা ঘর তা ঠিক–কিন্তু কতো বড়ো একখানা! কী বিরাট ঘর বাবা! একটা গোটা ফুটবল মাঠ এঁটে যায়। একখানাই অনেক। কলোজনের সঙ্গে আলাপ হলো যে এতক্ষণে…
খুব সাবধান! যার তার সঙ্গে ভাব জমাতে যেয়ো না, বেঘোরে মারা পড়বে শেষটায় বলে দিলাম।
কেন, মারামারিটা কিসের আবার?
এর মধ্যেই বিপ্লবী দাদারা রয়েছেন তা জানো? টের পেয়েছি কালকেই। গান্ধীমার্কা টুপি মাথায় দিয়ে নিজেদের দলে ছেলে রিক্রুট করার তালে ঢুকেছেন তাঁরা। তার পেছনে আবার সি আই ডি-র স্পাইরাও সেঁধিয়েছে নিজেদের তালে। এই দুই চাকার চাপে পড়ে চিঁড়ে-চ্যাপটা হয়ে না যাও।
ল্যাপটাতে গেলে তো! ও ব্যাপারে হাতেখড়ি হয়ে গেছে আমার। ঢের ঢের আগেই। মা আর দারোগা–দুজনের কাছে নাকে খত দিয়ে ছাড়ান পেয়েছিলাম। ছেড়ে দিয়েছি সে পথ। ও-পথ আমার নয়, জেনে গেছি আমি।
নাকে খত দিয়ে পথ ছেড়েছে–কিরকমটা?
পিস্তল সমেত ধরা পড়েছিলাম না? অমনি ছাড়ান মেলে নাকি? রীতিমতন মন্তর আওড়াতে হয়েছে তার জন্য…।
মুচলেকা দিতে হয়েছিল বুঝি? জামিন দাঁড়িয়েছিলেন বাবা?
না না। বললাম না মন্তর?
শুনি মন্তরটা।
এই দিই নাকে খত/এই করি দণ্ডবৎ/আর প্রভু/আমি কভু/মাড়াবো না ওই পথ …এই মন্তর!
বাজে! দারোগার সামনে আর ছড়া কাটতে হয় না কাউকে। ইয়ার্কি করবার জায়গা পাওনি আর? পীরের কাছে মামদোবাজি? আমি বুঝিনে বুঝি?
বেশ। ইয়ার্কি তো ইয়ার্কি।
রাত হলেই আবার সেই শীতের ধাক্কা। এমন ভয় করছে আমার না!…সুর পালটায় তার–তাই ভেবে এখন থেকেই কাঁপুনি দিতে লেগেছে।
কাঁপছি আমিও। তবে শীতের ভয়ে ততটা নয়, যতোটা কিনা তোমার ভয়ে ভাই!
আমার ভয়? তার মানে? আমাকে আবার কিসের ভয়? সে হতবা হয়।
অধঃপতনের একটা আশংকা থাকে না মানুষের? পদে পদে ভয় থাকে না তার?
কিসের অধঃপতন শুনি? খুলে বলবে তো!
তুমি যে এমন তুখোড় খেলোয়াড় তা কি আমি জানি! কাল রাত্তিরে সেটা টের পেলা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ফুটবল খেলার স্বপ্ন দেখছো খালি! বল নিয়ে চষে বেড়িয়েছে সারা মাঠ এই পাস করছো, এই শুট করছে, এই কর্নার করলে! এই মধ্যেই আবার গোল বাঁধি বসেছো একেবারে। গো-ও-ও-ও-ওল!
