হায়, কোথায় এলে? তোমার গঙ্গাও হারিয়ে গেল শেষটায়। হাহুতাশে আমার সহানুভূতি জানাই।
গঙ্গা হারাবে কেন? ওই সামনেই তো গঙ্গা। অচেনা একজন মাঝখান থেকে কথা পাড়ল, যোগ দিল আমাদের আলোচনায়–গঙ্গার ধারেই তো আমাদের এই জেলটা হে। এসো না দেখবে, দেখবে এসো গলা পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে আমাদের।
গেলাম গঙ্গার সামনে।
গঙ্গার বুকে দূরে অদূরে অতিকায় যতো মানোয়ারী জাহাজ নোঙর করা।
খিদিরপুর ডক ছিল এটা। আর সব জেলে কয়েদী আঁটছে না কি না, হাজার হাজার ছেলে আসছে তো ঠেলে, রোজই আসছে। তাই খিদিরপুরের এ ডকটাকে ঘিরে নিয়ে আনকোরা এই জেলখানাটা বানিয়েছে। এর মধ্যেই হাজার চারেক এসে গেছে এখানেও। ছেলে জানাল।
না ভাই। এ গঙ্গা সে গঙ্গা নয়। গঙ্গার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁফ ছাড়ল দেবেন।–গঙ্গা আমাদের হারিয়ে গেল ভাই। গঙ্গা বোধহয় আর পেলাম না আমরা—পাব না আর এ জীবনে।
আমার সুরধুনীও বুঝি হারিয়ে গেল সেই সঙ্গে। নিজের মনে মনেই আমি আওড়াই। জীবনের মতই বুঝি এবার! অন্তরের মধ্যেই আমার দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে!
.
৪৫.
গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে মার কথাগুলোই মনে পড়ছিল কেবল…..সকলের দায় মিটিয়ে সবার ভাগ বিলিয়েই ভাগীরথী।
দুনিয়ায় কেউ একলার ভাগ্য নিয়ে আসে না রে, বলেছিলেন মা, সবার সঙ্গে সবার ভাগাভাগি। নিজের ভাগ্যে খায় না কেউ, সবাইকে ভাগ দিয়ে সবার ভাগ থেকে নিয়েই খেতে হয়, পেতে হয় সবাইকে। দিলে পরে তবেই পায়। সবাই সবার ভাগ্যের ভাগীদার।
একই দেহের অংশ প্ৰত্যংশের ন্যায় সবাই সবার অংশীদার। সবার সুস্থতায় সর্বাঙ্গীণ কুশল।
দাঁড়াতে হয় অবশ্যি নিজের পায়েই, পরের ওপর ভর দিয়ে নয়–সেভাবে দাঁড়ানোই যায় না আদৌ, এমনকি খাড়া থাকাটাই দায়, কিন্তু তাছাড়া আর সব বিষয়ে স্বভাবতই আমরা পরমুখাপেক্ষী। দিয়েই পেতে হয়, পেয়েই দিতে হয়–সব কিছুই–সব কিছুতেই। না দিয়ে পাওয়ার উপায় নেই–ঠিক যেন ওই চুমুর মতই।
এমন সময় একটা ছেলে ছুটতে ছুটতে এল-তোমাদের নাম কি শিবরাম আর দেবেন?
হ্যাঁ, কেন? কী হয়েছে?
ডাক পড়েছে আপিসঘরে।জেলের আপিসে। নাম রেজেস্ট্রি করতে হবে না? কম্বল-টম্বল ঘালা গেলাস দেবে যে তোমাদের।
গেলাম আমরা। দুখানা করে কম্বল দিল দুজনকে–একটা গায়ে দিতে আর এটা পাতবার জন্যে। এনামেলের থালা গেলাসও পেলাম সেই সঙ্গে।
এসো আমার সঙ্গে তোমরা। কোথায় থাকবে ঠিক করে নাও, এসো। দেখে শুনে নাও সব।
গেলাম তার সঙ্গে।
বিপুল পরিধি নিয়ে বিরাট গুদামঘর। থাকে থাকে খাড়া করা যত স্টীলফ্রেমের শেল পরের পর সাজানোচলে গেছে সারি সারি এধার থেকে ওধার অব্দি। শেলফ-গুলি তাকিয়ে দেখার মতই-পাঁচ ছটা করে তাক প্রত্যেক শেফে–তাকগুলো লম্বা চওড়ায় পাঁচ-ছ হাত করে।
বেশির ভাগ তাকেই কম্বল বিছানো। কম্বলের নিশানায় জানা গেল কারো না কারো দখলে। বুঝলাম এই তাকগুলিই আমাদের থাকবার জায়গা।
এবার পছন্দ করে বেছে নাও, কে কোনটা চাও। বলল ছেলেটা।
নিলেই হোলো একটা। নিতেই হবে যখন–পছন্দটা কিসের! আমি বলি- আচ্ছা ভাই, এইসব তাকগুলোয় থাকত কী আগে? ইয়া ইয়া এই সব তাকে?
ডক ছিল না আগে এটা? ডকের গুদাম ছিল তোডকের যত আসবাব-মালপত্তর থাকত কিনা এখানে। লোহা-লক্কর যন্তর-টন্তর–এই সব মনে হয়।
ছেলেটি ব্যক্ত করেনাও, পছন্দমত যে কোনটায় তোমরা কম্বল বিছিয়ে ফেলল। এই দুটো তাক নাও, কেমন?
তাকিয়ে দেখি– দুজনে এক তাকে থাকলে হয় না? আমরা বন্ধু তো, একসঙ্গে কি যদি? শুয়ে শুয়ে বেশ গল্প করা যায় তাহলে।
কোনো বাধা নেই। দুজন করে একটা তাকে থাকলে ভালোই তো। এর মধ্যেই অনেক ছেলে এসে গেছে, আরো কত আসবে। জায়গার টানাটানি পড়বে তখন। কাউকেই তখন একটা তাক একলার জন্য দেওয়া যাবে না।
সব জেলেই তো ওয়ার্ডাররা থাকে। থাকে না? কিন্তু এখানে তেমন দেখছি না কে হে? জানতে চায় দেবেন। –এ এক সৃষ্টিছাড়া জেল। সত্যি।
হঠাৎ বানিয়ে নেওয়া হয়েছে কিনা! আছে জনকতক জেলের ওয়ার্ডার। খাবার দেবার সময় তাদের দেখতে পাবে। পুলিস পাহারাওলারাও আছে কয়েকজনা-ঐ সদরেই থাকে। গেটের কাছে আপিস না? সেখানেই গেট আগলে রাখে, পাহারা দেয়।…নাও, থালা বাটি সব রেডি করো, রেডি হও, রুটি তরকারি-রাতের খোরাক সব এসে পড়বে এক্ষুনি।
আহারপর্ব সমাধার পর শয়নপর্ব। এমন ঘুম পাচ্ছিল আমার যে…
সবে শীতের মৌসুম। কলকাতার মধ্যে হলে তেমন কিছু শীত নয়। কিন্তু এই গঙ্গার ধারে ডক-এরিয়ায় শীত যেন ডাকাতের মতই পড়ল। এমন হঠাৎ পড়ল যে হাড়ে হাড়ে কাপুনি ধরিয়ে দিল আমাদের-রাত খানিকটা এগুতেই না! শেষ রাতে যা দাঁড়ালো তা আর বলবার নয়।
কম্পান্বিত কলেবরে গুটিসুটি মেরে যে করেই হোক কাটালাম তো রাতটা। সকালে উঠেই বেরিয়ে পড়েছি বাইরে। ঠাণ্ডায় হাত-পায়ে খিল লেগে যাচ্ছিল, সূর্য উঠতেই বেরিয়ে পড়েছি চত্বরে–রোদ লাগিয়ে একটুখানি গা গরম করতে। ঠাণ্ডামারা অবশ দেহটা বাশিয়ে নিতে হবে। সব ছেলেই রোদ পোহাতে বেরিয়েছে। কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা বিরাট সেই প্রাঙ্গণটা এখন ছেলেয় ছেলেয় ভর্তি-গুলতানিতে গুলজার! বাঙালী আছে, বিহারী আছে, পাঞ্জাবীরা আছে সেই দঙ্গলে-কত হবে সংখ্যায়? এক হাজার? দু হাজার? আড়াই হাজার? কে জানে কতো!
