লপসির কথায় মল্লিকবাড়ির স্মরণে খিদেটা যেন চাগাড় দিয়ে উঠল আরো। পেটের ভেতর ছুরি মারতে লাগল কেমন!…এমন সময় অভাবনীয় এক আবির্ভাব!…।
জনকতক মাড়োয়ারি ভদ্রলোক চাঙ্গারি চাঙ্গারি পুরি কচুরি লাড়ু চাপাটি প্যাড়া বরফি হালুয়া বালুসাই নিয়ে হাজির, আমাদের সবাইকে খাওয়াবার জন্যই। অযাচিত অভাবিত আমন্ত্রণ!
আরে! এ লোকগুলো যে আমাদের চেনা রে। দেবেন চেঁচিয়ে উঠেছে আচমকা।
চেনা কি রকম? আমি জানতে চাই–আমি তো কস্মিনকালেও দেখিনি কাউকে এদের।
আমি দেখেছি। অনেক অনেক দিন দেখেছি। এরা সব বড়বাজারের মাড়োয়ারি পট্টির মারাঠী গুজরাটি ব্যাপারী যত। বিলিতি কাপড় বিক্রি করে এরা সবাই। বড়বাজারে দিনের পর দিন এদের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পিকেটিং করেছি আমরা। কোনো খদ্দেরকে কিনতে দিইনি কিছু, ঢুকতেই দিইনি দোকানে–এদের চিনব না?
বলো কী হে?
এরাও চিনে রেখেছে আমাদের। ভালো করেই চিনে রেখেছে। কত দিন আমরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেছি–এরা সব চিনে রাখছে আমাদের লক্ষ্য করছিস? এদের যা ক্ষতি করছি না আমরা? কোনদিন গুন্ডা লেলিয়ে দেবে আমাদের পেছনে। গুমখুন করবে আমাদের। মওকা পেলেই হয়ত বা খতম করে দেবে আমাদের দেখিস্। আড়ালে আবডালে অলিগলিতে সেই সব গুন্ডারা বেটপকা পেলে বেমক্কা মার লাগাবে আমাদের।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, তাই আমাদের ধারণা হয়েছিল। যাদের আমরা লাখ লাখ টাকার লোকসান করেছি তারাই আজ খাবার নিয়ে এসে খাওয়াচ্ছে আমাদের! আশ্চর্য!
মহাত্মা গান্ধীর মাহাত্ম্য! এই বলে অম্লানবদনে তাদের পুরি কচুরি মুখের মধ্যে পুরতে থাকি আমরা।
খেয়েদেয়ে হাঁক ছাড়ি মহাত্মা গান্ধীজী কি জয়।
খাইয়ে দাইয়ে খুশী হয়ে হাসি মুখে চলে যায় তারা সবাই।
লক্-আপের পাহারাওলারাও মৃদু স্বরে আমাদের জয়ধ্বনিতে যোগ দিয়েছে। আমাদের পুরি কচুরির ভাগ তারাও পেয়েছিল কিছু কিঞ্চিৎ। সেখানকার ঝাড়ুদাররাও বঞ্চিত হয়নি।
ভাগ্য কারো একার নয়, একজনের জন্য প্রসন্ন হয় না–বলতেন মা। সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয় বলেই তার নাম ভাগ্য। ভাগের যোগ্য বলেই ভাগ্য–আমার মার ব্যাখ্যায়। একজনের বরাত যে খোলে হঠাৎ, তার কারণ তার সঙ্গে অনেকের বরাত দেওয়া থাকে তাই। কারো মানসসরোবরের ভান্ডারে আকাশ থেকে বর্ষণ নামে, জল জমে ওঠে, গোমুখী বেয়ে নেমে আসে তাইছড়িয়ে যায় সারা ভূভারতে। কেবল গঙ্গাধরের জন্যই নয় গঙ্গা, জাহ্নমুনির জন্যও না, যে ভগীরথ টেনে আনলো তারও একলার নয়কো–সবার জন্যেই সেই ভাগীরথী।
সবাইকে খয়রাতির এই দায়ভাগ যে মানে না, রাতারাতি ক্ষয় পায় তার ভাগ্য। ভাগ্যের সঙ্গে এহেন ফেরেববাজি যে করে, তার বরাতেই ফের আর দেখা দেয় না সেই সৌভাগ্য। নেহাত মন্দ ভাগ্য হয়ত না হলেও তার আদায়ভাগে মন্দা পড়ে যায়। তার নিজের বরাতই বাড়ন্ত হয়।
লালবাজার থেকে যথাসময়ে আমরা চালান হয়ে গেলাম ব্যাংশাল কোর্টে। সেখানে দু মিনিটের মামলা। খানিকক্ষণেই পালা খতম।
কলকাতার বিভিন্ন এলাকার থেকে পিকেটিং আর আইন লঙ্ঘন করে যারা যারা ধরা পড়েছিল, গোছায় গোছায় জজ সাহেবের সামনে কাঠগড়ায় এনে খাড়া করা হচ্ছিল তাদের।
তারা বন্দে মাতরম্ হেঁকে গান্ধিজীর জয়ধ্বনি দিয়ে হাজির হচ্ছিল দলের পর দল।
তারপর মামুলি বাঁধা গৎ।
আদালতের থেকে প্রশ্নবাণ বর্ষিত হতে থাকে পরম্পরায়।
তোমরা দোষী না নির্দোষ?
কিচ্ছু আমরা কবুল করি না।
আত্মপক্ষ সমর্থন করতে চাও তোমরা? নিজেদের উকীল-টুকীল দেবে?
না, একদম না। এ আদালতকে মানিনে আমরা। করব না নিজের পক্ষ সমর্থন। যা। করেছি, বেশ করেছি। ছাড়া পেলে আবার করব। ইংরেজের আদালতকে আমাদের ঘোড়াই কেয়ার! আপনাদের আইনকানুনের ধার ধারি না।
ইত্যাকার নানা জনের নানান জবাব।
ব্যস্। ঐ পর্যন্তই। ঐখানেই আমাদের খেলা খতম। পরব শেষ। তারপর দুমাস, চার মাস, ছ মাস করে জেল হয়ে যায় জজসাহেবের মর্জি মাফিক।
তারপরেই আমরা প্রিজন ভ্যানে চড়ে চলে যাই সটান কলকাতার যত কয়েদখানায়।
গান্ধিজীর জয়ধ্বনি দিয়ে আমাদের পিজরেয় গিয়ে ভর্তি হই আমরাও। নামি এসে একেবারে জেলখানার সেই চত্বরে।
কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা অনেকখানি জায়গা জুড়ে জেলের সেই চত্বরটা, তার চৌহদ্দির ভেতর অনেক ছেলে, নানা বয়সের, বয়স্ক যুবকরাও ছিল তার মধ্যে, ঘুরছিলো ফিরছিলো ইতস্ততঃ। আমরা নামতেই বন্দেমাতরম্-এর হুঙ্কার দিয়ে সমাদরে তারা সবাই অভ্যর্থনা করে নিল আমাদের।
এগিয়ে গেলাম আমরা।
জেল আমার এই প্রথম দর্শন জীবনে। অবাক হয়ে তাকাচ্ছিলাম চারদিকে। সবার দিকেই।
এমন কি, যদিও তার আগেকার দেখা, তবু দেবেনেরও তাক লেগে গেছে মনে হল। সেও বেশ তাকিয়ে তাকিয়ে জেলটাকে দেখছে লক্ষ্য করলাম।
এ আবার কোন জেলে নিয়ে এলো হে আমাদের! চারধার দেখে সে বললে অবশেষে।
এখানে তো এসেছো তুমি আগে, তবুও চিনতে পারছ না?
না, এ জেল সে জেল নয়। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সে বলে, কোন জেল যে কে জানে? রতে পারছিনে ঠিক।
তোমার সেই নিমগাছটা কই? দেখতে পাচ্ছ না তাকে? গোড়াগুড়ি সবটাই দাঁতন কয়ে ফেলল নাকি আমার সন্দেহ হয়।
নাঃ, কোথায় নিমগাছ! কোথথাও নেই।
দেশবন্ধুও নেই তাহলে এখানে?
নাঃ! তার দীর্ঘনিশ্বাসের দ্বিতীয় প্রস্থ।
