রিনি আর আমি একধারটিতে বসে গল্প করছিলাম। দেবেনও ছিল কাছাকাছি।
একেকজনকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছিল পাশের ঘরে, ও-সির কাছে। যে যাচ্ছিল সে আর ফিরে আসছিল না।
তারপর ডাক পড়ছিল আরেকজনের।
ফিরছে না কেন ওরা? গালে হাত বুলিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে নাকি? না, কী করছে কে জানে! আমার আশঙ্কা প্রকাশ পায়।
না-না- নামধাম জিজ্ঞেস করে লক-আ-এ নিয়ে পুরছে। সেখানে আমাদের সবাইকেই পুরবে, দ্যাখো না।
লক্-আপটা কী ব্যাপার ভাই?
থানার হাজত বলে না? তাই। দেবেন বলে, সারা রাত আজ হাজতবাস আমাদের। কাল সকালে দশটার সময় সবাইকে প্রিজন ভ্যানে করে ব্যাংশাল কোর্টে হাজির করবে। সেখান থেকে একেবারে সটান জেলখানায়।
আমি ফ্রক না পরে শাড়ি পরে এলে বোধ হয় ভালো করতাম। রিনি বলল মাঝখান থেকে।
কেন, এ কথা বলছিস কেন?
বড় দেখাত আমায়। শাড়ি পরলে মেয়েদের বড়সড় দেখায় না? তা হলে আর ওরা বয়েস টের পেত না আমার…ছাড়া পেতুম না…ছেড়ে দিতে পারত না আমাকে।
তা বটে! এমনিতেই তো মেয়েদের বয়েস টের পাওয়া যায় না! শাড়ি পরলে তো, আরও। তার কথায় আমি সায় দিই।
ফ্রক পরলে কেমন বাচ্চা বাচ্চা দেখায় না? খুকী ভেবে আমায় ছেড়ে দেয় যদি শাড়ি পরলে আমি নিজেকে চব্বিশ বলে চালিয়ে দিতে পারি অনায়াসেই।
মেয়ে বলেই তোমায় ছেড়ে দেবে ওরা, খুকী বলে নয়। দেবেন তাকে কয়।
তা হলে আমি দেখে নেব…কালকেই দেখে নেব ওদের… বলতে বলতে তারও ডাক এসে গেল।
সেও পাশের ঘরে চলে গেল। সেও ফিরল না তারপর আর।
লক-আপেই পুরেছে। ছেড়ে দিলে সে নিশ্চয় তোমার সঙ্গে দেখা করে যেত। যেত না? এ ঘরে তার আসার তো বাধা ছিল না কোনো।
দেবেন আমায় ভরসা দেয় বটে, কিন্তু তার কথায় আমি কোনই সান্ত্বনা পাই না। এবারও রিনি তার ঠিক ঠিকানাটা দিয়ে যায়নি। কে জানে সে আবার আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল কি না! এবারে একেবারে চিরদিনের মতই হয়ত বা।
মুচিপাড়া থানার থেকে আমরা সেই রাত্রেই লালবাজারের হেডকোয়ার্টারে রপ্তানি হয়ে গেলাম।
প্রিজন ভ্যানে উঠে আমি দেবেনকে বলি, রিনি কোথায়? সে তো কই নেই আমাদের সঙ্গে এই ভ্যানে?
একটাই ভ্যান ছিল নাকি? পাঁচ পাঁচটা ভ্যানে করে এলাম না আমরা? সেই পার্কের থেকে? আর কোনো ভ্যানে তাকে তুলে দিয়েছে। ঠিকই রয়েছে সে।
আহা, তাই যেন হয় গো। মনে মনে বলি। তাই ভেবে ভরসা পেতে চাই নিজের মনে।
কিন্তু না, লালবাজার লক-আপ-এ গিয়ে যখন আমরা নামলাম, সেখানেও দেখা গেল না রিনিকে।
তুমি যে বললে, সে আমাদের সঙ্গে এসেছে? কোথায় সে? শুধাই আমি দেবেনকে।
আলাদা ঘরে তাকে রেখেছে। জবাব পাই দেবেনের–মেয়েদের ছেলেদের সঙ্গে রাখে নাকি কখনো? বিশেষ করে এই রাত্তির বেলায়!
রাখে না? কেন রাখে না? কী হয় রাখলে?
কী হয় কে জানে! কেন রাখে না তা কে বলবে! তবে রাখতে নেই নাকি। রাখে না যে তাই জানি।
রিনিকৈ এখানে রাখলে, আমাদের সঙ্গে থাকলে কী যে ওর ক্ষতি হত আমি তো তা ভেবে পাই না। এমন বিচ্ছিরি লাগে আমার যে!…জেলে যাওয়াটাই যেন কেমন ব্যর্থ বলে মনে হতে থাকে।
যে জেলখানা স্বর্গোদ্যানের ন্যায় চোখের সামনে উদ্ভাসিত ছিল, তা যেন পলকের মধ্যে অশোকনের মত নির্বাসিত হয়ে যায়। সব আলো যেন নিবে যায় এক লহমায়।
লালবাজারের হাজতঘরে পৌনোর পরে আমরা চা আর টোস্ট পেলাম। দেবেন বলল, রাত্রের মত এই যা খেলে। এর পর হরিমটর! এসো এখন শুয়ে পড়া যাক আরাম করে–কী বলে?
সকালে উঠে আবার আমরা সেই এক কাপ চা আর খান দুই টোস্ট পেলাম।
কিন্তু রাতউপোসী খিদে কি তাতে বাগ মানে? পেট চুই চুই করতে লাগল আমার।
আর কিছু খেতে দেবে না এরা? একদম না? আমি কুঁই কুঁই করি–আবার কখন খেতে দেবে তাহলে?
এখানে বোধ হয় আর নয়। দেবেন কয়, দুপুরে টিফিনের সময় সেই আদালতের লক আপ- এই যা চা টোস্ট দেবে হয়ত-এই রকম আবার। সেখান থেকে জেলে নিয়ে যাবার পর সেইখানেই মিলবে ভরপেট খাবার। ডাল রুটি তরকারি-বেশ মোটা মোটা রুটি, পালা পাতলা ডাল আর জংলী যত তরকারি। সন্ধ্যের আগেই খেতে দেবে সবাইকে। খাইয়েই ঢুকিয়ে দেবে যার যার সেলে।
সেই সন্ধ্যের সময়? শুনেই আমি মুষড়ে যাই। তার কথাটা কেমন যেন খট্ করে কানে লাগে–খটকাটা লেগেই থাকে।
জংলী তরকারিটা কী ভাই? উসকে উঠি আমি তার পরেই। জানতে চাই।
বনজঙ্গল কেটে বানানো। পাড়াগাঁর ঝোঁপঝাড়ে যে সব কাঁটা গাছফাছ আর আগাছা গজায় না? তাই সব কেটে হেঁটে নিয়ে আসে কোত্থেকে। তারই জগাখিচুড়ি করে দারুণ এক ঘ্যাট বানায়। যত খুশী খাও–যত চাও। এন্তার দেবে।
কি রকম খেতে?
ওই একরকম। সে বলে-রোজই ওই একরকম। রোজ বিকেলেই ওই রুটি তরকারি। সকালে ঘুম থেকে উঠে অবশ্যি কিন্তু অন্য রকম–গাদাখানেক লসি দেবে তোমায়–মুখ ফেরাতে পারবে তখন। খাও না কষে যত খুশি। পেটভর্তি পাবে তোমার।
লপসিটা কী জাতীয়? কি রকম আবার?
ডালে চালে মেশানো ঘন্টের মতন।
ও! খিচুড়ি! তাই বলো না সে তো খেতে ভালোই হে! খাসা! উপাদেয়।
খাসা? হ্যাঁ, খাসাই বটে। দেবেনের দ্বিমত দেখি না–সকালে খিদে পেটে খেতে মন্দ লাগে না বলতে কি!
রোজ দেয়? ঐ লপসি-রোজ রোজ?
রোজ রোজ। সে বলে–কিন্তু সে ওই সকাল বেলাতেই কেবল।
তবে তো ভালো। খুবই ভালো তা হলে। এতক্ষণে আমি উৎসাহ পাই, লালায়িত হয়ে উঠি–সকালবেলাতেই আমি অনেকখানি করে নিয়ে রাখব। আর সারাদিন ধরে খাব–একটু একটু করে–যখনই আমার খিদে লাগবে। ওই লসিই তো আমি মল্লিকবাড়ির সদাব্রতে খাই হে। সেখানকার ভাড়ারায় তাই তো দেয়?
