ঘোল খাওয়া আর কি! সে হাসে-ঘোল খাওয়ানোও বলা যায়। আমাদের ভালোবাসাটাই হচ্ছে তাই। ঘোল খাও আর খাওয়াও।
তবে কারো কারো বরাতে কি আর ত্রিবেণীসঙ্গম ঘটে না?
ঘটে বোধ হয়। চাপা গলায় কথাটা সে কয় রিনির দিকে আড়াআড়ি কটাক্ষে চেয়ে কিন্তু দুটো বেণীই তো দেখছি মেয়েটার। বুকের দু-দিকে এসে পড়েছে।… আরেকটা মানে তোমার ত্রিবেণীর তৃতীয় বেণীটা বোধ হয় ওধারে ঝুলছে। তোমার বোন যখন, ত্রিবেণী না বলে ত্রিবোনী বলাই ভালো।
বোন আর কোথায় ও? গঙ্গার ঢেউ খেয়ে খেয়ে বোনটোন সব ধুয়েমুছে গিয়ে বন্ধুই বলা যায় এখন। মনে মনে বলি–ওর কাছে যতই ঋণী হই না, তিনি আমার বন্ধুই। বোনও আবার সে আমার।
পাশাপাশি সার বেঁধে দাঁড়ানো সব কটা কয়েদী-গাড়িই ভর্তি হয়ে উঠল একে একে লোহার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে দেখে যাচ্ছি আমরা।
বোঝাই হবার পর গালিলা ছাড়তে লাগল একটার পর একটা। কোমরের বেল্টে রিভলবার বাঁধা, বেটন হাতে একজন করে সার্জেন ঢুকছিল গাড়ির ভেতরে আর একটা করে খাড়া থাকছিল বাইরের পা-দানিটায়।
আমাদের গাড়িটাও ভরে গিয়েছিল, সবগুলো ছেড়ে যাবার পর এটাও ছাড়ল শেষটায়।
বেটন হাতে সার্জেনটা ভেতরে এসে সেঁধুতেই দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ছেড়ে দিল প্রিজন ভ্যান। ছুটল ভোঁক ভোঁক করে।
গাড়িটা ছাড়তেই আমার এ-পাশের ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠেছে–মহাত্মা গান্ধী কি জয়!
অমনি সেই সার্জেনটা বলের এক গুঁতো বসিয়ে দিয়েছে তার পেটে–আর সে কোঁক করে উঠে কুঁকড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে নিজের হাঁটুর ওপরে। তারপরই দেবেন ওপাশ থেকে চেঁচাতে গেছে-ব…
অমনি তার হাঁটুর ওপর এমন এক চিমটি কেটেছি না আমি–যার নাম রামচিমটি! চীৎকারটা তার বন্ করে উঠে গিয়েছে মাথায়! বন্দে মাতরম্-এর ছন্দপত হয়ে গেছে তার। সূত্রপাতেই বন্ধ!
সেও একটা শিব্রাম চিমটি বসায়-ভীতুর ডিম কোথাকার! চাপা গলায় সে আওড়ায়।
এখানে আর টুঁ শব্দটিও না! হাঁটুতে হাত বোলাতে বোলাতে সেই গলাতেই আমার জবাব জানো না? পড়েছ মোগলের হাতে-খানা খেতে হবে সাথে।…এখানে কোনো গোল পাকিয়ে না আর।
রিনির দিকে তাকিয়ে দেখি, একটা আঙুল নিজের ঠোঁটে চেপে রয়েছে। নীরবে একই অনুপ্রেরণাই দিচ্ছিল সে আমায়।
পাশের ছেলেটা তেমনি কুঁকড়ে পড়ে আছে-নড়ছে চড়ছে না একদম। যতক্ষণ গাড়িটা চলল সেই রকমই পড়ে রইল সে। মাথা তুলতে পারল না আর।
থানায় গিয়ে গাড়িটা খাড়া হতেই গাড়ির দরজা খুলে গেল। প্রথম ছেলেটা লাফ দিয়ে নীচে নেমেই হাঁকল-বন্দে মাতরম।
সেই সার্জেনটা তক্ষুনি তার মাথায় মেরেছে বেটনের বাড়ি।
মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে ছেলেটা। শুয়ে শুয়েই চেঁচাচ্ছে আবার-বন্দেমাতরম। বনদে…
এগোতে পারেনি আর সে। আওয়াজের সঙ্গেই সার্জেনটা তার পেটে মেরেছে বুটের এক ঠোক্কর।
কোঁক করে উঠেছে ছেলেটা! আর কোনো উচ্চবাচ্য নেই তার–অজ্ঞান হয়ে গেছে বোধ হয়। মাথার ফাটল দিয়ে রক্তের ফিনকি বেরিয়ে ভিজিয়ে দিয়েছে তার জামাকাপড়। রক্তে ভেসে গিয়েছে জায়গাটা।
মারা গেল নাকি ও? রিনি আমার পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে সভয়ে শুধোয়।
বুটের চোটে তো পিলে ফেটে মারা যায় শুনেছি-কোলোক ওদের বুটের ঘায়ে মারা গেছে ওরকম।
কী হয়েছে ওর কে জানে! রিনি কাঁদো কাঁদো হয়ে কয়ঃ ভাগ্যিস, তুমি আমার কথাটা রেখেছিলে, চেঁচাতে যাওনি। তা হলে তোমায়রা ঠিক ওই দশাটাই হতো। বলে সকৃতজ্ঞ নেত্রে সে আমার দিকে তাকায়।
তার কথা রেখে আমি যেন তাকে কত কৃতার্থ না করেছি।
প্রায় ওই দশাই হয়েছিল আমারও…গাড়িতে ওঠবার মুখটাতেই। সে কথাটা ওর কাছে আর প্রকাশ করি না।
ভাগ্যিস, আমার পিঠের দিকে পিলে ছিল না, (কারোরই থাকে না বোধকরি )। তা হলে গোরার ওই সবুট পদাঘাতের পর এতক্ষণ আর আমায় এমন অটুট থাকতে হত না। সেই ঠোকুরেই টক্ করে বৈতরণী পার হয়ে যেতাম।
রিনির সশঙ্ক নেত্রের মিনতি রেখে সেদিন ওকে যত না কৃতার্থ করেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি চরিতার্থ হয়েছি আমি–টের পাচ্ছি আজ। সেদিনকার সেই রুলের গুঁতো উদরসাৎ করলে আজ আর এই চরিত-কাহিনী লিখতে হত না আমায়–এ বাবদে দক্ষিণার অর্থটাও মাঠে-মারা যেত, আমার মতই প্রায়। সবদিক খতিয়ে দেখলে সেদিন আমি খরচ হয়ে গেলে কোনোভাবেই তার কিছুমাত্র ক্ষতিপূরণ ছিল না।
সবাই আমরা নেমে এসেছি ভ্যানটা থেকে। আমার পাশের সেই ছেলেটি কিন্তু তেমনি কুঁকড়ে পড়ে রয়েছে। নড়ছে-চড়ছে না।
দেবেন এবং আরো দুজন ছেলে উঠে গিয়ে ধরাধরি করে তাকে নামিয়ে আনল ভ্যানের থেকে। রাখল এনে থানার চত্বরে।
সে বেচারীও চৈতন্য হারিয়েছে। কোনো হুঁশ নেই তারও।
থানার ওসি বেরিয়ে এলেন থানার ভেতর থেকে তক্ষুনি। আমাদের সবার দিকে তাকালেন একবার। বেহুঁশ ছেলে দুটির দিকেও দৃষ্টি গেল তাঁর। এক পাহারাঅলাকে অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করতে বললেন।
একটু বাদেই একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে তাদের দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
.
৪৪.
থানার একটা ঘরে গিয়ে আমরা জমা হলাম সবাই। বাড়িটার সামনে একটা পার্ক আছে নজরে পড়ল। ছোটখাট পার্কটা। সেন্ট জে স্কোয়ার, বলতে শুনলাম একজনকে।
মুচিপাড়া থানায় নিয়ে এসেছে আমাদের, সে জানালো।
ঘরজুড়ে আমরা গুলতানি পাকাচ্ছি সবাই মিলে।
