খুউব। হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
তা হলে তো ভেঙেছে হাড়।
না না, ভাঙেনি কিছু, তবে এইবার যদি ভাঙে! আমি বলি, যা জোর টিপছ–না! ঘোড়ার চাটে কেমন লাগে কে জানে। তবে তোমার টেপার চোটে তো আমি গেলাম! তুমি আমার এই পদসেবা না করলে বাঁচি ভাই!
আমার দেখাদেখি তুমিও হাইজাম্প দিয়ে উঠতে গিয়েছিলে বুঝি?
হাইজাম্প? হ্যাঁ,তাই বটে। তবে ঐ জাম্পটাই শুধু আমার, হাই তোলাটা অন্যজনের। তবে হ্যাঁ, তুমি যা হাইজাম্পটা দিলে না, দেখবার মতই! বাঘরা যেমন-না পিছিয়ে গিয়ে লাফ মারে সামনে–দেখিনি কখনো, কানেই শোনা, তোমার ঐ লাফানিটা প্রায় সেই রকমই হয়েছিল ভাই! তবে আমি-আমি কিন্তু তোমার লাফাবার বাঘে ছিলাম না, ছিলাম পালাবার বাগে! কিন্তু পালাতে পারলাম কোথায়!
পালাতে যাচ্ছিলে বুঝি?
পারলুম কই। সামনে চুম্বকের টান ছিল না? সেটা আর কাটানো গেল না।
বুঝেছি! ঐ গঙ্গা! গঙ্গাই! দেশবন্ধুর আকর্ষণ! সমঝদারের মত সে মাথা নাড়ে।
না, তোমার সে-গঙ্গা নয় ভাই! আমার সুরধুনি! কিন্তু…।
কোথায় গেলেন উনি? এতক্ষণের পর আমি রিনির দিকে নজর দিই। কয়েদী গাড়ির সামনের বেঞ্চিতে আর সব ছেলের মধ্যে ঠাসাঠাসি হয়ে বসে রিনি ভয়ে যেন শিটিয়ে কি রকম চোখে আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমার কখানা হাড়ের শরীর নিয়ে সত্যিই আমার সর্বাঙ্গীণ সঠিক টিকে আছি কি না সেই সংশয়েই সে মুহ্যমান ছিল বুঝি।
তার দিকে তাকিয়ে আমায় এখন একটু হাসতে দেখে এতক্ষণে বুঝি স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল তার।
তুমি রেলিং ডিঙিয়ে ঢোকার মুখেই তোমাকে আমি দেখেছিলাম, নীচু গলায় বলছিল দেবেন, কিন্তু তোমার বোনের সঙ্গে গল্পে মশগুল হয়ে আছে বলে আমি আর তোমায় ডিস্টার্ব করিনি।…
বোন? শুনে আমার চমক লাগে।
ওই তো সামনেই বসে। সে ইঙ্গিতে দেখায়-বোন না?
হ্যাঁ, বোনই বটে। আমি বলি–যখন ভাইফোঁটা দিয়েছে তখন বোনই তো।
মা-র পেটের বোন নয় বুঝি?
না। সহোদরা নয়, তবে সহৃদয়া বোন বলা যায় নিশ্চয়।
বোনকে কনটেশনের ব্যাপার করে তুলে কথা আর না বাড়িয়ে ঐ একবাক্যেই আমার সেরে নেওয়া।
সে আবার কী ভাই?…সে আবার কী রকম বোন?
কি রকমটা বলব? ঠিক তোমার ঐ গঙ্গার মতই। তুমি তো খালি দেশবন্ধুর মধ্যেই গঙ্গা দেখেছ কেবল? উনি হচ্ছেন মোহানা মুখের গঙ্গা-যেখানে মহাসাগরের সঙ্গে মিশে গিয়ে উনি উন্মুখর, উদার, উচ্ছল–তাঁর মহাসঙ্গীত শোনাচ্ছেন সবাইকে। তেমনি আবার গোমুখীর গঙ্গাও রয়েছে না? হরিপাদপদ্ম থেকে বিগলিত হয়ে যে গঙ্গা শিবের কেশস্পর্শ করে…অম্বর হইতে সমশতধারা জ্যোতিপ্রপাত তিমিরে–দ্বিজেন্দ্রলালের সে-ই যে, মনে পড়ছে? সেও এক গঙ্গা আবার। গো অর্থে অনেক কিছু বলেন বাবা-গো বলতে এই পৃথিবীকেও বোঝায়। ধরিত্রী মায়ের অন্তর থেকে উৎসারিত সেই করুণা-সেও তো ভাই ঐ গঙ্গাই– তোমার আমার মায়ের স্নেহধারার মতই নয় কি…।
এ আবার কী কপচাচ্ছ এসব?
আমার মার কথাই। গঙ্গা শুধু দেশবন্ধুর মধ্যেই না, তোমার আমার সবার ভেতর দিয়েই সমানে বয়ে যাচ্ছে। উনি মোহানায় আছেন, মানে ঐ দেশবন্ধু আর আমরা আছি গঙ্গার ভিন্ন ভিন্ন ঘাটে। কেউ গঙ্গোত্রীতে, যেমন আমার সন্ন্যাসী বাবা ছিলেন এক সময়, কেউ হরিদ্বারে, যেমন আমার মামা, কেউ কাশীর মনিকর্ণিকায় আমার অন্নপূর্ণার মত মা যেমনটা, কেউ বা আবার এই কালীঘাটে। যেমন ধরো এই আমরা।
হয়েছে। হয়েছে! তত্ত্বকথায় আমার মস্ত হওয়া তার পছন্দ হয় না। তার বিরক্তি প্রকাশ পায়।
তেমনি সেই এক গঙ্গারই ফের অনেক নাম। আমিও সহজে ছাড়বার পাত্র নই; সুযোগ এলেই সুবিধা পেলেই মাকে আমার না জাহির করে যেন নিস্তার নেই। অলকানন্দা, জাহ্নবী, পদ্মা, ভাগীরথী-কত কী! আবার যার টানে রসাতলে যেতে হয়, ভূতলের সেই ভোগবতীও বলতে গেলে প্রকৃতরূপে গঙ্গাই। গঙ্গা, মানে হচ্ছে ভালোবাসা। আমাদের ভালোবাসাই আসলে গঙ্গা।
জানি জানি। তোমাকে আর অত ব্যাখ্যান করতে হবে না। সে অধৈর্য হয়।
কিচ্ছু জানো না। কী করে জানবে? এ সব মার কাছ থেকেই তো জানা যায়। কোনো বইয়ে মেলে না। তোমার মা কি বলেছেন তোমায়? তিনি না জানিয়ে থাকলে জানবে কোথা থেকে শুনি? গঙ্গার আবার কতো না ধারা-তা জানো? কত যে সঙ্গম। ধারণা করতে পারো?
গঙ্গাসাগর সঙ্গম কে না জানে বাবা!
গঙ্গা মানে তো ভালোবাসাই? কিন্তু ভালোবাসা আবার কত রকমের হয় যে। মনের ভালোবাসা, প্রাণের ভালোবাসা, দেহের ভালোবাসা–ভাগীরথী, যমুনা, সরস্বতী–এই ত্রিধারায় মিলেই না সেই ত্রিবেণীসঙ্গম। তার খবর রাখো?
সবাই রাখে। হাওড়া লাইনের হুগলি জেলায় বাঁশবেড়ে পেরিয়ে খানিকটা গেলেই সেই ত্রিবেণী। আমরা একবার চড়ুইভাতিও করে এসেছি সেখেন থেকে। আবার গয়া প্রয়াগ পার হয়ে এলাহাবাদের কাছেও বোধ হয় আরেক ত্রিবেণী আছে।
আরো আছে, আরো আছে। আরো ওপরে, আরো ওপরে–গঙ্গোত্রীর পথে। জলধর সেনের হিমালয় পড়ে দেখো। আবার আমাদের সবার মধ্যেও রয়েছে সেই ত্রিবেণী পরস্পরের সম্পর্কে এসে দেহমনপ্রাণের ভালোবাসা মিলেমিশে সেও এক ত্রিবেণী। পরস্পরের জীবনধারার সঙ্গমে ত্রিবেণী হয়ে ওঠা।
আর তোমার ওই সাগরসঙ্গম?
সেও ঐ ভালোবাসাই–আরো বিপুল, আরো বিরাট। ভগবানের প্রতি ভালোবাসা হলে সেটাই হলো সাগরসঙ্গম–সে কি সবার হয় নাকি? সে শুধু তোমার ঐ চিত্তরঞ্জন, রবীন্দ্রনাথ আর পরমহংসদেবেরই হয়েছে। আমার তো কালীঘাটের গঙ্গা–আমাদের জল কাদাগোলা ঘোলাটে। খালকাটা কালীগঙ্গার সেই ঘোলা জলেই স্নান সারতে গিয়ে খালি নাকানিচুবানি খাওয়া আমাদের।
