ডজনখানেক ধরে ইনস্পেক্টর তাদের সভার বাইরে নিয়ে যায়, সেখানে পাহারাওলাদের জিম্মা করে দেয়। পুলিসরা একটা গভীর ভেতর তাদের ঘিরে রাখে। সেখানে দাঁড়িয়ে তারা বন্দেমাতরম, গান্ধী মহারাজ কী জয়! দেশবন্ধু কি জয়! ইত্যাদি হাঁকতে থাকে।
এমনি করে মাথা মাথা জনাপঞ্চাশেককে পাকড়ে পার্কের বাইরে নেয়। সেখানে সারি সারি প্রিজনভ্যান দাঁড়িয়ে ছিল, তার ভেতরে ভরতে থাকে। তারপরও সভায় বালখিল্য যারা বাকী ছিল তারাও মহাজন পদাঙ্ক অনুসরণে একে একে খাড়া হতে থাকে–ভারতের স্বাধীনতা চাই। মহাত্মা গান্ধীজী কী জয়! ইত্যাদি বহুৎ বাগবিস্তার করলেও পুলিস তাদের প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করে না। পালের গোদাদের পাকড়ে নিয়ে চলে যায়। সেদিনকার সভাটা সেখানেই সমাপ্ত।
দূর। এ কী হলো। ধরলই না তো আমাদের… রিনি বললে-আইন ভাঙবার সুযোগই পেলাম না আমরা।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করলাম কেবল…ধরা পড়লাম কোথায়? আমিও আক্ষেপ করলাম।
দাঁড়াও, চেষ্টাচরিত্র করে দেখা যাক-না। প্রিজনভ্যানে গিয়ে উঠে পড়ি না কেন? ফাঁক পেলেই উঠে পড়ব, কেমন? রিনি পথপ্রদর্শন করে–আমরা প্রিজনভ্যানগুলোর কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াই-আমি আগে উঠব, বুঝলে? তুমি তার পরেই এসো। আমি আগে, আমাকে যদি না নেয়, তুমি ধরা পড়তে যেয়ো না যেন। কেমন?
তুই না গেলে কিসের জন্যে যাবো শুনি? কোন্ সুখটা আছে আমার সেখানে? তোর বিহনে জেল তো আমার কাছে অন্ধকার! কে আছে সেখানে আমার?
ওর পিছু পিছু আমিও প্রিজনভ্যানের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াই। তটস্থ হয়ে থাকি দুজনাই। বিনি একটুখানি ফাঁক পেতেই না এগিয়ে প্রিজনভ্যানের হাতল ধরে টুক করে লাফিয়ে উঠে পড়ে কেউ বাধা দেবার আগেই।
এইবার দেবেনকে এগিয়ে আসতে দেখি।
এতক্ষণ তাকে দেখতেই পাইনি। রিনির আলোয় চারধার যেন অন্ধকার হয়ে ছিল, নজরে পড়েনি তাই আমার। এবার সে এগিয়ে এল।
এগিয়ে এসে একটু তাকে পিছিয়ে যেতে দেখলাম। একটু পিছিয়েই না, দৌড়ে এসে হাইজাম্প দিয়ে সে ভ্যানের ভেতরে গিয়ে পড়ে। বাঘরা শুনেছি এমনি করে নাকি লাফ মারার আগে একটুখানি পেছোয়।
আমিও তার পিছু পিছু গিয়ে হাতলটা পাকড়াই–কিন্তু ঐ পর্যন্তই। সামান্য বাহুবলে আমার কিছুতেই আর নিজেকে টেনে তুলতে পারি না। হাতল ধরে ভ্যানের দরজায় ঝুলতে থাকি। বৃথাই আমার জেলে যাওয়ার এই ভ্যানিটি–কেবলই আমার মনে হয়।
কাছেই একটা গোরা সার্জেন্ট দাঁড়িয়েছিল, সে না আমার পেছন থেকে এইসা এক শট মারলে না…!
তার সেই ধাক্কাতেই দরজা গলে ভ্যানের ভেতরে গিয়ে ছিটকে পড়েছি অবলীলায়। এই অযাচিত সাহায্যের জন্য সার্জেন্টকে থ্যাংকিউ বলে যে ফিরে ধন্যবাদ জানাবো তার ফুরসত পাই না।
.
৪৩.
সার্জেন্ট যা কিকখানা ঝাড়ল না, আমি একবারে কর্নার। তার সেই এক শটেই আমার কর্নার হয়ে গেছে। দরজার গোল দিয়ে গলে ভ্যানটার কোণ ঘেঁষে গিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়লাম। নড়নচড়ন নেই, জবুথবুর মত পড়েই রইলাম তেমনি।
না, বেহুঁশ হইনি, তবুও কেমন আচ্ছন্নের মতন পড়ে রয়েছি অনেকক্ষণ।
মনে হচ্ছিল অনেকক্ষণ, কিন্তু তা হয়ত নয়, একটু বাদেই একজনের সবল বাহু আমাকে টেনে তুলে তার পাশে বসিয়ে দিয়েছে বোঝা গেল।
চেয়ে দেখি দেবেন।
লেগেছে? লেগেছে খুব?
আমি ঘাড় নেড়ে জানাই-না। তেমনটা নয়।
হাড়গোড় ভেঙে যায়নি তো?
কে জানে!
কে জানে–তার মানে? ভেঙে গেলে তো টের পাবে–ব্যথা করবে বেজায়। হাত-পায়ের কোথাও কোনো টনটন করছে না তোমার?
মুখে বললাম বটে যে, না, কিন্তু যেহেতু হতজ্ঞান হইনি, মনের মধ্যে জ্ঞান টনটন করছিল বেশ।
ঘোড়ার চাট তো খেতে হয়নি আর, এই ভেবে সান্ত্বনা পাবার চেষ্টা করছিলাম। সামান্য এক জনবুলের চোটেই যদি এই হয় তা হলে ঐ সব অসামান্য অশ্বতমর পায়ের তলায় পড়লে কী দশাটাই না হত আজ আমার!
খুব বাঁচটা বাঁচা গেছে আজকে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি তাই ভেবেই।
আমি দেখেছি, এইভাবেই জীবনের দুঃখকষ্ট লাঘব করতে হয়, খেদ-বেদনা ভুলতে হয়। সব। পায়ে কাঁটা ফুটলে ভাবতে হয় পা-টা কাটা পড়তেও তো পারত ট্রেনে কিংবা মোটরে। তাহলে কী হতো? একটু কাঁটার ওপর দিয়েই ফাঁড়াটা কাটানো গেছে।
এ ছাড়া আর দুঃখ ভোলার কোনো সূক্ষ্ম উপায় নেই।
স্কুল পথ আছে অবশ্যি। রাবড়ি।
এক ভাঁড় তাই নিয়ে চাখতে চাখতে চললে জীবনের যত জুলুম, যত না দাবড়ি পলকে ভোলা যায়। এমন কি, পথ-চলতি যে-শ্রীময়ীরা আশপাশ কাটিয়ে চকিতের দেখা দিয়ে অবলীলায় চলে যাচ্ছেন চিরদিনের মত, অচেনা থেকে শুধু স্মৃতিটুকু রেখে হারিয়ে গেলেন চিরকালের মত–একেবারেই, সে কষ্টও আর মনে তেমনটা লাগে না।
মিষ্টি জিনিসের কোনোটা অধর পথে সেঁধিয়ে হৃদয়ে গিয়ে জমে, কোনোটা আবার হৃদয় ভেদ করে উদরদেশে গিয়ে পৌঁছয়। তাই এক মিষ্ট বস্তু হারানোর মর্মভেদী দুঃখ ভুলতে হলে আরেক মিষ্টি দিয়ে তার মর্মান্তিকতায় গিয়ে শরণ নেওয়া, এক প্রিয়জনের বিরহে যেমন আরেকজনার প্রয়োজন। অন্য মিষ্টের দ্বারা অভাব মোচন না হলে তখন বিকল্প ওই মিষ্টান্নই!
জীবনের যত দুঃখ ভোলার মুখ্য উপায় সেই রাবড়ির ভাঁড়েই রয়েছে–অভাবনীয় ভাবে গতি স্ত্বং গতি স্ত্বং তমেকা–সেই ভবানী।
পাশে বসিয়ে দেবেন আমার হাত পা ঘাড় পিঠ কোমর সব টিপে টিপে দ্যাখে-লাগছে?
