বানিয়ে বানিয়ে লিখতে ইতিহাস! সে হাসে-সে একটা নতুন ইতিহাস হতো নিশ্চয়।
ইতিহাস তো সব মনগড়া ব্যাপার রে! যে কালে ওসব কাণ্ড ঘটেছিল সে সময় কি এখনকার কেউ থেকেছিল, দেখেছিল? সব ইতিহাসই তাই।
তোমায় বলেছে! বলতে বলতে সভার মাঝখানে শোরগোল উঠল খুব। নেতা-টেতা এলেন বোধ হয়, বলল সে।
গান্ধীটুপি মাথায় বয়স্ক কয়েকজনকে আসতে দেখা গেল সভাস্থলে–তাঁদের ঘিরে জয়ধ্বনি হতে লাগল।
কে জানে কে! আমি তো চিনি না সবাইকে। আমি বলি-এবার বোধ হচ্ছে শুরু হবে সভাটা। চল সবার মাঝখানে বসি গে।
দাঁড়াও না। এখন কী। এখনই কী। পুলিস পাকড়াবার সময় এলে তখন। ততক্ষণ গল্প করা যাক না!…বক্তৃতা শুনতে আসিনি, বক্তৃতা করতেও না। জেলে যাবার জন্যেই
সেছি তো! জেলে যাওয়া অতো সোজা নয় মশাই! জেলের থেকে বার হওয়া যেমন শক্ত ব্যাপার, জেলের মধ্যে ঢোকাটাও তেমনই! একটা ছেলে বলছিল না আমায়…সে তো আজ…
বলতে হবে না কাউকে, আমার জানা। রিনি জানায় কদিন ধরেই তো চেষ্টা করছি আমি। কিছুতেই যেতে পারছি না। নিচ্ছেই না আমাকে। ধরবামাত্র ছাড়ছে, নয়ত থানায় নিয়ে গিয়ে
কেন, ছেড়ে দিচ্ছে কেন তোকে?
মেয়েছেলে বলে, তাই। কেন, মেয়েরা কি মানুষ নয়? তাদের কি দেশ না? তারা। কিছু করতে পারে না দেশের জন্যে? বলতে বলতে সে উকে ওঠে-ছেলেরা জেলে যাবে আর আমরা যেতে পাব না? আজও যদি না নেয় আমায় তো কাল আমি আসব আবার একেবারে ভোল পালটে–একটা ছেলে হয়ে, তুমি দেখো।
কি করে ছেলে হবি? শুনে তো আমি হতবাক্তা হওয়া যায় নাকি কখনো?
ফ্রক খুলে হাফ প্যান্ট পরব, চুল কেটে ফেলব ছোট করে–এই লম্বা বিনুনি আমার ছেটে ফেলব দেখো না!
না না! আমি চেঁচিয়ে উঠি-খবর্দার না, দেশের জন্য আর যা করিস কর, কিন্তু তোর নিজের কোনো অঙ্গহানি করতে দেবো না।
ওর এক চুল এদিক-ওদিক হওয়াটা যেন আমি সইতে পারি না। ওর বেণীসংহারে আমার আপত্তি।
দেশের জন্য এক চুল স্বার্থ ত্যাগ করতে পারো না এই তোমার দেশকে ভালোবাসা? তার দু চোখ যেন জ্বলে ওঠে।
আমার চুল হলে করতাম। আমি ন্যাড়া হয়ে যেতে পারি দেশের জন্যে। কিন্তু তোর চুলের স্বার্থ ত্যাগ করা আমার পক্ষে ভারী শক্ত। না, তুই ও কাজ করতে পাবিনে।
এখনো এ চুল তোমার হয়নি মশাই। আমার যা ইচ্ছে করব। তুমি কে বলবার?
কথাটায় আমি একটু চোট খাই। মনে কেমন লাগে। ওর একচুলের তফাত আমার অসহ্য, আর ও কিমা এক কথায় আমায় সাত হাত সরিয়ে দিল। নস্যাৎ হয়ে গেলাম!
তাহলেও তুই ধরা পড়ে যাবি হাজার চুল ছোট করে ছাঁটলেও। তুই যে মেয়ে তা একটুতেই টের পেয়ে যাবে সবাই। আমি সেই একটুখানির প্রতি কটাক্ষ করে কই-হাজার তুই চেষ্টা কর না, লুকোতে পারবি না কিছুতেই।
তাও আমি ভেবে রেখেছি। আমার অপাঙ্গদৃষ্টি লক্ষ্য করে সে বলে-বাবার কাছে ব্যাণ্ডেজ আছে না? তাই দিয়ে বেশ টাইট করে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে নেব, একাকার করে ফেলব দেখো না তুমি।
তাহলে আর দেখবার কী থাকবে। আমার মতে সেটাও ভালো হবে না। তবে তেমনটা হলে কেউ টের পাবে না হয়ত বা, কিন্তু সেটা কেবল ওই তোর পক্ষেই সম্ভব। তুই আর সব মেয়ের মত নয়তো ঠিক…তুই বোধ হয় তত বড় হোসনি এখনো, নইলে আর সব মেয়েদের যেমন…যেমনটা কিনা… তোর এটা একটা খুঁতই হবে বোধ হয়। একটুখানি আমার খুঁতখুঁতুনিই থেকে যায়।
রিনির ওই ইতরবিশেষ লক্ষ্য করেই আমার বলা। কিন্তু সেহেতু তার বিশেষ দুঃখ দেখা যায় না-এই তো ভালো বেশ। তেমনটা হলে আমি ফ্রক পরতে পেতুম না আর দিদির মতন আমাকেও শাড়ি পরতে বাধ্য করত মা-অ্যাদ্দিনে আমার বিয়ে হয়ে যেতো তাহলে।
শাড়ি হলেই শ্বশুরবাড়ির সুখ থাকে কপালে? তাই বুঝি? আমি বলি-সুখের সঙ্গে শাড়ি জড়ানো? তবে হ্যাঁ, জানি, শুকসারী বলে থাকে কথায়।
তবে তবে? এবার আমার দোসরা শ্বশুরবাড়ি আটকায় কে? আমার সবিস্ময় দৃষ্টি দেখে সে কয়-জেলখানাকে দ্বিতীয় শ্বশুরবাড়ি বলে জানো না বুঝি?
তাহলেও এই বিয়ের যেমন বর নেই-আমি প্রকাশ না করে পারি না–তেমনি সেই শ্বশুরবাড়ির সুখও নেই তোর বরাতে। থানায় নিয়ে গিয়েই তোকে ছেড়ে দেবে আবার দেখিস।
কেন, ছাড়বে কেন? আমি তো আর মেয়ে নই, ছেলেই তো তখন।
ছেলে হলে কী হয়? ছেলেদের গালেও এমনি করে তারা হাত বুলিয়ে দ্যাখে… আমি দৃষ্টান্ত দ্বারা বিশদ করি–এই ভাবে।
পুনশ্চ বলি, দাড়ি বেরিয়েছে কিনা দেখে নেয়। আর না বেরুলেই তারা ছেলের সঙ্গেও ঐ মেয়ের মতই ব্যবহার করে থাকে। থানার বার করে দেয় ধরে।
দিলেই হোলো। আমার গায়ে…মানে, আমার গালে হাত দিতে দেব কেন তাদের?
তোর বাধা তারা মানছে কি না! পুলিশ কারো কথা শোনে! তবে কারো গালে হাত দেওয়াটা উচিত নয় তা বটে… বিশেষ করে গালের মতন গাল হলে। আমিই যে এখন একটু হাত বুলিয়ে নিলাম, সেটাই কি ঠিক হোলো নাকি? গাল হস্তক্ষেপের জায়গা নয় জানি, হাত হচ্ছে হাতাহাতির জন্য আর গাল হচ্ছে…গাল হচ্ছে গিয়ে…কিন্তু এখন এখানে তোর সঙ্গে গালাগালি করলে সেটা কি ভালো দেখাবে? বলবে কি লোকে!
রাখো!…ঐ দ্যাখো, একজন আইন ভঙ্গ করছে…বেআইনি সভায় বক্তৃতা করতে উঠেছে দ্যাখো!
গান্ধী টুপি-পরা লোকটা দুএকটা কথা বলতে না বলতেই একজন ইনস্পেক্টর এনে তাকে অ্যারেস্ট করেছে…তক্ষুনি উঠেছে আরেকজন…তাকেও তৎক্ষণাৎ! তৃতীয় ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বন্ধুগণ পর্যন্ত সম্ভাষণ করতেই না, ধরা পড়ে গিয়েছে সেও। এরপর পরের পর একজন করে উঠে দাঁড়ায় আর ধরা পড়ে ধরা দিয়ে যায় পরম্পরায়।
