বলে আমার যে গোঁফ নাকি নেই তাই আমি চুমড়ে দেখাই।
দেবেনকে ভিড়ের ভেতর পেলে হয় এখন! ভাবতে ভাবতে আঁকা-বাঁকা অলিগলি পেরিয়ে যথাস্থানে গিয়ে পৌঁছেছি।
ভিড় তখন আরো গভীর, জনতা আবোরা উত্তাল।
ঘোড়াদের দুর্জনতা আরো বেজায়। কিন্তু তাদের লম্ফঝম্প সেই আমহার্স্ট স্ট্রীটের বড় রাস্তা ধরেই। ওদের ত্রিসীমায় কে যায়? সে পথ না মাড়িয়ে আমি পার্কটার অন্য ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম।
সে ধারেও ভিড় আছে। অনেকেই খাড়া, তবে সে ধারে একটু কম। কিন্তু ভেতরে সেঁধুবার জো নেই কোনো ধারেই, ঘোড়া না থাকলেও পাহারাওলারা চারধার ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে হাত ধরাধরি করে।
ছেলেরা সব পার্কের রেলিং টপকে টপকে ঢুকছে–কেউ আটকাচ্ছে না। পাহারাওলারা কোনো বাধা দিচ্ছে না। তাদের বাহুবেষ্টনী ভেদ করে চলে যাচ্ছে মাঝখানের সভায়। ভলান্টীয়ারদের ওপর তাদের কেমন যেন সহানুভূতি রয়েছে মনে হোলো। ঘোড়ার সোয়ারী গোরা সার্জেন্টদের মত নয়।
মহাত্মা গান্ধীজী কি জয়! জয়ধ্বনি দিয়ে তারা পার্কের ভেতরে টপকে পড়ছে গিয়ে।
পশ্চিমা পাহারাওলারা বাধা দিচ্ছে না তাদের কাউকে। মনে হোলো সেই জয়ধ্বনির স্তরে তাদেরও ঠোঁট যেন নড়ে উঠছে একটু করে নিঃশব্দেই। নিঃশব্দে তারাও যেন আওড়াচ্ছে সেই কথাই। তারাও মনে মনে চাইছে ভারতের স্বাধীনতাই।
আমিও রেলিংয়ের ধার ঘেঁষে দাঁড়াই। যা খাড়া রেলিং! পারব টপকাতে?
ওদিকের রেলিং টপকে কে একটা মেয়ে ভেতরে গেল না? ফ্ৰকপরা মেয়ে একটা? এই চোদ্দ-পনেরর মতন?
একটা বাচ্চা মেয়ে টপকাতে পারে আর আমি পারব না? সে জেলে যাবে আর আমি পিছিয়ে পড়ে থাকব পেছনে?
আমিও টপকালাম। হেঁচড়ে-মেচড়ে ঢুকলাম কোনো গতিকে।
ইস্ এক কড়ারও বাহুবল বিধাতা দেননি আমায়! ভেতরে গিয়েই এক ছুটে সেই মেয়েটির মুখোমুখি গিয়ে পড়েছি।
দেখি ওমা! এ কে? রিনি নাকি? কাছাকাছি হয়ে চিনি, হ্যাঁ, রিনিই তো। রিনি, তুমি এখানে? তুই এখানে কী করছিস রিনি? কী করতে এসেছিস তুই?
ওমা, তুমি এসেছো এদ্দিনে? পৌঁছে তাহলে? যথাসময়ে যথাস্থানে? কথা-কাহিনীর সেই উপগুপ্তর মত সেই যে-সন্ন্যাসী উপগুপ্ত। মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে একদা ছিলেন সুপ্ত…?
এ নহে কাহিনী এ নহে স্বপন, আসিবে সেদিন আসিবে! আমিও রবীন্দ্রনাথ আউড়ে ওর কথার উতোর গাই। তা, তুই এখেনে যে! কী জন্যে এসেছেস শুনি?
তুমিও যেজন্যে আমিও ঠিক সেইজন্যেই। জেলে যেতে হবে না আমাদের এখন? এই দেশ স্বাধীন করবার যুদ্ধে মেয়েরা পিছিয়ে থাকবে নাকি? কী লিখেছিলাম তোমায়? অ্যাদ্দিন বাদে তুমি এলে!…একবার তোরা মা বলিয়া ডাক/জগতজনের শ্রবণ জুড়াকহিমাদ্রি পাষাণ কেঁদে গলে যাক /… সঙ্গে সঙ্গে রিনি একবারে সুরধুনী।
.
৪২.
কবে তোমায় লিখেছি চিঠি! সে কি আজকে? বলছিল রিনি-এত করে লিখলাম তোমায় যে চটপট চলে এসো কলকাতায়। দুজনে মিলে দেশের কাজে লাগব–তোমার সঙ্গে একসাথে জেলে যাব, লিখিনি? তা, না তুমি এলে, না-দিলে চিঠির একখানা জবাব!
রেলিং ঘেষে দাঁড়িয়ে কথা কইছিলাম দুজনায়।জবাব দেবো কি করে? তোর ঠিকানা জানলে তো? আমার সাফ জবাব। কোনো ঠিকানা-মিকানা ছিলো নাকি তোর চিঠিতে?
জানতে না তুমি? চাঁচল ছাবার দিন তোমায় বলে আসিনি ঠিকানা? আহিরিটোলায় আমাদের বাড়ির ঠিকানা বলে আসিনি তোমাকে?
বলেছিলিস বটে, কিন্তু আমার মনে থাকলে তো?
এতো যদি তোমার ভুলো মন হয়, কি করে পরীক্ষা পাশ করবে গো?
করিনি তো পাশ। করব না তো। সব পরীক্ষার পাশ কাটিয়ে এসেছি আমি। দ্যাখ রিনি, তোদের মেয়েদের এই একটা বড়ো দোষ। তোদের ধারণা তোদের মতন তোদের বাড়ির নম্বর-টম্বরও ছেলেদের মনে গাঁথা হয়ে থাকবে। আমি আরো অনেক মেয়ের দেখেছি এই রকম।
কটা মেয়ের দেখেছ এ রকম শুনি? কজনার সঙ্গে পত্রালাপ হয়েছে গো?
এ পর্যন্ত একজনার সঙ্গেও না। আর ওইজন্যেই তো। আমার ভাগনি, সুশীলাদির মেয়ে প্রিসিলা, অন্নপ্রাশনের সময় তার নামকরণটা আমিই করেছিলাম। এইটুকুন মেয়ে। কিন্তু এই বয়সেই মেয়েদের সব দুর্লক্ষণ তার মধ্যে বর্তমান! তাদের কোন আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে চিঠি দিয়েছিল আমাকে। ঐ প্রথম চিঠিটাতেই যা ঠিকানা দেয়া ছিল–তারপর আর যত চিঠি লিখল তার কোনটাতেই কোনো ঠিকানা নেই। প্রথম চিঠিটা কি করে যে হারিয়ে গেল–তার কোনো চিঠিরই আর উত্তর দেওয়া হলো না তাই। কি করে হবে? সে বোধহয় ভেবেছিল প্রথমখানায় ঠিকানা দিয়েছি সেই ঢের–তারপর নিশ্চয় আমি তার মতন তার ঠিকানাটাও মুখস্থ করে ফেলেছি… আমার স্মৃতিপটে তার মতই আঁকা হয়ে রয়েছে।
তাকেও মুখস্থ করা হয়েছে বুঝি তোমার? কেমনধারা চোখ করে সে তাকায়।
বা রে! ভাগনি না আমার? ভাগনি কি আদরের জিনিস নয়? এইটুকুন তো।.সত্যি, তুই ভারী সন্দেহবাদী, দারুণ সন্দিগ্ধচেত্রী।
ঠিকানা মনে না রাখতে পারো তো তোমার ইতিহাসের পরীক্ষার বেলায় করতেটা কি? রাজা-বাদশা লাট-বেলাটের জন্ম-কর্মের সাল তারিখ লেখবার বেলাতে?
যারা মেমারি রাখে তাদেরই ওসব মুখস্থ থাকে। তারিখ-টারিখের কোনো উল্লেখ না করে আমি মন থেকে সব বানিয়ে দিতাম। সব রাজাগজা লাট-বেলাটের স্বভাবচরিত্র কার্যাবলী প্রায় এক ধারার–সবাই হিতকর পরোপকারী প্রজারঞ্জক ইত্যাদি ইত্যাদি কোনো ইতরবিশেষ নেই কারো। সাল তারিখ না দেওয়ার জন্য কিছুটা নম্বর কাটা যেত অবশ্যই কী আর করা? আরে, ইতিহাস পাশ করা তো সবচেয়ে সোজা রে!
