ঐ জেলে গিয়েই জেলের শেকল ভাঙতে হবে আমাদের-বলছিল দেবেন।
সেও নজরুলের একটা কবিতার পদ আউড়েছিল তখন–এই শিকল পরা ছল আমাদের/শিকল পরা ছল।/ঐ শিকল পরেই শিকল তোদের করব যে বিকল!
কিন্তু জেলে যাওয়াও খুব সহজ নয়, বলছিল সে। জেলে একবার ঢুকলে যেমন তার থেকে বেরুনো বেজায় কঠিন, তেমনিই শক্ত নাকি ঐ জেলের মধ্যে ঢোকাটাও।
আমি শুধিয়েছিলাম, কেন, শক্তটা কিসের? গেলেই তো হয় জেলে।
অত সোজা নয় ভাই! বলেছিল সে। মাঝপথে ঘোড়ার এই বাধার কথাটা ভেবেই বলেছে নাকি?–আমি তিন তিনবার চেষ্টার পর তবে সাকসেসফুল হয়েছিলাম, জানো?
কী রকম, শুনি তো?
ধরে নিয়ে গেলেও তোমায় জেলে যেতে দেবে না। থানার থেকেই পত্রপাঠ ভাগিয়ে দেবে তোমাকে।
থানার থেকেই? কেন হে? সরকারের আইন ভেঙে গেছি। যেতে দেবে না? আবদার নাকি? আমার প্রশ্ন : ল ইজ ল? তা কি কখনো হ য ব র ল হয়।
হয়ই তো ভাই! প্রথমেই ওরা তোমার নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করবে, কেয়ার অফ-এর কথা জানাতে হবে তোমাকে।
কেয়ার অফ-এর কথা? কেয়ার অব আবার কি?
সেই যে খামের ওপর ঠিকানায় লেখা থাকে না কে.। অ, অমুক? বাবা কি কাকা কি কারো নাম গো? বলল দেবেন : তা আমায় যখন শুধালো তোমার নাম কি? তুমি কার কেয়ার অফ। আমার নামটা ঠিক বলেছিলাম, কিন্তু বাবার নাম, কি বাড়ির ঠিকানা দিইনি। টের পেয়ে বাবা যদি আমায় ঠেঙায় তখন? তাই মামার নাম-ঠিকানা দিয়েছিলাম আমি।
কী হলো তারপর?
থানার থেকে পাহারাওলা পাঠিয়ে খবর দিয়েছিল মামাকে। মামা তক্ষুনি ছুটে এসে আমার হয়ে মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল থানার থেকে আমায়।
মুচলেকাটা কী জিনিস ভাই?
কী তা কে জানে! হিন্দী কোনো কথা হয়তো।
ও বুঝেচি। মোচ লেখা! মোচ মানে হচ্ছে গোঁফ। একজন বলেছিল আমাকে। তোমার ওই গোঁফটোফের মতই কিছু হবে হয়তো।
তাই হবে বোধ হয়। ছেড়ে দিল তো সেবার আমায়। তার পরদিনই আমি আবার ধরা দিলাম-সেবারও আমায় ভাগিয়ে দিল থানার থেকে। আমার দাড়ি গোঁফ কিছু বেরয়নি বলে–আমি নাকি নাবালক এই ছুতোয়। নাবালকদের জেলে নেয় না কিনা।
তোমার নাবালকত্ব তুমি জাহির করতে গেলে কেন?
জাহির করতে হয় না। দারোগা গালে হাত বুলিয়ে দেখে নেয়…এমনি করে ভাই বলে সে গালে হাত দেয়। নিজের নয়, আমার গালেই।
এটা কী হলো তোমার?
একটু আদর করলাম আর কি। কেন, তুমি কি আদর করবার মত নও?
হেদোর দীঘির দীঘল আয়নায় ওর মুখের হাসি ভেসে ওঠে উছলে-দেখতে পাই। দেখে আমার চিত্তির জ্বলে যায়।
বেশ, আমিও তোমায় একটু করি তা হলে। তুমিও তো আদর করার মতই।
উঃ! আদরের ঠেলায় ককিয়ে ওঠে সে-এই কি আদর করা নাকি? এই তোমার আদর করার নমুনা? আমি কোথায় আলতো করে একটুখানি ছুঁয়েছি মাত্র আর তুমি কিনা, উঃ!
যার যেমন টিপ ভাই! আমার টিপ্পনি রাখি : আমার টিপসই ওই রকম! আনাড়ির মার তো!
আনাড়ি আমি সত্যিই–এ বিষয়ে। এর আগে আর কোনো ছেলেকে এভাবে আমি আদর-করিনি রিনির বাইরে আর কাউকে না–এ পর্যন্ত। মিথ্যে বলিনি সত্যিই।
ইস্। এমন লেগেছে না আমার! তুমি যদি ভীমভবানী হতে না, তা হলে তোমার এই আদরের চোটে দাঁতগুলো আমার চুরমার হয়ে যেত। ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ত এতক্ষণ।
ভালোই হোতো তাহলে। ঝুরিভাজা আর খেতে হোতো না জীবনে তোমায়। দারোগা এর প্রতিশোধ দেবে তোমাকে থানায়; আমি শাপ দিচ্ছি। কড়াপড়া হাতে কষে এমন তোমায় টিপবে না… শাপান্ত করে শান্তি পেয়ে সে শুধায় তারপরে থানায় তোমার নাম-ঠিকানা শুধালে কী জানাবে তুমি তখন, বলবেটা কী?
ঠিক ঠিকই বলব, আবার কী? বলব যে আমার কোনো ঠিকঠিকানা নেই মশাই?
বললে তাই শুনবে নাকি? পাগল আর বাউণ্ডুলে ছাড়া সেরকম কারো হয় না। তোমার নিজের না থাক, তোমার কেয়ার অফ-এর তত রয়েছে। কে তোমার কেয়ার অফ?
কেয়ার অফ ফুটপাথ। তার নামও যা ঠিকানাও তাই ঐ এক কথায় আমি প্রকাশ করি-ফুটপাতেই আমার বাড়ি আপাতত।
বেঁচে গেছ তাহলে। তোমার হয়ে মুচলেকা দেবার কেউ নেইকো আর। তার স্বস্তির নিশ্বাস পড়ে।
মুচলেকা দিতে হবে কেন আমাকে? আমার মুচলেকা তো বেরিয়েই রয়েছে। দেখতে পাচ্ছ না!
মুচলেকা বেরিয়ে আছে! সে আবার কী? সে অবাক।
কেন, এই যে আমার মোচ! আমার প্রদর্শনী দেখাই : আমার গোঁফের রেখা বেরিয়েছে। যে দেখছ না? চোখে পড়ছে না তোমার? রোজ আমি আয়নায় দেখি যে। দাড়িটা বেরোয়নি এখনো এই আমার দুঃখু।
এই তোমার মুচলেকা?
হ্যাঁ, এই তো! এ দেখলেই তারা আমার গালে হস্তক্ষেপ করবে না। ভাববে যে দাদা রয়েছে যে কালে, তার ভাইও আছে, গোঁফের ভাই ঐ দাড়িও রয়েছে কাছাকাছি। তোমার শাপ লাগবে না আর আমাকে। আমি হেসে জানাই : দাড়ি বার করা ভারী শক্ত ভাই। গোঁফ নিজ গুণে দেখা দেয়, কিন্তু দাড়িকে অনেক তোয়াজ করে অর্জন করতে হয়। নিত্য কামাতে হয় তাকে ঐ টাকার মতই। রোজ কামালেই দাড়ি বেরোয় আর টাকা বাড়ে, বুঝেছ? তা, না থাকগে দাড়ি, গোঁফ তো আছে, সেই ঢের। এই গোঁফ জোড়াতে দিলে চাড়া তোমার মতন অনেক পাবো! ওঁর মুখের ওপর দ্বিজেন্দ্রলাল ছুঁড়ে হতবাক করে দি।
গোঁফ না ডিম! সে ভ্যাঙচায়।
ডিমের মত হলেও তো বাঁচতুম! একটু একটু তা দিতে পারতুম তাহলে। সান্ত্বনা থাকত। মোচের ডিম ফেটে চিকেন গোঁফ বেরুতে একদিন! তারপর তাই হয়ে উঠত HEN গোঁফ-এহেন গোঁফ?…..
