গাধা থাকতে যদি না হয়, তাহলে আপনার ঐ ঘোড়া থাকতেও দেশ স্বাধীন হবার নয়। যা সব ঘোড়া বাবা! ভাবতেই আমার হৃৎকম্প হয়।
মাউন্টেড পুলিসদের কথা বলছ বুঝি? তাদের তাড়া খেয়েই পালিয়ে এসেছে এখানে? শুনে তিনি হাসেন-ও, তাই বলো? ই অশ্বদের টেক্কা দেবার মতলবেই অশ্বতর হতে চাইছ তাই?
অশ্বতর?
ঘোড়ার চাট তো ওই ঘোড়াতেই সইতে পারে। ঘোড়াকে তাদের ঘোড়াই কেয়ার। অশ্বতর হলে তুমিও পারবে। চাই কি দেশের নেতাও হয়ে যেতে পারো কোনোদিন বা! পলিটিশিয়ানরা তাই তো-গাধাদের চালিয়ে চরিয়ে তাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খায়। এক নম্বরের অশ্বতর না হলে কি তা পারা যায় নাকি? রানো যায় তোমার মতন গাধাদের কখনো?
বইখানা বার করে নিয়ে ভদ্রলোক কাউন্টারের দিকে চলে গেলেন।
ভদ্রলোক তোমায় গাল দিয়ে গেল। চিত্তরঞ্জন বলল-ওই অশ্বতত্র বলল তোমাকে। শুদ্ধ বাংলায় বলল তাই, সাদা বাংলায় কথাটা ভাই মুখে আনা যায় না। আমি অন্তত আওড়াতে পারব না।
তোমায় বলতে হবে না। জানি আমি কথাটার মানে। খচ্চর বলেছেন ভদ্রলোক। উনি বললেই হবে? উনি বললেন আর আমি হয়ে গেলাম? গান্ধী চিত্তরঞ্জন সুভাষ বোস কি সবাই বুঝি তাই?।
তাঁদের বলেননি তো? বলেছেন ঐ পলিটিসিয়ানদের। তাঁদের সঙ্গে এমন সব মতলববাজ ধড়িবাজ লোক আছে না? বাবাও তো বলেন এই কথাই। তাদের সম্বন্ধেই বলেছেন উনি মনে হয়।
বলুন গে, আমার বয়ে গেল! উনি খচ্চর বললেই আমি খচ্চর হবো নাকি? আমি তো আর পলিটিসিয়ান হতে যাচ্ছিনে, চাচ্ছিও না তাই হতে?
ছেড়ে দাও ওঁর কথা। আমাদের বাড়ি একদিন বেড়াতে এসো, কেমন? সাকুলার রোডের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে সে বলল–আমার নাম চিত্তবঞ্জন দে। চিত্ত চিত্ত বলে ডাক দেবে নীচের থেকে, মেমে আসব তক্ষুনি।
চিত্তরঞ্জন দে? তুমি কি দেবেন দের কেউ হও নাকি? এই-ভাইটাই?
কে দেবেন দে? চিনিওনে আমি তাকে।
না চিনলেও তার অনেক চিহ্ন রয়েছে কিনা তোমার চেহারায়–অনেক মিল পাচ্ছি তোমাদের। তোমার হাসিটা ঠিক তার মতই আর তেমনি জ্বলজ্বলে বড় বড় চোখ। দেবেনের মতই তুমি দেদীপ্যমান, দেখছি কিনা!
তাই নাকি? শুনে সে হাসে-তাহলে আসছে তো রোববার?
আসবো একদিন পরে হয়ত কখনো। এই রবিবার কি করে হবে? এখন তো আমার জেলে যাবার পালা, ঐ দেবেন দের সঙ্গেই। আরেক চিত্তরঞ্জনকে দেখতেই, বুঝেছ? আমি জানাই-দেশবন্ধু এখন যে জেলে রয়েছেন জানো না?
ভদ্রলোকটি ফিরে এলেন সেই আলমারির কাছে। আবার কোনো বইয়ের তাগিদেই বোধ হয়। আমাকে দেখেই চমকে উঠলেন যেন-সে কী! এখনো তুমি এখানে? যাওনিকো? এখনো এখানে বসে রয়েছে? না না, ইস্কুলে যেতে বলছিনে তোমায়। মীর্জাপুর পার্কেই যেতে বলছি গো। দেশ তোমায় ডাকছে না এখন? দেরি হয়ে যাচ্ছে যে-যাও। ঘোড়ার ভয়ে পিছিয়ে থাকলে কি চলে ভাই? ঘোড়া দেখে খোঁড়া হলে চলবে কেন?
.
বক্রদৃষ্টির সঙ্গে তাঁর বাঁকা বাঁকা বুলি শুনতে হয়।
যাবই তো, যাচ্ছি তো? বলতে বলতে উঠে পড়ি-চললাম তো? ঘোড়ার ভয় আমি করি নাকি মশাই? তাদের আমার ঘোড়াই কেয়ার!
আসতে হবে কিন্তু! যাবার বেলায় পিছু ডাকে ছেলেটা-মনে রেখো আমায়!
ঘোরানো সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসি নীচেয়। ঘোড়াটা দোর গোড়ায় আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে নেই আর। না থাক, আমি আর বড় রাস্তা ধরছি না, ঘোড়াসঙ্কুল পথ ছেড়ে ঘোরালো পথে অলি গলি দিয়ে কেটে পড় গিয়ে সেই মীর্জাপুর স্কোয়ারে।
যেতে যেতে মনের মধ্যে ছেলেটির সাড়া পাই, তার ওই পিছু ডাকা–মনে রেখো আমাকে।
মনে তো রেখেছি অনেককেই। মনের মধ্যেই রয়েছে তারা। মনেই রাখা যায় কেবল ফিরে আর চোখের দেখা হয় না তো তার সঙ্গে আর! সেই যে বাড়ির থেকে চুটকি কবিতাটা পাঠিয়েছিলাম না বিজলীতে-জানি জানি সবাই সবে ছাড়বে/চলার পথে কে আর কবেকার বা চুমু কাড়বে!
আমার সারা জীবন যে ওই চুটকিই। তার মতই ছুটকো হয়ে ওঠা–সেই কবিতার টুকরোটার মতই টুকরো টুকরো টুটা ফুটা হয়ে ভেঙেচুরে যাওয়া!…কারে বেঁধে রাখা নয়/কোথাও বন্দী থাকাও নয়/লেনা দেনা/যাক চুকে না/হোক ক্ষণিকের জয়!
ভবিষ্যদ্বাণীর মতই এক বালকের কলমে যা একদা বেরিয়েছিল তাই বুঝি জীবনভোর সত্যি হয়ে দাঁড়ালো। তার কৈশোর জীবনে আজ তাই যথার্থ হয়ে উঠেছে।
মীর্জাপুর পার্কের অতো ভিড়ের ভেতর দেবেনের দেখা পেলে হয় এখন। ছেলেটি কিন্তু দেবেনের মতই দেখতে–একটু ছোট সাইজের এই যা! দীপশিখার মতই দ দপ্ করে জ্বলছে তেমনি।
ওর বয়সের, বারো-চোদ্দর সব ছেলেই আলোর মতন অমনি ঝলকায়, আমি দেখেছি। অমনই ধারালো-অতই সপ্রতিভ। তারপরে যতই তারা বয়সে বাড়তে থাকে, পড়াশোনার চাপে কি সংসারের তাপে–কী জন্য যে কে জানে, কেমন করে কীরকমটা হয়ে যায় তারা দিনকের দিন! কালো হয়ে যায়, ভোঁতা হয়ে আসে, অকালে বুড়িয়ে যায় কেমন!
কেন এমনটা হয়? দেশ আমাদের পরাধীন বলেই নাকি?
দেশ স্বাধীন হলেই আমাদের সব দুঃখ দূর হবে। ছেলেদের দুঃখ, বড়দের দুঃখ, চাষী মজুরের–সবার। জ্বলজ্বল করবে সারা জীবন।
সেদিন ধূমকেতুর পাতায় নজরুল ইসলামের কবিতাটা পড়ছিলাম না? কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙে ফেল কর রে লোপাট/রক্ত জমাট শিকলপূজার পাষাণ বেদী/ওরে ও পাগলা ঈশান/বাজা তোর প্রলয়বিষাণ/ধ্বংসনিশান/উড়ুক প্রাচী-র প্রাচীর ভেদি।…পড়লে রক্ত গরম হয়ে ওঠে। ওঠে না?
