ও, গঙ্গার ধারেই বুঝি এই জেলখানাটা? সেখান থেকেই গঙ্গা দেখা যায় বেশ?
আহা, কী সে গঙ্গা, কী মহিমা তার! কেমন তার রূপ! আর কত তার ঢেউ যে! পাড়ে বসে ঢেউ গোনো-ঢেউয়ের পর ঢেউগুনে যাও না! আর কিনারায় তোমার পা ডুবিয়ে ঢেউ খাও তার। গঙ্গায় যদি ডুব দিতে হয়, দেশের জন্যে জেলে যাবার এই সময়।
আহা, জেল হত তোমার পড়েই রয়েছে, গঙ্গাও কিছু পালাচ্ছে না। দেশও পালিয়ে যাচ্ছে না কোথাও। যেতে চাও তো যাবে, গেলেই হোলো এক সময়। তার চেয়ে বরং পরশু বিকেলে চলো আমরা কোনো সিনেমায় যাই। এমন তাড়াটা কিসে জেলে যাবার?
তাড়া নেই? তুমি বলল কী? কখন তিনি ছাড়া পান, চলে যান তার কিছু ঠিক আছে? শুনেছি সরকার বাহাদুর যে কোনো মুহূর্তে তাঁকে ছেড়ে দিতে পারেন।…চলে গেলে তো আর দেখা পাব না এ জীবনে। এমনটা করে পাব না তো!
কী সব আবোলতাবোল বকছো গো! দেশের জন্যে জেলে যাবে তো কী হয়েছে। আমার জেলে যাওয়া দেশের জন্য নয়, দাশের জন্যই। সি আর দাশকে দেখতেই। সি আর দাশই সেই গঙ্গা ভাই।
৪. ঘোরানো সিঁড়ি
৪১.
ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে হাঁফ ছেড়েছি! বড়ো বাঁচন বাঁচা গেছে আজ। ঘোড়র ক্ষুরে মাথা মুড়োতে হয়নি আমায়।
মাথা বাঁচলে তো দেশের জন্য মাথা ঘামাব। মাথা খাটাবো আমার। দেশের জন্য নিজের মাথা দিতে পারব না কোনোদিন।
ঘোড়ার পায়ে মাথা দেবার কোনো মানে হয় না।
দেশোদ্ধার আমার মাথায় থাক, মাথাটা আগে বাঁচানো যাক! দেশের কাজ পড়েই আছে জীবনভোর। করলেই হবে এক সময়, দেশ কিছু কোথাও পালাচ্ছে না।
মুক্ত বায়ুর জন্য ভোলা জানলাটার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছি।…চিত্তরঞ্জন আমার মাথায় থাকুন বাবা!
স্বগতোক্তিটি অস্ফুট স্বরে ব্যক্ত হয়েছিল বুঝি, যে কিশোরটি জানালাটার কিনারায় শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল, উঠে বসেছে আমার কথায়।
কিছু বলছ নাকি আমাকে? শুধিয়েছে সে।
তোমায়? না তো। জায়গা খালি পেয়ে তার পাশটায় আমি বসলাম। তোমায় তো আমি চিনি না ভাই! কে তুমি?
বাঃ, এই মাত্তর আমার নাম করলে! আমার নামই তো চিত্তরঞ্জন।
ও মা! তুমিও চিত্তরঞ্জন? তাই নাকি? চিত্তরঞ্জন এখন ঘরে ঘরেই নাকি? আমি হাসলাম-ঘরে ঘরেই প্রবাহিত গঙ্গা! এক চিত্তরঞ্জনের জন্য একটু আগে প্রাণটা খোয়া চ্ছিল আমার। সেই কথাই বলছিলাম। তোমায় কিছু বলিনি।…….অচেনা একটা লোক সোজা তোমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছে দেখে খুব অবাক হয়েছ বুঝি?
আমাদের বাড়ি কেন হবে? পাবলিক লাইব্রেরি তো এটা। বলল ছেলেটি, এখানে বই নিতে আসে সবাই।
তাকিয়ে দেখি, তাই তো। লাইব্রেরিই তো বটে। অদূরে কাউন্টার ঘিরে লোকরা দাঁড়িয়ে লাইব্রেরিয়ানের সঙ্গে বইয়ের আদান-প্রদানে তটস্থ। চারিধারে পাশাপাশি সাজানো যত আলমারি হাজারো কই ঠাসা।
বাঃ! এখানেও একটা লাইব্রেরি। আরেকটা লাইব্রেরি এত কাছাকাছি রয়েছে জানতাম না তো?
সে কি! এমন নামজাদা রামমোহন লাইব্রেরির নাম তুমি শোনো নি? সে অবাক হয়।
আমি শুধু হিরণ লাইব্রেরি আর চৈতন্য লাইব্রেরি জানি কেবল। ওদের একটার আমি মেম্বর। তুমি এই রামমোহনের মেম্বর বুঝি?
না, ইস্কুল ছুটির পর আমি চলে আসি এখানে সটান। পছন্দমত বই নিয়ে ঘণ্টা দুয়েক পড়ি, তারপরে বাড়ি ফিরে যাই। পড়ার বই নিয়ে বসি তারপর। এখানে বসে পড়লে এ এমনি বই দেয় পড়তে। কোনো কিছু দিতে হয় না, কি মেম্বর হতে হয় না। আমি এই জানালাটার আলসেয় শুয়ে শুয়ে পড়ি রোজ।
কিন্তু এটা কি এই আলসেমির সময় ভাই? দেশ আমাদের ডাকছে না এখন?
কথাটায় একজনের টনক নড়ে বুঝি।–কী বললে খোকা? ভদ্রলোক লাইব্রেরিয়ানদেরই কেউ হবেন হয়ত, পাশের আলমারির বই হাঁটকাচ্ছিলেন, তিনিই পাড়লেন কথাটা ফস্ করে–কোন ইস্কুলে পড় তুমি?
আমি পড়িটড়ি না, তীব্র প্রতিবাদ করি-তাছাড়া, আমি কোনো খোকা নই।
কী করো তুমি তাহলে?
যা আমাদের করবার এখন। সবাই যা করছে। দেশের কাজ করি।
দেশের কাজ? ভদ্রলোকের মুখে বক্র হাসি দেখা যায়-মুখ হয়ে থেকে দেশের কাজ? তা করা যায় নাকি? আগে নিজেকে গড়া-তারপরই না দেশের মানুষের সকলের কাজ করা।
পড়াশুনা তো পড়েই আছে, দেশের কাজ কিছু পড়ে থাকতে পারে না। আমি কই : কী বলেছেন মহাত্মাজী জানেন না? এডুকেশন মে ওয়েট বাট স্বরাজ ক্যানট। সব নেতাই তো সেই কথা বলছেন–বিপিন পাল, সুভাষ বোস, সি আর দাশ…
থামো থামো! ওই নেতারা কি মুখ নাকি! সবাই ওঁরা পণ্ডিত, রীতিমত পড়াশোনা করেছেন, তারপরেই কিনা দেশের কাজে নেমেছেন তাঁরা। তাঁদের মত হবার চেষ্টা করো আগে, তার পরে দেশের কাজ কোরো। এই বয়সে পড়াশুনা করাটাই তোমাদের কাজ এখন। কাজ করার উপযুক্ত হও, তারপর না কাজ করবে। যাও, এক্ষুনি ইস্কুলে ফিরে যাও, মন দিয়ে পড়োগে। যা-ও!
তিনি যেন মাছি তাড়ানোর মতই তাড়িয়ে দিতে চান আমায়।
আমার রাগ হয়ে যায়-যান, পড়ব না আমি। আপনি কী করবেন আমার? কী করতে পারেন আপনি?
আমি আর কী করতে পারি। মুখ্য হয়ে থাকবে, কষ্ট পাবে জীবনে, এই মাত্র বলতে পারি। জীবনে চারটি মাত্র বন্ধু, বুঝেছ ভাই? বিদ্যে, স্বাস্থ্য, টাকা আর ভগবান, হ্যাঁ, ঐ তোমার ভগবানও! এছাড়া আর কেউ কোথাও নেই কারো, সময়ে অসময়ে কেউ দেখার নেই ওরা ছাড়া। তাছাড়া এই কথাও আমি বলতে চাই, মুখ হয়ে থেকে দেশের স্বাধীনতা আনা যায় না। গড় গড় করে গড়িয়ে যান তিনি এক নিশ্বাসে–আর এত খারাপ লাগতে থাকে আমার যে! তাই যদি হতো ভাই, তাহলে তো আমাদের দেশের শতকরা নব্বই জনই তো ওই নিরক্ষর। তাহলে দেশ স্বাধীন হয়ে যেত কোন কালে! হচ্ছে না কেন? এত গাধা থাকতে, বুঝেছ, এ দেশ কোনোদিন তা হবেও না।
