তাই বলো! যাই হোক, তোমার বন্ধু দুটি হয়েছিল মন্দ না। দারোয়ান সীতারাম আর বাগানের মালী শেখ রহিম!
ছোটবেলায় ঐ বয়সে এমন বন্ধু পাওয়া যায়? তুমিই বলো!
একেবারে স্বদেশী গানের মতই মিলে গেছল তোমার বরাতে। সেই যে, গানটায় আছে না–আমরা কতো গেয়েছি তো! ঐ গান গেয়েই জেলে গেছে কতো ছেলে!
কী গানটা? বন্দেমাতরম্? নাকি, ধনধান্যে পুষ্পে ভরা? নাকি, মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়…?
সেই যে, রাম রহিম না জুদা করো ভাই! দিলকো সাচ্চা রাখো জী। হা জী হাজী করতে রহে, দুনিয়াদারী দোখো জী!–তাই করেছে তোমরা রাম আর রহিমকে আলাদা করোনি, এক জায়গায় এনে রেখেছে।
আমি নাকি? এই ধন্যবাদ সেই কাকার প্রাপ্য। তিনিই তাঁর বাগান মন্দিরে ওদের দুজনকে এনে পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
যে দেবতার প্রতিষ্ঠা করে সে যেমন ধন্য, তেমনি তার যে পূজারী সেও কিছু কম নয়।
পূজারীটা আবার কে?
তুমিই তো! তুমিও কিছু নগণ্য নও।
আমার তো নিজের পেটপূজো। আমার যা ভালোবাসা আর ভাব তা হোলো ওই ডিম আর ডাব।
তাহলেও, যে কারণেই হোক, ভালোবাসাই তো? ভালোবাসা কি আর অকারণে হয়? আর রবিঠাকুর বলেছেন না, যার নাম ভালোবাসা তারই নাম পূজা এই রকম কী একটা কথা বলেছেন যেন কোথায়!
মোটেই বলেননি। আমার কাছে তুমি রবিঠাকুর কপচাতে এসো না! গুল মারতে এসো না আমার কাছে। রবিঠাকুর আমার গুলে খাওয়া। তিনি বলেছেন, মোরা ধরণীর নর, কথা পাবো কোথা? দেবতারে প্রিয় বলি, প্রিয়রে দেবতার এই কথাই বলেছেন তিনি।
কচ ও দেবযানীতে ওদের দুজনের মধ্যে এই কচকচিটা আছে, মনে করিয়ে দিই।
ওই হলো। একই দাঁড়ালো কথাটা…এখন শুনি ভাব জমিয়ে তুমি কতো হাজার ডিম আর ডাব সাবাড় করেছিলে তার, তাই কও।
হাজার হাজার। আমি কি গুণে রেখেছি? পেটের মধ্যে গিয়ে জমেছে। আর পেট হচ্ছে গিয়ে খাবারের যমালয়, জানো তো? এমন একটা জায়গা, যা যাবে তাই হজম। আমার পেট অন্তত। মা বলে যে, আমি নাকি একটি ক্ষুদ্র রাক্ষস।
বলেন নাকি তোমার মা?
বলবেন না? আমি যে কী আমি নিজেই কি আর জানিনে? গোপালের ন্যায় সুবোধ বালকের মত যাহা পাই তাহা তো খাই-ই, তা ছাড়া যা আমার খাওয়া উচিত নয়, হয়ত উচিত নয়…এমন সব জিনিসও আমি খেয়েছি।
কী রকম? কী রকম?
এমন একটা জিনিস যা নাকি খেলেই পাওয়া যায়, আর পেলেই খাওয়া উচিত।
আহা, শুনিই না জিনিস।
শুনলে তোমার পিলে চমকে যাবে সে জিনিস সাত জন্মেও তুমি কল্পনা করতে পারো। তোমার বয়সের কোনো ছেলে সে খাবার খেতে পায় না বা কদাচিৎ কোথাও কেউ হয়ত খেয়ে থাকতে পারে যদি কেউ তাকে কখনো খাইয়ে থাকে…
কী জিনিসটা শুনিই না!
সে জিনিস হচ্ছে রিনির। বুঝে নাও এইতেই!
রিনিটা আবার কে? রিনির আবার কী জিনিস?
ওই তো! ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ বলে না? যে তা খায় সে তো ঋণীই হয়ে থাকে। হয় না? সেই ঋণীইর থেকে খাওয়া…
ঘি খাওয়ার কথা বলছো তো? সে আর কে না খেয়েছে ভাই!
ঘি বলল, মধু বলল, পঞ্চগব্য বলো। যা বলো তাই বলো। মোটের ওপর অমৃত। খেয়েছো অমৃত?
আলবৎ খেয়েছি, অমৃতি তো? মোটাসোটা সেই জিলিপি রসে টইটম্বুর! সেই জিনিস। তা অমৃতির দোকানদার অমনি দিলে কে না খায়? আমাদের পাড়ার দোকানদারটা ধারে দেয় না যে! ধার চাইলে ধরে মারতে আসে। তার ধারেকাছে ঘেঁষতেই দেয় না।
যাক গে ওকথা। তুমি গঙ্গার কথা বলছিলে না? আমি যেমন করে গঙ্গা দেখেছি তুমি তার একশো ভাগের একভাগও দ্যাখোনি ভাই। ওই রহিম না? গঙ্গার বুকে আমায় নিয়ে বজরা চালিয়েছে–বুঝলে?
বলো কি? বজরাও চালিয়েছ তুমি রহিমের সঙ্গে? শুনে তো সে রীতিমতই অবাক : আটা না, ছাতু?
আটা না ছাতু-তার মানে? আমিও কম অবাক হই না-বজরাই তো। আটা-ছাতুর কথা আসছে কেন?
বজরার আটাও হয়, ছাতুও হয় আবার। কোনটা চালিয়েছিলে তোমরা? অবাক করলে জই! বাঙালীর ছেলে ডালভাত চালাতেই হদ্দ হয়ে যায়, হিমসিম খায় তাই হজম করতেই। আর তুমি কি বজরাও চালিয়েছ তার ওপর। তোমার মা মিথ্যে কন না! সত্যিই তুমি নমস্য। তোমায় দণ্ডবৎ! তোমার ক্ষুরে ক্ষুরেই। সে আমায় নমস্কার করে।
আহা, সে বজরা কেন গো! আমি যেন বজরাহত হই, বজ্রাহত মতই কই-তুমি কী হে! বজরা কাকে বলে তাও তুমি জানো না? দেবী চৌধুরাণী পড়োনি তুমি? বঙ্কিমবাবুর লেখা? তুমি কী একটা!
বঙ্কিমবাবু এখানে আসছে কোত্থেকে? সে বঙ্কিম নেত্রে তাকায় আমার দিকে–হচ্ছে গিয়ে বজরার কথা।
দেবী চৌধুরাণীর বজরা ছিল। গঙ্গার ধারে বাগানবাড়িওয়ালা বড়লোক মাত্ররই থাকে। সেই বজরায় চেপে তারা গঙ্গার বুকে বেড়ায়। হাওয়া খায়। আমার কাকারও কাশীপুরের ঘাটে একটা বজরা বাঁধা আছে। বড়োসড়ো নৌকোর মতই হচ্ছে বজরা-তবে নৌকো ঠিক নয়কো। ছাদওয়ালা দু-তিনখানা ঘর আছে তার। ছোটখাট বাড়ির মই বলা যায়। ভাসমান বাড়ি। রহিম সেই বজরায় আমায় নিয়ে বেড়াত গঙ্গায়। সেই কথাই বলছিলাম। বলছিলাম যে আমি যেমনতর গঙ্গা দেখেছি তা তুমি দ্যাখোনি। বলছিলাম তাই।
যা দেখেছো গঙ্গা? তাহলেই হলো। জন্ম সার্থক হয়েছে তোমার। সে বলে : আমিও সেই গঙ্গা দেখতে যাবো পরশুদিন আমার জন্ম সার্থক করতেই।
এই যে বললে পরশুদিন তুমি জেলে যাচ্ছো আবার?
আহা, জেলেই এখন গঙ্গা হে! সেখান দিয়েই গঙ্গা বইছে যে!
