সে তো হাওড়া ব্রিজের ওপর থেকে? যেতে আসতেই? তার কথা : তার কিনারে বসে তাকিয়ে থেকেছো তার দিকে?
কতো দিন! দিনের পর দিন, ঘন্টার পর ঘন্টা, মাসের পর মাস।
কোথায় দেখলে? তোমাদের গাঁয়ে গঙ্গা আছে?
না। সেখানে মহানন্দা। বর্ষাকালেই তার আনন্দটা দেখা যায়-তখন নৌকো যায় তার ওপর দিয়ে। কিন্তু অন্য সময় শুধু তার হাড়পাঁজরা।
তা হলে দেখলে কোথায় অমন করে? ভারী তোমায় হিংসে হচ্ছে আমার।
কেন, এই কলকাতাতেই। কাশীপুরে। বরানগরের পাশ দিয়ে যায়নি গঙ্গা?
সেখানে তোমাদের কেউ থাকে বুঝি?
কেউ থাকে না। খালি পড়ে থাকে বাড়িটা। প্রকান্ড বাড়ি। অট্টালিকাই বলা যায়।
আমি আরও জানাই : অনেকখানি জায়গা জুড়ে প্রকান্ড এক বাগানের মধ্যে বাড়িটা।
বাগানবাড়ি বুঝি?
হ্যাঁ, বাগানবাড়িইতো। বাগানের ভেতর বাড়িটা, গঙ্গার ঠিক ওপরেই। ছোটখাট বাঁধানো ঘাট রয়েছে আবার। সেখানে বসে দ্যাখো না কেন গঙ্গা যত খুশি। কেউ দেখবার নেই। আমি তো তাই দেখতাম।
বাগানবাড়ি ভারী খারাপ। তার মন্তব্য। খারাপ বলে সবাই।
কেন, খারাপ কিসের? বাড়িটাও খারাপ নয়, বাগানটাও বেশ ভালো। কতত আম গাছ, লিচু গাছ, নারকেল গাছ আছে বাগানে। কী মিষ্টি আম সব! কতো বড়ো বড়ো লিচু। ডাব ধরে রয়েছে এনতার। পাড়ো আর খাও। আর ফুল গাছ তোমার কত রকমের যে! সৌরভে মন ভরে যায়-চাঁপার গন্ধ তো পাগল করে দেয়? আমাদের দেশের সোনালি রঙের চাঁপা নয় কিন্তু এগুলো, যাকে বলে কি না কনকচাঁপা–এগুলোর নাম হচ্ছে কাঁঠালি চাঁপা। কিন্তু গন্ধ দুর্দান্ত।… ফুলবাগানটার কেয়ারি করা রাস্তা আছে কেমন–ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো দুধারে। ছোট্ট লাল সুরকির রাস্তা সব–কী চমৎকার!
তোমাদের বাড়ি?
না, আমার এক কাকার।
তোমরা খুব বড়লোক তাহলে?
কাকারা বড়লোক। বেজায় বড়লোক।…কাকা বড়লোক তো আমার কী!
তোমরা হচ্ছে রাজাগজা, বুঝেছি।
ঐ কাকা ভদ্রলোককে বলতে পারো। রাজা খেতাব আছে তাঁর-যুদ্ধের সময় ক লাখ টাকা দিয়ে নাকি সরকার থেকে খেতাবটা পেয়েছেন। আর, গজা তো নিশ্চয়ই। পিলখানায় হাতী পিলপিল করছে–অতিকায় হাতী সব–একটার নাম তাদের মোহনপ্রসাদ! এত বড়ো তার দাঁত।
ঐ হলো! কাকা যদি রাজা হয়, ভাইপোও কিছু কম নয়। একই ঝাড়ের তুমিও ঐ রাজাগজাই।…বুঝলাম! আমার প্রতি সে উপেক্ষার কটাক্ষ করে।
কাকস্য পরিবেদনা! কী সম্পর্কের যে কাকা আমি জানিও না তা ঠিক। তবে রাজা না হলেও গজা তুমি বলতে পারো আমায় অবশ্যি। জিবে গজা। সেই জিবে গজাই আমি। যা ময়রার দোকানে গজায়, জিভে যার সোয়াদ পাই। কিন্তু তাই বা সব সময় পাচ্ছি কোথায়!
বোঝা গেছে। আমার প্রতি তার কেমন একটা নিস্পৃহ ভাব দেখা যায়। রাজা গজা না হলেও, তুমিও প্রায় তার কাছাকাছি।
তা হ্যাঁ, তার কাছাকাছি গেছি বটে আমি কয়েকবার। হ্যাঁরিংটন স্ট্রীটের বাড়িতেও তাঁর থেকে এসেছি বার কয়েক। বাড়ির থেকে পালিয়ে কলকাতায় চলে আসতাম তো প্রায়ই, তখনই কিছুদিন কাটিয়েছি…সেখানে…
হ্যারিংটন স্ট্রীটেও তাঁর বাড়ি আছে আবার? বরানগরের গঙ্গার ধারে এত বড়ো একখানা থাকতেও?
হ্যাঁ, দশ নম্বর হ্যাঁরিংটন স্ট্রীটে। আর কাশীপুরে রতনবাবু রোড ধরে গেলে, গঙ্গার ধারে বাগানবাড়িটার কাছেই রতনবাবুর ঘাট। নড়ালের রাজা রতন রায়, নাম শুনেছ? তাদের ঘাটের পাশেই মড়াপোড়ানোর জায়গা। ছোটখাট শ্মশানের মতই। মাঝে মাঝে সেখানে মড়া পোড়ে–আর এমন বিচ্ছিরি গন্ধ বার হয় সেই সময়! সেই গন্ধ বাতাসে ভেসে কাশীপুরের বাড়িটায় আসে। সেই কারণেই উনি থাকেন.না সেখানে, কখনো থাকেননি। খালিই পড়ে আছে এমনি অত বড় বাড়ি।
কেউ থাকে না একেবারে!
দুজন থাকে–এক দারোয়ান আর এক মালী। দারোয়ানটার নাম সীতারাম। বুড়ো দাবোয়ান। তার সঙ্গে যা ভাব হয়েছিল আমার না! সেই ছোটবেলায়! রোজ তাকে একখানা করে চিঠি লিখতাম আমি বেশ লম্বা লম্বা চিঠি।
কী লিখতে?
কে জানে! মনেই পড়ে না এখন। যা মনে আসত, যা খুশি তাই লিখতাম। লিখে লিখে দিয়ে আসতাম। সে তত আর বাংলা জানে না। বলতে জানে, পড়তে পারে না তো তাই আবার তাকে পড়ে শুনিয়ে দিতে হত আমায়। চিঠিগুলো সব সে যত্ন করে জমিয়ে রেখেছে। বাড়ি নিয়ে যাবে, তার নাতিকে বাংলা শেখাবে বলেছে–সে তখন তাকে পড়ে শোনাবে, আবার দুঃখু করে বলত, তার তো ওই বাংলা শেখার বয়স নেই আর।
বা রে সীতারাম! ছেলেটি উচ্ছ্বসিত হয়। লেখাপড়া না জানলেও, লেখানো পড়ানোর দিকে ঝোঁক আছে তার!
আর বাগানের মালী ছিল রহিম। শেখ রহিম। তার সঙ্গেও আমার ভাব ছিল খুব। তার মুর্গি ছিল একগাদা। কতো মুর্গির ডিম খাইয়েছে সে আমায়। বাগানের এক কোণে তার ছোট একখানা ঘর ছিল। সেখানে গেলেই সে ডিম ভেজে দিত। বাজারে বেচত না, বেচতে হতও না তাকে রাজার কাছ থেকে মোটা বেতনই পেত সে বোধ হয়। আর নারকোল গাছের থেকে কচি ডাব পেড়ে এনে কেটে খেতে দিত আমায়। ওরকম ডাবের জল আমি কক্ষনো খাইনি।
সেই জন্যই ভাব হয়েছিল তোমাদের। ডাব পাতিয়ে ভাব। বলে সে হাসে।
ডাবের জন্য না ডিম!
রহিমের ভালোবাসাকে তুমি ডিম বলে উড়িয়ে দিচ্ছো? তাকে যেন একটু ক্ষুণ্ণ দেখতে পাই।
মোটেই তা দিচ্ছি না। বলছি যে, ভাবটা হয়েছিল তার ই ডিম ভাজার জন্যেই–গাছের পাড়া ভাব আর মুর্গির পাড়া ডিম-দুয়ের জন্যই।
