আহা, হাঁটতে যাবে কেন হে? একটি তো নিমগাছ মোটে। আর চার হাজার ছেলে আমরা জেলখানায়। সারা জেল ছেলেয় ছেলেয় ভর্তি। স্বরাজের আন্দোলনে টইটম্বুর। আমাদের জন্যে এবার আরেকখানা জেল খাড়া হয়েছে তা জানো। সে-ই খিদিরপর ডকেই।
তা হলই বা অতো ছেলে, তা তোমার নিমগাছের কী! লড়াই তো আমাদের ইংরেজের সঙ্গে। নিমগাছের সঙ্গে নয়।
সকাল হলেই আমরা সবাই নিমগাছটার ডালে উঠে বসি। ছেলেরা যতো সব ডাল ভেঙে দাঁতন করতে লাগে…..
কেউ কিছু বলে না?
কে বলবে? বলবার কেউ নেইকো। আমরাই জেলে থাকি কেবল তিন চার হাজার ছেলে। আমি হাঁ করে ওর কথাগুলো গিলি–সেই জেলে আগে যে সব চোর ডাকাত খুনী বদমায়েস থাকত, জেল খালি করে তাদের সব মফস্বলের জেলে ঠেলে দিয়েছে–এখন কেবল কংগ্রেসের ভলান্টিয়ার, তারাই থাকে।
এখন ঐ নিমের ডালে দাঁত বসাচ্ছো, তারপরে দাঁত শানিয়ে ইংরেজের ঘাড়ে গিয়ে বসাবে, তাই না? বলেই আমার অনুযোগ : যার নাম মরণ কামড়?
যা বলেছো! সে হাসে : সকালে ঘুম ভাঙলেই সবাই আমরা সেই নিম গাছটায় উঠে বসি…মুখ ধুতে হবে না আমাদের? কেউ কিছু বলে না–বলবেটা কী?
আর নিম গাছটা?
সে আবার কী বলবে? তার মুখে কোনো ভাষা আছে?
ভেঙে পড়ে না সে? তোমাদের অতজনের ভারে?
চার হাজার কি একসঙ্গে গাছে ধরে? ক্ষেপে ক্ষেপে ওঠে। নিমগাছটা কিন্তু ক্ষেপে ওঠে না। দাঁড়িয়ে থাকে ঠায়। ক্ষেপেও ওঠে না, জ্বলেও ওঠে না দপ্ করে। তোমার ঐ পাপ হওয়া সত্ত্বেও। কিংবা সেইজন্যেই বোধ হয়। সব সময় এক পায় খাড়া। আমাদের জন্যেই…
অসহায় একলা পেয়ে তার ওপর তোমরা বেজায় অত্যাচার করছ কিন্তু?
সে কথা আর বলবার নয়, আস্ত নিমগাছটাই দাঁতন করে খতম করে দিয়েছি বলতে গেলে।
বল কি হে? একটা গোটা নিমগাছ সবাই মিলে দাঁতন করে ফেললে?
ফেলব না? চার হাজার লোক দাঁতন করলে একটা নিমগাছ কদিন টেকে আর?
ভারী আশ্চর্যি তো! একটু ভাবতে গিয়েই আমার সংশয় জাগে তার শাখাপ্রশাখা সব সমেত?
না না! বড় বড় শাখাপ্রশাখা কী আর? ছোট শাখাপ্রশাখা। তোমার ওই গুঁড়িটাও বাদ।
গোড়ায় দাঁত বসাতে পারোনি তাহলে? গোড়াতেই গলদ!
হ্যাঁ, গলদ নিয়ে তেমনি খাড়াই হয়েছে গাছটা, তবে একেবারে ন্যাড়া করে রেখে এসেছি। কিছু আর নেই তার। যেয়ো না জেলে, দেখবে তখন। চেহারাটা তার দেখতে পাবে গেলে।
যাব তো। কিন্তু কবে যাই কিছু কি তার ঠিক আছে!
মীর্জাপুর স্কোয়ারে এসো না পরশু বিকেলে, আইন অমান্য করার সভা হবে সেদিন। সেদিন ফের আমি জেলে ফিরে যাব এঁচে রেখেছি।
সেই গাছটাকে দেখতে আবার? আমি জিগ্যেস করি : তাকে না দেখে থাকতে পারছো না বুঝি? মন কেমন করছে তোমার?
আমি অবাক হয়ে ভাবি, গাছের জন্যে এমন টান কারো হতে পারে নাকি কখনো। গাছের আবার দেখবার কী আছে? সে তো একবার দেখলেই ফুরিয়ে যায়। তাছাড়া, এ গাছটার তো রূপ যৌবন বলতে কিছুই আর নেইকো। সবটাই প্রায় তার দাঁতন হয়ে গেছে।
আহা, গাছ কেন গো! সেখানে একজন রয়েছে যে আমাদের। তাকে দেখতেই যাব তো আমি।
তোমার কোনো বন্ধু বুঝি?
হ্যাঁ, বন্ধুও বলা যায় বইকি! শুধু আমার নয়, সবাইকার। তবে বন্ধু বলতে যা বোঝায়, সমবয়সী ইয়ার, ঠিক তো নয় অবশ্যি।
তবে? একজন মানুষমাত্রই! তোমার যদি প্রাণের বন্ধু না হয় তবে শুধু একজন মানুষকে দেখেতে ফের আবার জেলে যাবার কোনো মানে হয়? আমি বলি : গাছের মত একটা মানুষকেও তো একবার দেখলেই ফুরিয়ে যায়।
সব মানুষ কি ফুরোয়? সবাই কি ফুরিয়ে যায়? একেক জন এমন মানুষ থাকে না যে নাকি অফুরত, ফুরোবার নয়! কখনো ফুরোয় না! যাকে বার বার দেখতে ইচ্ছে করে, দেখে দেখে আশ মেটে না, দেখলে পরে চোখ জুড়োয়; মন ভরে যায়!
কে, শুনি না মানুষটা?
যে-সে মানুষ নয়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। ঐ জেলেই আছেন এখন। তিনি কারাবরণ করেছেন তুমি জানতে না?
জানব না কেন, কিন্তু ঐ জেলেই যে রয়েছে তা আমি জানতুম না।
দেখেছ কখনো দেশবন্ধু দাশকে? কতোবার!
খুব ভালো করেই দেখেছি।
কোথায় দেখলে? তার বাড়িতে গিয়ে দেখা করা তো ভারী মুশকিল। মানে, তোমার আমার পক্ষে। আর সভায়-টভায় সেই দূর থেকেই দেখা যায়। কিন্তু খুব কাছাকাছি পেতে হলে তোমায় যেতে হবে ওই জেলে।
আমি খুব কাছাকাছিই তাঁকে দেখেছি।
কি করে দেখলে শুনি? দেখলে কোথায়?
আমাদের জেলায়। কিছুদিন আগে তিনি বাংলাদেশের শহরে শহরে সভা করতে বেরিয়েছিলেন না? সেই সময়।
ও, সেই দেখা! জেলায় দেখা আর জেলে দেখা এক দেখা নয়। তুমি দাড়িওলা সি আর দাশ দেখেছো?
না। আমি কই, আমি দেখেছি বেশ চাঁছাছোলা সি আর দাশ!
জেলে গিয়ে উনি দাড়ি রেখেছেন। জেল থেকে বেরিয়ে তবে কামাবেন–ওর নিজের নাপিতের কাছে। সে জানায় : জেলে না গেলে এই সি আর দাশকে তুমি আর দেখতে পেলে না। তোৰ্মার এ জীবনে নয়।
ভাবিত হতে হয়। চাঁছাছোলা দেশবন্ধুর গালে চাচাওলা দাড়ি কেমনটা দাঁড়িয়েছে ভেবে আমি ঠাওর পাই না।
গাছপালা নদীনালা খালবিল একবার দেখলেই হয়, দেখবার সাথে সাথেই ফুরোয় মানি, কিন্তু গঙ্গা? সে বলে যায়, গঙ্গা কি ফুরোয়, না ফুরোবার? গঙ্গা অফুরন্ত। গঙ্গার দিকে তুমি অনন্তকাল ধরে তাকিয়ে থাকতে পাবো। দেখে তুমি গঙ্গা?
কে না দেখেছে? তার প্রশ্নটাই আমায় অবাক করে।
