কোথাও কোথাও নদীও আছে বই কি! তারা নদীর জলই খায়। কারও কারও বাড়ি কুপও রয়েছে আবার। আমাদের বাড়ি ইঁদারা আছে একটা–সেই কোন্ সাবেক আমলের। অতি প্রাচীন ইঁদারা। তার জল ভারি মিষ্টি। যেমন মিষ্টি তেমনি হজমি।
আমাদের কলকাতায় ইঁদারা তুমি পাবে না কোথাও। প্রাচীন ইঁদারা তো নয়ই।
ইঁদারা না থাক, ইঁদুর আছে তোমাদের। বেশ ধেড়ে ধেড়ে ইঁদুর–বেড়ে ইঁদুর সব! লক্ষ্য করলে তেমন প্রাচীন ইঁদুর চোখে পড়ে বই কি!
দেখেছ তুমি?
বিস্তর। তুমি দ্যাখোনি বুঝি? রাস্তায় শোওনি বোধ হয় কখনো?
রাস্তায়? রাস্তায় যোব কেন? শুতে যাব কেন? রাস্তায় কি শোয় নাকি কেউ? সেটা কি শোবার জায়গা? খাটের ওপর গদি পাতা বিছানায় মশারি খাটিয়েই তো শোয় সবাই–কিংবা, চৌকিতেও তোক পেড়ে শোয় কেউ কেউ। রাস্তায় কেউ শুতে যায় নাকি?
কিন্তু যার বাড়ি নেই, ঘর নেই, খাট নেই, পালঙ্ক নেই, এমন কি খাঁটিয়াও নেই একখানা-মশারি খাটিয়ে শোয়া তো দূরস্থান…সে কোথায় শোবে শুনি তবে?
তুমি শুয়েছ কখনো রাস্তায়?
আকচার। রাস্তাই তো আমার শোবার জায়গা হে! নইলে তোমাদের ওসব প্রাচীন ইঁদুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় হল কি করে?
রাস্তায় শোয়া কখনই ভালো নয়। নিরাপদও নয় ভাই! রাত্তিরে অবশ্যি ট্রাম চলে না, তা সত্যি, কিন্তু লরি মোটর এসব তো যায়–যদি তোমার ওপর দিয়ে চলে যায় একখানা? আচমকা চাপা পড়ে যাও যদি?
আহা, রাস্তার মাঝখানে কি আর? আশেপাশে। ফুটপাতের ওপর। সেখান দিয়ে কি গাড়িকাড়ি যায় নাকি? আর, রাত একটু গম্ভীর হলেই ফুটপাথে যত ধেড়ে ধেড়ে ইঁদুররা জড়ো হয়–তাদের যাতায়াত শুরু হয়ে যায়। তারা কাউকে গেরাহ্যিই করে না। গায়ের ওপর দিয়েও চলে যায় কখনো কখনো। রাস্তায় শোয়ার ভাগ্যি করোনি বলে সে-দেখার সুযোগ তোমার কোনোদিন হবে না।
ছেলেটি সে কথার জবাব না দিয়ে তার দাঁতনের গোছর থেকে একটা কাঠি আমার দিকে এগিয়ে দেয়-নাও, দাঁতন করো।
বাঃ! এ যে নিমের দাঁতন দেখছি। কোথায় পেলে? কলকাতায় এত ঘুরেছি কিন্তু কোনো রাস্তায় নিমগাছ তোকই চোখে পড়েনি আমার!
রাস্তার নিমগাছ নয় হে! জেলখানার।
জেলখানার! দস্তুরমতো অবাক হতে হয় ওর কথায় : জেলখানায় তো ঘানিগাছ আছে জানি, সেই ঘানির তেল বিক্রি হয় বাজারে। কিন্তু নিমগাছের দাঁতনও যে সেখান থেকে যুগিয়ে থাকে শুনিনি তো!
আহা! তারা যোগাতে যারে কেন গো। সেখেন থেকে নিয়ে এসেছি যে! এক গোহা নিয়ে এসেছি বেরোবার সময়।
জেল থেকে নিয়ে এসেছো? জেল কি চিড়িয়াখানার মতই নাকি? ইচ্ছে করলেই যাওয়া যায় সেখানে? দেখেশুনে বেড়িয়ে-টেড়িয়ে ফিরে আসা যায় আবার?
মোটেই তা নয়। জেলে যাওয়া ভারী শক্ত ব্যাপার। গেলে পরে বেরুনো আরো কষ্টসাধ্য। সে জানায় : সহজে সেখানে ঢুকতে দেয় না। সেখান থেকে বেরুনোও সহজ নয়।
তাহলে তুমি জেলের ভেতর গেলে কি করে?
কেন, পিকেটিং করে? রোজ রোজ শত শত ছেলে যে পিকেটিং করে জেলে যাচ্ছে, তুমি কি কোনো খোঁজ রাখো না তার? খবর কাগজ পড় না বুঝি?
পড়ব না কেন? শত শত কাগজ পড়তে হয় রোজ আমায়।
শত শত? ছেলেটি আবার হতবাক : অতগুলো কাগজই নেই আমাদের। কাগজ তো মোটে এই ক খানা-আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, বসুমতী আর স্টেটসম্যান।
আহা, কাগজ কেবল পড়া কেন, কাগজ পাড়াও যে আমার কাজ হে! কাগজের হকারি করি যে! পাঁচশো কাগজ বেচতে হয় আমায় রোজ। আমি বিশদ হই : একখানা কাগজ শুয়ে বসে ধীরে সুস্থে আরাম করে আগাগোড়া পড়ব যে, তার সময় পাই কী! একটুখানি পড়তে না পড়তেই সেটা বিক্রি হয়ে গেল, তখন আরেকখানা নিয়ে পড়লুম। ফের সেখানাও আবার…ঐ যতক্ষণ হাতে থাকে ততক্ষণই যা পড়ি…..এমনি করে একটু একটু পড়ে সব খবর জানতে আমার সন্ধ্যে উতরে যায়, জানো?
তারপর, কী করো? সে কাগজখানাও বেচে দাও?
সেখানা পেড়ে বসি তারপরে। নটার সিনেমায় যাই না? কী ছারপোকা ভাই, তোমাদের ঐ সিনেমায়। পেড়ে না বসলে আর চোখে কানে দেখতে দেয় না–ছবিটার মাথামুণ্ডু বোঝ যায় না কিছুই।
যা বলেছ। হাসতে থাকে সে।
বায়স্কোপ দেখতে ইচ্ছে করে না তোমার? আমি শুধুই : যাবে তুমি আজ? যাও তো বলল, তাহলে দুখানা কাগজ না হয় বেচব না আজকে। দুজনের পেতে বসার জন্য রাখব তাহলে।
দেখতে ইচ্ছে করে, কিন্তু এই কি আমোদ-প্রমোদ করার সময় ভাই? ইংরেজের সঙ্গে লড়াই চলছে না আমাদের? আবার আমি জেলে যাব যে। হয়ত আজই, না হয় তো কাল। কাল তো নিশ্চয়ই।
কালই আবার? কালই আবার ফিরে যাবে সেখানে?
নিশ্চয়। কাল বিকেলে মীর্জাপুর স্কোয়ারে সভা আছে না? আইন অমান্যের সভা–যারাই যাবে সেখানে, যোগ দেবে সেই সভায়, তাদেরকেই পাকড়াবে পুলিস। আগের থেকে বলে দিয়েছে। সভা-টভা করার নিষেধাজ্ঞা আছে না এখন? একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করা সব জায়গায়। আইন ভাঙলেই ধরে নিয়ে যাবে থানায়, সেখান থেকে একবার আদালত ঘুরিয়ে সটান সেই জেলে চালান দিয়ে দেবে।
তাই বুঝি?
তাই। তোমার জেলে যেতে ইচ্ছে করে না? করছে না?
এক-আধটু করে–একেক সময়। বেশি নয়। গেলে পর সেই নিমগাছটা দেখতে পাব বোধ হয়?
পাবে। তবে তেমনটি পাবে না। সেই নিমগাছ আর সে রকমটি নেই কো।
গেল কোথায় তাহলে? যদ্দুর জানি, নিমগাছরা তো চলাফেরা করতে পারে না। পাদপ বলা হলেও ওদের কোনো পা নেই আদপে। হাঁটতে পারে না একদম।
