ভদ্রলোকের পিছনে ভাবতে ভাবতে চলেছি আমি। আর কিছু না হোক, আজ রাত্তিরের মত খাওয়া-থাকার ব্যবস্থাটা তো হবে।
কদ্দুর চলেছেন ভদ্রলোক? চলেছেন তো চলেছেনই যে! খিদে পেটে কি হাঁটতে ভালো লাগে কারু?
হেঁটে হেঁটে বিডন স্ট্রীট মোড়ের চৌমাথা পার হলাম আমরা।–এটা হেদো। জানো
জানি বইকি। ঘাড় নাড়লাম আমার। হেদো জানব না? এই এলাকায় আমার রাজত্ব! রোজ সকালে রাজ্যির খবর কাগজ বগলে আমার বিরাজত্ব এইখানেই।
হেদোর প্রথম গেটের পাশ দিয়ে যেতে তিনি বললেন-এটা দেখছি বন্ধ।
তারপর মাঝখানের মেন গেটের মাঝামাঝি গিয়ে তিনি দাঁড়ালেন।
ওমা! এখানেও যে তালা মেরে দিয়েছে দেখছি!
তাঁর এই বেতালা কথার কোনো তাল পাওয়া যায় না।
রাত্তিরে পার্কটা বন্ধ করে দেয় বুঝি? এমনি শুধাই।
হ্যাঁ। যত গুন্ডা বদমাসরা ভেতরে গিয়ে গুলতানি করে কিনা! জটলা পাকায় রাতভোর। পার্কগুলো রাত্রে তাই বন্ধ করে রাখে।
ও।
যাক, লাফিয়েই যেতে হবে তা হলে। কী আর করা যাবে? অগত্যার মতন তিনি কন-লাফাতে পারবে তো?
আমি ইতস্তত করি। এই ক্ষুধিত ক্লান্ত দেহে আপাদমস্তক ঘুম নিয়ে লাফিয়ে ওই রেলিং পেরুতে হবে? হাই জাম্পের কসরতে কোনদিনই আমি পোক্ত ছিলাম না, হ্যাঁ, সতীশ হলে পারত বটে অনায়াসেই। স্পোর্টস-এ সে প্রায় অদ্বিতীয়। এক হাই জাম্পেই ঐ রেলিং পার হওয়া তার পক্ষে কিছু না!
ডিঙিয়ে যেতে পারি। আমি বলি-ডিঙোব কেন বলুন তো?
তার জবাব না দিয়ে তিনি বলেন- তা হলে ডিঙাও। ওঠো তা হলে।
রেলিং ধরে উঠি।
ধরতে হবে? ধরব তোমায়? ধরে নামিয়ে দেবো ওধারে?
না না, ধরতে হবে না আপনাকে। ধৃত হবার আগেই আমি নিজেকে উধৃত করেছি। খাড়া হয়েছি রেলিং-এর মাথায়।
বাঃ! আর কী? লাফিয়ে পড় এবার। বেশ। এবার, সামনে ঐ বেঞ্চি দেখছ তো সব? দীঘিটার চারধারেই রয়েছে। সকালে বিকেলে হাওয়া খেতে এসে বসে এখেনে লোকেরা। এখন সব ফাঁকা। ওর একটায় গিয়ে শুয়ে পড় স্বচ্ছন্দে। নিশ্চিন্তে ঘুমোও। কেউ কিছুটি বলবে না।
বলে আর দ্বিরুক্তি না করে তিনি নিজের পথ ধরেছেন। দেখতে না দেখতে নিরুদ্দেশ।
আমিও আর কী করব? রাত্রের আহার বাসস্থানের দুরাশায় জলাঞ্জলি দিয়ে খিদে তেষ্টা মেটাতে সিধে হেদোর ঘাটে গিয়ে অঞ্জলি ভরে জল খেলাম। এক পেট জল ঠেসে এক পিঠ বেঞ্চির তক্তায় গড়িয়ে পড়লাম এসে। নিমেষের মধ্যে আমিও নিরুদ্দেশ!
একজনের ঠেলায় পড়ে এখানে এসে শুয়েছি, আরেকজনের ঠেলার চোটে উঠে বসতে বলো এখন।
চোখ মেলে দেখি এক বর্ষীয়ান ভদ্রলোকের চোটপাট আমার ওপর।
আজকালকার ছেলেরা যেন কী! কখন সেই পাঁচটায় ভোর হয়েছে, ছটা বাজে এখন। এখনও পড়ে পড়ে ঘুমুচ্ছে! দ্যাখো না। সেই কোন্ প্রত্যুষে আমি উঠেছি–উঠে বেড়াতে বেরিয়েছি, এর মধ্যে এই হেদোয় আমার সাত পাক ঘোরা হয়ে গেল আর এখনো পড়ে পড়ে ঘুম বাবুর! আশ্চর্য! ওঠো হে! এটা নাক ডাকানোর জায়গা নয়, লোকজনের বসবার জন্যে। জোয়ান ছেলে, শরীর ভালো করতে চাও তো ওঠে পড়ো চটপট! উঠে দৌড়াও এখন–হেদোর চারধারে চার চক্কোর লাগাও গে… চন্দ্র বতিকে কোরবর্তী করার তাঁর অপপ্রয়াস।
চোখ মেলে তাঁর হিতোপদেশ শুনছি, আলস্যি আমার ভাঙেনি তখনো। আমার পাঁজরায় তাঁর ছড়ির এক টোর লাগিয়ে আমেজটা তিনি ভাঙিয়ে দিলেন তক্ষনি।
উঠে সামনের ঘাটে মুখহাত ধোও গে! দৌড়োতে বলছি না তোমায়? আমি…কখন সেই প্রত্যুষে উঠেছি, উঠে আমার দন্তধাবন সেরেই না…।
এখানে এসে পরের পশ্চাদ্ধাবনে লেগেছেন! ধড়মড় করে উঠে বসলাম-তাঁর ছড়ির খোঁচায়। আমেজ যাওয়ার পর মেজাজ দেখা দিয়েছে আমার।
পাঁজরার খোঁচাটা যেন পেটের মধ্যেও গিয়ে খোঁচাতে লাগল–যেমন কানের গোড়ায় তেমনি যেন আমার প্রাণের গর্ভেও খচখচানি শুরু হয়ে গেল কেমন।
কোনো কোনো রাক্ষসের যেমন ভোমরার মধ্যে প্রাণ লুকোনো থাকে, উপকথায় শোনা গেছে, আমার অন্তরাত্মা তেমনি যেন আমার পেটের অন্তরালে। ঘুম ভাঙার সাথে সাথেই তিনি খিদের জ্বালায় জ্বলে উঠেছেন।
না, উঠতেই হয় এবার। উঠে ঘাটের পৈঁঠেয় গিয়ে আবার এক পেট জল না খেলেই নয়।
রাজেন মল্লিকের মহাপ্রসাদ তো সেই বারোটা বাজিয়ে তারপরেই না!
ততক্ষণ যুঝতে হলে…সারা কলকাতা খুঁজতে গিয়ে ঐ দীঘিটাই নজরে পড়ে!
ঘাটের থেকে এক-আধ আঁজলা মুখে তুলেছি কি না, অমনি সেখানেও ফের আরেক ঠোকর!
আরে আরে! এই! তুমি করছো কী?
আমার সমবয়সী একজন পৈঠায় বসে দাঁতন করছিল, সে-ই বাধা দিয়েছে : এই, জল খাচ্ছো যে?
কেন, কী হয়েছে?
পুকুরের জল কি খেতে আছে নাকি?
খিদে তেষ্টা পেলে কী করব তাহলে? খালি পেটে থাকলে পিত্তি পড়ে না? সেই পিত্তি। পড়ার দাবাই-পেটে কিছু দিতে হয়। জল পথ্যি করে তাই দিচ্ছিলাম। তোমার তাতে আপত্তি কিসের?
জল খাও না কেন, আমি কি বাধা দিতে গেছি! শুধু ঐ পুকুরের জলটা খেতেই মানা করছি তোমায়। বাইরে রাস্তায় ফুটপাথের ওপর জলের কল আছে-কলের জল খাও না গিয়ে। কলের জলই তো খায় সবাই, পুকুরের জল কেউ খায় না কখনো।
বলেছে তোমাকে! দেশ পাড়াগাঁয় পুকুরের জল খেয়েই বাঁচে মানুষ। সেখানে কল কোথায় গো? কল তো তোমার এই কলকাতাতেই কেবল। কিন্তু দেশে? সেই অজ পাড়াগাঁয়ে?
দেশে কি ওই পুকুর ছাড়া কিছুই নেই আর?
