দেখতাম যারা খানিক আগেও আমার কাগজের আবেদনে কর্ণপাত করেনি, অবহেলার নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকিয়েছে আমার দিকে, সিনেমা শুরু হবার একটু বাদেই তারাই আবার হাউসের থেকে ক্ষিপ্তভাবে বেরুচ্ছে–কে যেন ধরে ধরে সেখান থেকে নিক্ষিপ্ত করছে তাদের।
আর চট করে আমার কাছ থেকে কিছু বাছবিচার না করেই দু পয়সার যে কোনো একটা কাগজ কিনেই না তীব্র বেগে ফের হাউসের ভেতর ফেরত যাচ্ছে ফের।
সিনেমার টিকিট পকেটে রেখেও তখনও বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে কাগজ বেচে চলেছি।
সিনেমার আসল বই বেশির ভাগই সিরিয়াল ছবি ছিল সেকালে, পার্ট বাই পার্ট দেখানো হত হপ্তায় হপ্তায়) শুরু হবার গোড়ায় বিদেশী নিউজ রীল কি দুরীলের কমিক ছবি কিছু দেখানো হত তখন-তারপর মিনিট পনের বাদেই আরম্ভ হত আসল বইটা। তরপর কাউকে আর তীরবেগে বাহির হতে দেখা যেত না, আমিও তখন হলের ভেতর ঢুকে জায়গা দখল করে বসতাম।
বেশির ভাগ কাগজ তিনটে ছটায় কাটত, বাকী যা থাকত তা নটার শো শুরু হবার পরই শেষ হয়ে যেত–শুধু একটা বাদে। সেই একখানা কাগজ আমি কিছুতেই বেচতাম না, তিন গুণ দাম দিলেও নয়। সেটা আমার নিজের কাজেই লাগত।
সিনেমা হলে, বিশেষ করে চার আনার সিটে যা ছারপোকাদের গুলজারি তখন! মহামারী কান্ড বাধত যেন। তখন এক গন্ডার ছাড়া এক দন্ড বসে থাকে সাধ্যি কার! সিনেমা হল অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথে আমার গন্ডা গন্ডা কাগজ মুহূর্তের মধ্যে ফরসা হয়ে যেত।
ভেবে দেখলে, এ দেশে সংবাদপত্র-প্রচারে, আর এই সূত্রে শিক্ষার প্রসারেও, ছারপোকার অবদান নেহাত কম নয়। এমনকি আমি রিকশাওয়ালাকেও বাংলা কাগজ কিনতে দেখেছি, বাংলার ব-বোঝারও যার ক্ষমতা ছিল না। এইভাবে আমি কীর্তিমান জ্যোতিষবাবুর ঢের আগেই লোকসমাজে বাংলা ভাষার বিস্তারে বিশেষ সহায়তা করেছি বলতে পারি।
আর, সত্যি বলতে আমার জীবনে ছারপোকার পৃষ্ঠপোষকতা কিছু কম ছিল না। কেবল যে তারা প্রথম জীবনেই দাঁড় করিয়েছে তাই নয়, সারা জীবন ধরেই আমায় খাড়া রেখেছে…বরাত খারাপ হতে দেয়নি কখনো। যেমন কাগজ কাটাতে তেমনি অবাঞ্ছিত অনাহূত আমার আত্মীয়সঙ্কটের ফাড়াকাটিয়ে দিতেও তাদের জোড়া নেই, আমি বলব। ছারপোকারা এমনই এই ছার জীবনের অঙ্গীভূত যে কেউ আমাকে কখনই নচ্ছার বলতে পারে না। তেমন কটুক্তি কেউ করলে তা আমি অত্যুক্তি বলেই উড়িয়ে দেবো।
রবিবারটায় একশো কি সোয়া শো কাগজ বেচে যা পেতাম তার লভ্য কমিশনের সোল আনাই তিনটে সিনেমার শো আর চিনেবাদামেই ফুকে যেত। শো দেখা আর শোয়া ছাড়া কোনো ধান্দা ছিল না। রাজেন মল্লিকের বাড়ি দুপুরেই সেই যা খেয়েছি বিকেলের দিকে তারা আর খাওয়ায় না। আর, সেদিন শোয়র জন্য ঠনঠনের সেই অ্যালার্মবেলওয়ালীর চত্বরে গিয়ে হাজিরা দেওয়ারও কোনো গরজ নেইকো।
তখনকার কালে সপ্তাহে কাগজ বেরুতে মাত্র ছদিন। রবিবার ছুটি থাকত খবর কাগজের কার্যালয়ে, তাই সোমবারটা কোনো কাগজ বেরুত না একদম। কাজেই সে রাত্তিরে ভোর চারটেয় উঠে কাগজের লাইনে গিয়ে খাড়া হবার কোনো তাড়া ছিল না। চারটে পাঁচটা ছটা পার করে সাত সকালে উঠলেও চলত সেদিন।
রাত্তিরে সেদিন হরিমটর। হরিনাম বাদেই মটর-আস্বাদ। এক পেট খিদে নিয়ে অদূর হেঁটে শোবার জন্যে সেই কালীবাড়িতে সেদিন কে যায়? চতুর্থ প্রহরে সাধ করে নিজের সাধের ঘুমটি ভাঙাতে যাবে কে? সেই ঘুটঘুট্টি ভোরে সজাগ হবার কোনো দায়ই ছিল
আমার সেদিন। মা কালীও সেদিন আমার অতি ভক্তির প্রাতঃপ্রণাম আদায় করতে পারতেন না।
পয়সা চারেকের চানাচুর চিবিয়ে সিনেমা হলের কাছেপিঠে ফুটপাথের ওপর কোথাও তখন গড়িয়ে পড়লেই হল আমার।
অনেককে দেখেছি রাস্তায় শুতে হলেও শোবার আগে চারধারের ধুলোবালি সব ঝেড়েকুড়ে নেয়, হয়ত গায়ের ওড়না দিয়ে ঝেটাতে গিয়ে সেটাকেই ময়লা করে বসে রাস্তা সাফ করার প্রেরণায়। কিন্তু তার কি কোনো মানে হয়? সমুদ্রে শয্যা পাততে গিয়ে শিশিরবিন্দুতে সন্তাপ? হাজার ঝেটিয়েও কলকাতার রাস্তাকে কখনো পরিষ্কার করতে পারে কেউ?
রাস্তায় শুলে ধুলোকে তো ধুলিজ্ঞান করাই উচিত। দুনিয়ার আবর্জনা কি কেউ কখনো সম্মার্জনায় শেষ করতে পারে? এক জায়গার দুঃখ আরেক জায়গায় জমা করে কেবল।
না, আমার ওসব ঝামেলা পোষায় না। পথে বসলাম কি গড়ালাম, আর গড়ালাম কি ঘুমোলাম।
বেশ ঘুমিয়েছিলাম, এমন সময় কে যেন এসে ঠেলে তুলল আমাকে : এই! এই! এখানে ঘুমিয়ে কে?–
ঠেলা খেয়ে উঠে বসতে হল-আমি। নিদ্রাজর্জর স্বরে জবাব দিয়েছি।
আমি! আমি তো দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এখানে শুয়ে কেন? ভদ্রলোক শুধান।
কোথায় যোবো তা হলে? চোখ মুছতে মুছতে বলি।
ভদ্রলোকের ছেলে, ছোটলোকের সঙ্গে রাস্তায় শোয় নাকি? ওঠো ওঠো। এসো আমার সঙ্গে।
ঘুমিয়ে ছিলাম বেশ ছিলাম। ঠেলার চোটে ঘুম ভাঙার পর এখন পেটের খবর টের পাওয়াচ্ছিল। খিদের চোটে অস্থির হয়ে উঠতে হল।
সামনে সমানে দুর্ভিক্ষ। কাল দুপুরে মল্লিক বাড়ির সেই অন্নসত্রে–তার আগে কোথাও কিচ্ছুটি নেই।
কাগজও পাচ্ছিনে কাল সকালে যে, তাই বেচে কিছু নগদ পাব, কিনে খাবটাব তখন।
এই নিরন্ন মুহূর্তে এই ভদ্রলোক ঈশ্বরপ্রেরিত দেবদূতের মতই এসে যেন দেখা দিলেন। পিছু পিছু যেতে যেতে ভাবি। ওঁর বাড়িতে বোধ হয় ঠাঁই হবে আজ আমার। খাওয়াবেন তো বটেই, কোনো কাজও দেবেন নিশ্চয়। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের পড়ানোর বিনিময়ে কারো কারো বাড়িতে থাকা-খাওয়ার কাজ পাওয়া যায় কলকাতায়। পড়ুয়া ছেলেরাই পেয়ে থাকে, সেই হকার ছেলেটি জানিয়েছিল আমাকে। তেমনি একটা কাজ হয়ত আমার জুটে যাবে এঁর কৃপায়। তাই যদি পাই তো বর্তে যাই-বেশ হয় তা হলে। কাগজ বেচার ওপর এই উপরি পাওনাটা হলে মন্দ কি? তা হলে আর আমার ফি সোমবার এই উপোষ পোয়াতে হয় না। পোষ মাস এসে যায় নগদ।–খুলে যায় আমার বরা-কেটে যায় ধরাশায়ী হবার রাত।
