সে কথা আমি কইছি না। নতুন বই হাতে পেলে…না না, বউয়ের কথা নয়, কারও বউয়ের বিষয়ে বলছিনে, বইয়ের কথাই হচ্ছে! নতুন বই হাতে এলে কে না একটু নেড়েচেড়ে দ্যাখে! অদ্ভুত লোক আপনি। সেই কৌতূহলটুকুও হল না আপনার! নতুন বই তো আগ্রহভরে শুঁকেও দেখে থাকে অনেকে, আমি শুনেছি। তার ঘ্রাণ নাকি চমৎকার!
আমিও কি দেখিনি নাকি? সত্যি বলতে, ঐ খুঁকে দেখা পর্যন্তই বইয়ের জ্ঞান আমার। ঘ্রাণেই অর্ধভোজন হয়ে যায়, গোটা বইটা গোগ্রাসে গেলার দরকার করে না। ও ছাড়াও কি বই আমি পড়িন নাকি? মস্ত মস্ত বইও পড়ি। আগাপাশতলাই পড়ে ফেলি একরকম। হস্তগত হলেই তার প্রথম প্যারা আর শেষ প্যারাটা পড়ে দেখি একবার চোখ বুলিয়ে নিই বেশ করে–তাতেই আমার আদ্যোপান্ত পড়া হয়ে যায়। তখন আগাগোড়াই বইটা আমার পড়া যে, সে কথা জানাতেও বাধা থাকে না কোথাও, মিথ্যেও বলা হয় না বিশেষ। আমার বিদ্যের দৌড় বইয়ের ঐ প্রথম আর শেষ প্যারা। পড়ার ব্যাপারে আমার প্যারালাল আপনি পাবেন না!
তার কোনো জবাব না দিয়ে শ্রী জনাব, আচ্ছা, বিষ্ণু দে-র কবিতা আপনার কেমন লাগে বলুন দেখি? রগ ঘেঁষে গুলি করার মতই রগরগে প্রশ্নটা তিনি ছুঁড়ে বসলেন হঠাৎ!
ভাবিত হতে হলো। আমাদের কালে সামাদ যেমন তালের মাথার পায়ে বল পেলে কোণের থেকে টুক করে তা গোলের মুখে ফেলে দিত, তেমনি ইনিও যেন এই প্রশ্নটায় আমায় একেবারে কর্নার করলেন! কোণঠাসা করে আমাকে কোনো গোলের মধ্যে ফেলার মতলবেই কি না কে জানে, উনি তো অবলীলায় এই প্রশ্নটা পাশিয়ে বসেছেন–এখন এর ফলে কোনো গোল না বাধলেই হয়। স্বভাবতই আমি গোলমলে কিছুর মধ্যে যেতে চাই না।
গ্রীক ল্যাটিনে লেখা ওঁর কবিতার আমি বুঝবো কী মশাই? আমি তো ওসব ভাষা জানিনে। সবিনয়ে জানাই।
গ্রীক ল্যাটিন! বলছেন কী মশাই? বাংলা ভাষায় লেখা যে?
বাংলা হরফে লেখা হলেই কি বাংলা হয়? বাঙালী পাঠকের বোধগম্য হওয়া চাইনে? সংস্কৃত যদি আমি বাংলা বর্ণমালায় লিখি তা হলেই কি তা আর সংস্কৃত থাকবে না? ওঁর লেখা সব সংস্কৃতের সগোত্রই–ক্লাসিক নয় কি?
ক্লাসিক অবশ্যই এবং ফাস্ট ক্লাস বটে, একটু থেমেই ওঁর পুনশ্চ যোগ : দেখুন, আপনার ছোঁয়াচে এসে আপনার বাকভঙ্গীর ব্যারাম আমাকেও পাকড়াচ্ছে… কিন্তু মাপ করবেন, আপনার কথাটা আমি মেনে নিতে পারলুম না। বেশ, সুধীন দত্তর কবিতা সম্বন্ধে আপনার কী মত?
অভিন্ন মত। ঐ জাতীয়, উনিও পুরোদস্তুর ঐ ক্লাসের। মানে, ঐ ক্লাসিকই। বলার পর আমারও পুনর্বিন্যাস : হ্যাঁ, ঐ সুধীন দত্তই। উনিই বিষ্ণুবাবুর কবিতার সমঝদার হতে পারতেন। আর, সেটা হতে সমান পাল্লার, সমানে সমানে কোলাকুলি-এ গ্রীক মীটিং এ গ্রীক!।
মানতে পারছি না ঠিক। আচ্ছা, বিষ্ণু দে-র এখনকার কবিতা আপনার কেমন লাগে?
এখনকার কবিতা? মহাকবি মাইকেলের মতন উনিও শেষে স্বদেশে এসে পৌঁছেছেন। নিজের মাতৃভাষায় ফিরেছেন এখন। বলতে হয় ওঁর বেশ অবনতি ঘটেছে সম্প্রতি। পাঠকদের পৈঠায় নামিয়ে এনেছেন নিজেকে। ভালোই করেছেন। এখন ওঁর কবিতা আর আগের মতন অস্বচ্ছ নয়। প্রায় মোটামুটি বোঝা যায়। এমন কি, আমিও এক-আধটু বুঝতে পারি।
আর ওঁর আগেকার কবিতা…।
আমার কী মনে হয় জানেন? বাধা দিয়ে আমি মনের কথাটা বলে নিই : মানে হলেও সে-সব লেখা অতিশয় উচ্চ মানের। ওগুলি বাংলায় অনূদিত হলে আমাদের সাহিত্যের সম্পদ বাড়বে যে, সে বিষয়ে আমি নিঃসন্দেহই।
.
৪০.
এই কাগজ ফেরি করার কালে রবিবারটা ছিল আমার আকালের। সেদিন প্রায় দুর্ভিক্ষপাতি দশায় কাটাতে হত আমায়।
বেথুনের স্কুল-কলেজ বন্ধ সেদিন। দিদি-ভাইয়ের কারোই দর্শন নেই। তাই অন্যদিনের মত ইস্কুল-কলেজ শুরুর আগে আধ ঘন্টার ফাঁকেই পাঁচশো কাগজ কেটে যাবার কোন অর্ধোদয় যোগ ছিল না সেদিন।
হেদোর কিনারে দাঁড়িয়ে হেদায়েৎউল্লা খাঁর মতন রাজত্ব করার কোনো মানে ছিল না সেদিন। চারধারই সেদিন খা খাঁ।
রবিবার তাই অল্প কাগজ আনতাম, শদেড়েকের বেশি নয় কখনই। কিন্তু তাই কাটাতেই হিমসিম খেতে হত আমায়।
সেদিন তাই চলে যেতাম সিনেমাপাড়ায়। হাবািগান এলাকায়। সিনেমা হাউসের সামনেই যা কাগজ বেচার জো ছিল রবিবার।
আমার সেই দেড় শো কাগজ কাটাতেই সিনেমার তিনটে শো লাগত। তিনটে, ছটা, নটায় গিয়ে খতম হত যত কাগজ।
তিনটের শো শুরুর আগেই দাঁড়াতাম গিয়ে হাউসের সামনে। গোড়াতেই নিজের একখানা চার আনা দামের ফোর্থ ক্লাস টিকিট কিনে রাখতাম। তারপর আমার কাগজ বেবার পালা।
আহার আর ওষুধ সেদিন এক যোগেই আমার : সিনেমা দেখা আর কাগজবেচা রথদেখার মেলায় গিয়ে কলা দেখানোর বিদ্যেকে টেক্কা দিয়ে।
সেকালে ঐ হাউসগুলির নাম ছিল বুঝি কর্নওয়ালিস থিয়েটার আর ক্রাউন সিনেমা, উত্তরকালে উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হয়ে এখন যা নাকি উত্তরা আর শ্রী-তে দাঁড়িয়েছে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল সন্ধ্যের দিকে কারো খবর কাগজের ঝোঁক থাকার কথা নয়, সত্যিকার পড়ুয়াদের সেই সাত-সকালেই কাগজ পড়ে দুনিয়ার সব খবর জেনে নেওয়া হয়ে গেছে। তা ছাড়া, সিনেমা হলের অন্ধকারে বসে কাগজ পড়াও যায় না সেখানে ছবি দেখতেই যাওয়া,কাগজ পড়তে নয়-তা হলেও অপ্রত্যাশিতভাবে আকস্মিক কাগজ কেনার ধুম পড়ে যেত–আর কাগজের গাদা খতম হত আমার তখনই। ভুঁইফোড় পাঠকদের তাগাদায়।
