আর নজরুল ও সুকান্ত? তাঁরাও কি তাই?
তাই না কি? তাদের কাজ সবজনকে নিয়ে হয়ত নয়, কেবল তাঁদের কালের বৈপ্লবিক উদ্বোধনে-বিপ্লবীজনদের জন্যেই। তাহলেও নজরুল নিজেকে যুগের নন হুজুগের কবি বলে গাইলেও সত্যিকারের যুগের দাবীও তিনি মিটিয়ে গেছেন–তাঁর গানেই তাঁর কালের বিপ্লবীরা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। আর সুকান্তও তেমনি, তাঁর অনুসরণেই একালের বিপ্লবপথিকরা এসেছে সব, দল বেঁধে এগুচ্ছে তারাই–এ যুগের বিপ্লবচেতনা যুগিয়ে গেছে সে-ই তো!
কিন্তু যুগের দাবী মেটানো ছাড়া কি সাহিত্যের আর কোনো দায় থাকতে পারে না? সাহিত্যিকের নিজের কোনো দাবী থাকতে নেই?
হ্যাঁ, আছে বইকি। তার আত্মপ্রকাশের দাবী। তাও আছে। মনের রূপ তো সাহিত্য; সেই মনোরূপের কলাসম্মত অপরূপ প্রকাশ-ব্যক্তিগত সেই দাবীও সাহিত্যিকের থাকতে পারে বইকি।–সে দায়ও তাকে রাখতে হবে অবশ্যই। যুগের নয়, জাতির নয়, নিছক নিজের গরজে নিজের জন্যই সাহিত্য, হ্যাঁ, তাও আছে। কেউ কলা বাঁচিয়ে যুগের সঙ্গে নিজের দায় দুই মেটায়, দু-ই পারে; কেউ শুধু একটাই বজায় রাখে, একটাই পারে। জাতির এবং সমাজের কথা না ধরে কেবল সাহিত্যের দিক দিয়ে ধরলে কেউই এদের ফ্যালনা নয়। তবে যে কলাও বেচে আবার রথও চালায়, আমার বিবেচনায় সেই বড়ো। একাধারে রথী এবং সারথী যে-সে-ই যুগন্ধর।
তবে কথা কী জানেন? একটা হল শুধুই রূপশিল্প, আরেকটা জীবনশিল্প। তবে উভয়েরই শিল্পরূপসম্মত হওয়া চাই। একজন কেবল নিজের জীবনকেই টেনে বুনে দেখায়, অপরজন সবার জীবনকে গড়ে দিয়ে যায়–তাদের অজ্ঞাতসারে। পার্থক্য এইখানে। একজন শুধুই সাহিত্য সৃষ্টি করে, আরেকজন সাহিত্যের সঙ্গে নয়াসমাজও তৈরি করে দেয়। কোথাও আমাদেরই বদলে দিয়ে নতুন করে বানায়, কোথাও বা নব প্রজন্মে আনকোরা নয়া আমদানির পথ গড়ে যায়। আসে নবীন জাতি, অভিনব জাতীয়তার। যেমন গান্ধীজী, চলতি মানুষদের বদলে নিয়ে কাজ চালিয়েছিলেন; আর রবীন্দ্রনাথ নতুন মানুষদের গড়ে দিয়ে গেছেন–সাংস্কৃতিক, মানবিক দুদিক দিয়েই।
আর, আপনার ক্ষেত্রে? এটা যদিও একটু ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসা, মাপ করবেন।
মাপ করব বই কি, আপনাকে আমাকে দুজনকেই। আমাকে আমার মাপাই আছে। যারা নিজের দায় আর যুগের দায় একসঙ্গে মেটায়, সেই মহৎ স্রষ্টা মহারথীদের সগোত্র আমি নই। আমার কোথাও কোনো দায় নেই–নিছক আদায়। আমার ভাগ্যে দায়ভাগ ন্যস্ত, আছে কেবল আদায়ভাগ। দায়সারা কাজে নিজের আদায় সারা। আর কলাকারুর দিক দিয়ে? আদায় কাঁচকলা!
তারপরে হ্যাঁ, যে কথা হচ্ছিল আমাদের, সত্যিকারের সাহিত্যিকদের নিয়ে…দেখা যায়, তাঁদের সাহিত্যসাধনার একদিকে দেখি রূপ-শিল্প, অপর দিকে কেবল শিল্পরূপ। বিভূতিভূষণ প্রথম সারির, তাঁর রচনায়, পল্লীরূপ, প্রকৃতিরূপ, প্রকৃতির অনুষঙ্গী নিজের মনোরূপ–তারই আশ্চর্য প্রকাশ; দ্বিতীয় সারিতে আছেন প্রমথ চৌধুরী, যাঁর কাছে শিল্পরূপটাই সার। একের লক্ষ্য কী বলব; আরেকের কেমন করে বলব; একজনের কলা বজায় রেখে বলা, অপরের বলাটাই হচ্ছে কলা।
রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতায় এই দুই ধারারই অদ্ভুত সংমিশ্রণ দেখি আমরা। তিনি তো সব সময়ই সবাইকে টেক্কা দিয়ে গিয়েছেন–সর্বকালের জন্যই!
বঙ্কিমের কালেও এমনটা দেখা যায়। তারক গাঙ্গুলির স্বর্ণলতায় (এই একটি বইয়েই সমকালীন সবাইকে তিনি ছাড়িয়ে গিয়েছেন) অপরূপ শিল্পসুষমায় সেকালের সমাজের নিখুঁত রূপচিত্রণ দেখা যায়, কিন্তু তার পাশাপাশি দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ আর সধবার একাদশী দেখুন, সেখানে পাবেন সামাজিক রূপ আর চেহারা দেখাবার সঙ্গে সেটা বদলাবার বৈপ্লবিক প্রয়াস।
এমনি ধারাই চলছে সাহিত্যে; চলেছে, চলবে বরাবর। শ্রেয়ঃ আর প্রেয়-র দুটি বারাই পাশাপাশি। আবার কোথাও বা এই দুয়ের সংমিশ্রণের সঙ্গে তৃতীয় এক সারস্বত সেই মনোরূপের কলাসম্মত অপরূপ প্রকাশ-ব্যক্তিগত সেই দাবীও সাহিত্যিকের থাকতে পারে বইকি। সে দায়ও তাকে রাখতে হবে অবশ্যই। যুগের নয়, জাতির নয়, নিছক নিজের গরজে নিজের জন্যই সাহিত্য, হ্যাঁ, তাও আছে। কেউ কলা বাঁচিয়ে যুগের সঙ্গে নিজের দায় দুই মেটায়, দুই পারে; কেউ শুধু একটাই বজায় রাখে, একটাই পারে। জাতির এবং সমাজের কথা না, ধরে কেবল সাহিত্যের দিক দিয়ে ধরলে কেউই এদের ফ্যালনা নয়। তবে যে কলাও বেচে আবার রথও চালায়, আমার বিবেচনায় সেই বড়ো। একাধারে রথী এবং সারথী যে-সে-ই যুগন্ধর।
তবে কথা কী জানেন? একটা হল শুধুই রূপশিল্প, আরেকটা জীবনশিল্প। তবে উভয়েরই শিল্পরূপসম্মত হওয়া চাই। একজন কেবল নিজের জীবনকেই টেনে বুনে দেখায়, অপরজন, সবার জীবনকে গড়ে দিয়ে যায়–তাদের অজ্ঞাতসারে। পার্থক্য এইখানে। একজন শুধুই সাহিত্য সৃষ্টি করে, আরেকজন সাহিত্যের সঙ্গে নয়াসমাজও তৈরি করে দেয়। কোথাও আমাদেরই বদলে দিয়ে নতুন করে বানায়, কোথাও বা নব প্রজন্মে আনকোরা নয়া আমদানির পথ গড়ে যায়। আসে নবীন জাতি, অভিনব জাতীয়তার। যেমন গান্ধীজী, চলতি মানুষদের বদলে নিয়ে কাজ চালিয়েছিলেন; আর রবীন্দ্রনাথ নতুন মানুষদের গড়ে দিয়ে গেছেন–সাংস্কৃতিক, মানবিক দুদিক দিয়েই।
