তার কারণ? তিনি বিস্মিত হন।
ছেলেদের বই তো যতো আমার। ছেলেরা নিয়ে গেছে। হাতে হাতে ঘুরছে সে-সব বই। তারপর হাতাহাতি হতে হতে তার সামনের পাতাগুলো উড়ে গেছে, শেষের পাতাগুলো খসে গেছে–তখন সেই ছেঁড়াখোঁড়া বই ফেরত দেওয়া তারা বাহুল্যই বোধ করেছে। লোকপ্রিয় লেখক না হয়েও, নেহাত বালকপ্রিয়তার হেই আমার বইয়ের এই বিরলদশা। এই আমার ধারণা। তবে এটা একরকমের আমার সৌভাগ্যই বলতে হবে। এই ভাবেই বোধহয় আমার বইয়ের কাটতি বেড়েছে। লাইব্রেরিতে পায় না বলে কিনে পড়তে হয়েছে তাদের। কিন্তু আমার বই না পড়লেই বা তাদের কী আসে যায়? খেলাধূলায়, সিনেমা দেখার সময় কেটে যায় তাদের।
তাদের না হয় কাটলো, কিন্তু আপনার কাটে কী করে? একদম কোনো বইটই না ছুঁয়ে, কিছু না পড়ে-উড়ে সময় কাটান কী করে?
কিছু পড়ি না যে কে বললে? পড়তে হয় বইকিবই না হলেও ঐ খবরের কাগজ পড়তে তো হয়ই। তিন-চারখানা কাগজ পড়ি রোজ–আগাপাশতলা খুঁটিয়ে পড়তে হয় আমাকে। তিন শ লাই পড়ে তবে হয়ত একটা লাগসই খবর পাই, যা আমার ওই তিন লাইনের টিপ্পনিতে লাগে। লেখা অল্প–কিন্তু পড়া বিস্তর–এই আমার অল্পবিস্তর লেখাপড়া। এখনকার। বললাম না, সারা জীবনটাই আমার সাংবাদিক? খবরের কাগজ ফেরি করে এই জীবনের শুরু, এখনও সেই ফেরিঘাটেই রয়ে গেছি। খবরের কাগজের হকার থেকে খবরের কাগজের জোকার এখন।
তা আছেন বেশ।
তা আছি। এই খবরের কাগজই আমায় বহালতবিয়তে বাঁচিয়ে রেখেছে। সেইসঙ্গে এ বাংলা দেশের ছেলেমেয়েরাও। বেথুনে পড়া বাঙালীর মেয়েরা কাগজ কিনত, তা-ই বেচে খেয়েছি এককালে। আর, ছোট-ঘোটরা আমার বই কিনেছে বলেই আমি খেয়ে বেঁচেছি, বড় হয়েছি। এবং যখন আর লিখতে পারব না, এই কলম চলবে না, মগজে কিছুই আসবে না আর, কাগজে আমার কোনো লেখাই নেবে না ভুলেও…তখন…তখন…
তখন কী করবেন?
সেই বেকারি দশায় গিয়ে হয়ত আমায় এই কাগজের হকারিতেই ফিরে আসতে হবে আবার। ঐ একটা কাজ তো কেবল জানা আছে জীবনে। অবশ্যি, এখন এটা আরও লাভজনক হবে আশা করি। তখন দুপয়সার আনন্দবাজারে আধ পয়সা কমিশন মিত মোট, এখন কাগজের দাম বেশি, কমিশনও বেশি। মোটামুটি লাভ। বেশ আনন্দেই কাটাবো।
আমার ধারণায় সাহিত্যের সঙ্গে দায়িত্ব জড়িয়ে আছে…।
জনাব সাহেবের দরবারে আমার জবানবন্দী খতম করি : সমাজ আর সময়ের সহিত গেলেই তার হয় না। তার থেকে এগিয়েও যেতে হয় তাকে। শুধু পথের সঙ্গী হওয়াই নয়, পথ দেখাতেও হয় আবার। সাহিত্য কথাটায় সহিত-ত্বর ওপরই জোরটা বেশি দেওয়া বটে, কিন্তু তার জের ঐখানেই মেটে না। সহিতের মধ্যে যতটা সহ-তা ততখানিই কি হিত-ত্ব নেই আবার? তৎকালীন সমাজ ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে শুধু তাকে প্রতিবিম্বিত করেই তার দায় খালাস হয় না। ভাবীকালের দাবিও মিটিয়ে যেতে হয় সেই সাথেই।…
অর্থাৎ?
অর্থাৎ, যথার্থ সাহিত্যিক, আমার ধারণায়, তাঁর নয়া সাহিত্য সৃজনের সাথে নতুন সমাজও সৃষ্টি করে থাকেন, সমাজব্যবস্থা পালটে দেন, সময়ের ধারা বদলে দিয়ে যান। যেমন রুশো, ভলটেয়ার, গোর্কি, সিক্লেয়ার, ইবসেন ইত্যাদি। আমাদের সাহিত্যে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল আর সুকান্ত।
এক নিশ্বাসে পাঁচটা নাম উচ্চারণ করলেন?
পাঁচজন অবশ্যি পাঁচ ধারা-সেকথা সত্যি। ধার এবং ধারণাও তাঁদের পাঁচ রকমের কিন্তু তাঁদের স্বতন্ত্র সৃষ্টিপ্রয়াস উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে অভিন্নই। সামাজিক গতিমুক্তির উদ্দেশ্যেই সেই প্রয়াস। আর, সেইদিক দিয়েই তাঁদের ঐক্য আর সার্থকতা।
বিশদে বলুন।
বঙ্কিমচন্দ্র অবশ্যই পথিকৃৎ, তাঁর সম্বন্ধে দ্বিরুক্তির অবকাশ নেই। তা হলেও তাঁর সমকালীন প্রায় সকলেই বিপ্লবী। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দ–নিজের নিজের পথে কে নন? নিজের নিজের খাতে পুরাতনের উৎখাতে সকলেই উচ্ছ্বসিত নবযুগ নিয়ে এসেছেন। খতিয়ে দেখলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরো অনেক ভগীরথের সন্ধান মিলবে।…।
আমরা এখানে সাহিত্যক্ষত্রেরই আলোচনা করছি। জনাব সাহেব আমায় মনে করিয়ে দেন। আনুষঙ্গিক প্ৰসঙ্গাতরে যেতে তিনি নারাজ।
সাহিত্যের কথাই কইছি তো। শরৎচন্দ্রকেই ধরুন না। তিনিও কি তাঁর লেখার ধারে সমাজের রূপরেখা বদলে দেননি? তাঁর কালের পল্লীসমাজের অরক্ষণীয়ারা কি আছে এখনো? তাঁর পথের দাবী কি সমসাময়িক যুগবিপ্লবের প্রয়োজন মেটায় নি? পথ দেখায়নি সেকালের বিপ্লবীদের? অথচ তিনি আমাদের সমাজব্যবস্থা পালটে দিয়ে গেছেন সকলের অগোচরে, তাঁর শিল্পকলার একটুখানিও ক্ষুণ্ণ না করে তাঁর রচনার কোথাও একটুও সোচ্চার না হয়ে। কত বড়ো আর কী নিপুণ শিল্পী দেখুন। একেই আমি সত্যিকারের সাহিত্যিক আর যথার্থ সাহিত্য-সাধনা বলব–যা নাকি সমাজের দাবী, সময়ের দাবী, সেই সাথে ভাবীকালের দাবী মেটায়।
কথাটা ঠিক। মানতে তিনি রাজী।
আর, রবীন্দ্রনাথের কথা তো বলাই বাহুল্য। তিনি তো সব দিক দিয়েই আমাদের জাতির ধারা পালটে দিয়ে গেছেন–তাঁর নানান সাংস্কৃতিক উদ্ভাবনা আর শিল্পসাধনায়-যা নাকি দস্তুরমতই বৈপ্লবিক। রবীন্দ্রনাথ আর শরৎচন্দ্র দুজনে মিলে আমাদের হৃদয়মন মথিত করে নয়া মানসিকতায় উন্মথিত উদ্বর্তিত আনকোরা আরেক জাতের মানুষদের নিয়ে এসেছেন এদেশে। নিজের সাহিত্য-শিল্পের দাবী আর নিজের যুগের সঙ্গে যুগোত্তর দাবী দুই-ই তাঁরা মিটিয়েছেন যুগপৎ।
