হয়ে আপনি লাভবান হয়েছেন, একথা আপনি মানবেন নিশ্চয়?
আমার লাভ? না, আমার কী হবে–তবে বাংলা সাহিত্যের যে লাভ হয়েছে তা আমি বলব। লিখতে হলে কী লিখতে হয়, আর কী করে লিখতে হয় টের পেয়ে গেলাম আমি। সাহিত্য সৃষ্টি করতে হলে অমনধারাই করতে হয়–অমনটাই হওয়া চাই। আর বুঝলাম যে তা আমার দ্বারা হবার নয়। ওদিকেই তাই গেলাম না আর বেঁচে গেল বাংলা সাহিত্য-আর বাঙালী পাঠক–একটা উপকার হলো না? সাহিত্যও বাঁচল, আমিও বেঁচে গেলাম। সাহিত্যের পাশ কাটিয়ে চলে এলাম এই সাংবাদিকতায়-যে বিষয়ে রপ্ত হচ্ছি এখনো–যেদিক দিয়ে আমার আমদানি রপ্তানি।
না না, আপনি গল্পটল্পও তো লিখেছেন কিছু কিছু-ছোটদের বড়দের। সাতসতের অনেক কিছুই লিখেছেন আপনি। সাহিত্যিকও বলা যায় বইকি আপনাকে।
ভদ্রলোক তাঁর স্তোকবাক্য শোনান।
ঐ টেনে-বুনে। সাত-সতের অনেক কিছুই লিখেছি বটে, সব মিলিয়ে সংখ্যায় সাত শো তেরই হবে হয়তো বা-লেখার ঐ মোট নামিয়ে মজুরি কুড়িয়েই তো মোটামুটি বেঁচে থাকতে হয়েছে এতকাল–কিন্তু সত্যি বলতে কিছুই কিছু হয়নি। শিশুসাহিত্য শিশুদের হয়নি, বড়দের লেখা বড়দের পড়ার মত নয়।
তবে কাদের জন্য? কী লিখেছেন এতদিন ধরে তাহলে?
আমিও তাই ভাবি। কী লিখলাম তবে? আমার লেখা কী ধরনের ছোট-বড়রা পড়ে বলব? যারা সত্যিকারের ছোট নয়, আকারে ছোট কিন্তু প্রকারে বড়, বয়সে বারো কিন্তু মনের বাড় তার ঢের বেশি-আসলে ভেতরে ভেতরে তারা যুবকই বলতে গেলে। প্রায় যুবক, কিংবা যুবকপ্রায়–যাই বলুন। তারাই আমার লেখায় রস পায়। আর বড়দের কথা শুধপাচ্ছেন? যারা বয়সে অনেক বেড়ে গেলেও অন্তরে সেই শিশুটি কি কিশোেরই রয়ে গেছে–মনের দিকে বদলায়নি বিশেষ–আমার বড়দের লেখা কেবল তাঁরাই পড়ে থাকেন। এককথায়, আমার লেখা-ফর অ্যাডালটস্ ওনলি। আর ঐ মার্কার যা কিছু, ছোটরাই তার গ্রাহক তা জানেন তো? আর, ছোটদের বড়ো হবার শখ-বড়ত্বে ঝোঁক, কে না জানে? এবং বিস্ময়কর শোনালেও বড়রা সব ছোট হতে চায়। তাই যারা ফের মনের কৈশোরে ফিরে যেতে চান–সেই বড়রাই আমার অনুগ্রাহক। এককথায় আমার লেখা আসলে অ্যাডালটারেটেড।
অ্যাডালটারেটেড? মানে, ভেজাল বলতে চাচ্ছেন আপনি?
হ্যাঁ, ভেজাল বইকি? আর এই কারণেই আমি সাহিত্যে না গিয়ে সাংবাদিকতায় এলাম। অবশ্যি, বলতে পারেন, সাহিত্য আর সাংবাদিকতা একাকার হয়ে গেছে একালে। এও এক রকমের ভেজাল। কিন্তু ভেজাল হলেও বেশ মুখরোচক এবং পুষ্টিকারক, নয় কি? তবে, আমার দিক থেকে সেটা বোধ হয় আবো। যথার্থ সাহিত্যিক যেমন হতে পারিনি, তেমনি যথোচিত সাংবাদিকও আমি হইনি সঠিক। গোঁজামিল রয়ে গেছে সেখানেও। হয়ত সেটা গাঁজার মিল। সেই কারণেই হয়ত একটু মৌজ লাগে, একদল অ্যাডিটেড পাঠক চিরকালই পাওয়া যায়–যারা কিনা ওই গাঁজাদারের মজাদারির লোভে তার রুজি-রোজগার বজায় রাখে। কিন্তু এটাকে তো নির্ভেজাল বলা যায় না কিছুতেই।
ওকথা থাক। প্রসঙ্গটা তিনি চাপা দিতে চান-কথা হচ্ছিল আপনার বই পড়ার বিষয়ে। সুহৃদ লাইব্রেরি না হয় গেল কিন্তু ও ছাড়া কি আর সুহৃদ ছিল না আপনার? ঐ কল্লোল গোষ্ঠীর? আপনার প্রায় সব বন্ধুরই তো চমৎকার ঘরোয়া পাঠাগার রয়েছে। আমি দেখেছি। আপনিই খালি ব্যতিক্রম। আপনার ঘরেই বইয়ের কোনো পাত্তা নেই।…তাহলেও আপনি বন্ধুদের বাড়ি কি পা বাড়ান না নাকি? তাঁদের কাছ থেকে বই এনেও তো পড়া যায়।
তা যায়। পা-ও বাড়াই না যে তা নয়। মাঝেসাঝে বন্ধুদের সাক্ষাতে যাই বইকি। অন্তত প্রেমেনের বাড়ি তো গিয়েই থাকি। লেটেস্ট আমদানি আনকোরা বই সব দেখেছি। তার বুকশেলফে। কিন্তু সেলফ-হেলফ করব যে তার সুযোগ কই? হাত বাড়াবো কি, সেদিকে ঘেষতেই দেয় না। বইকে সে প্রায় বউয়ের মই আগলে রাখে। ঐ বই আর বউ পরের হতে গেলে পরীর মত হয়ে যায়, জানেন? পাখা মেলে কোথায় যে উড়ে যায় তার পাত্তাই মেলে না আর। কিংবা…কিংবা…
কিংবা?
কিংবা বোধ হয় মার্ক টোয়েনের সেই বিখ্যাত বয়েটা তাদের মনে রয়ে গেছে এখনো –ভুলতে পারেনি। তাঁর ঘরময় বইয়ের ছড়াছড়ি দেখে কে একজন শুখিয়েছিল-বই তো পড়ার জন্যে পরের কাছ থেকে নিয়ে আসি, কিন্তু ওই আলমারি আমায় কে দিচ্ছে! বই ধারে পাওয়া যায়, কিন্তু আলমারি তো কেউ থারে দেয় না। দুঃখ করেছিলেন মার্ক টোয়েন। …তবে প্রেমেনের কাছ থেকে একেবারেই যে কোনো বই আনিনি তাও নয়। আমার দেওয়া সব বইগুলিই নিয়ে এসেছি এক সময় না একসময়।
নিজের বই বন্ধুকে উপহার দিয়ে কেউ ফেরত নেয় নাকি আবার?
বললাম না, আমি ব্যতিক্রম? আমার কোনো বই-ই তো আমার কাছে কখনো থাকে না৷ হঠাৎ কোনো পাবলিশার এলে, এসে গেলে, তখন আমার বই মেলে কোথায়? প্রেমেনের কাছেই পাওয়া যায়। সে তো কোনো বই সহজে হাতছাড়া করে না, এমন কি, আমার বইও নয়। ওখানে গেলেই মিলে যায়। এই করে আমার সব বই-ই তার কাছ থেকে ফিরিয়ে এনেছি পরস্পরায়।
পাবলিক লাইব্রেরিগুলোয় খোঁজ করলেও পেতে পারতেন আপনার বই।
তাও কি করিনি আর? নিজে না যাই, ভাগনে-ভাগনীদের পাঠিয়েছি। তারা এসে খবর দিয়েছে যে লাইব্রেরির বইয়ের তালিকায় তোমার বইগুলোর নাম আছে-কিন্তু আসল জায়গায় নেই, লাইব্রেরিতে নেই একদম।
