আহা, সেই দিদিভাই নাকি মশাই? বাতলাতে হয় আমায়–বেথুন স্কুল আর কলেজের মেয়েরাই তো খদ্দের ছিল আমার না? দিদি আর ভাই পাতিয়ে পটিয়ে ফেলেছিলাম তাদের। মেয়েদের সঙ্গে, চেনাই কি আর অচেনাই কি, ভাব জমাতে আমি ভারী পটু, সেই ছেলেবেলার থেকেই–জানেন তো?
জানলাম। তা কী রকমটা, শুনি একবার?
আমার চেয়ে বড়ো মেয়েদের, কলেজের মেয়ে তারা, তাদের কাছে গিয়ে বলতাম, কাগজ নেবেন দিদি? আর যারা বয়সে ছোট তাদের সাধতাম-কাগজ নেবে ভাই? মহাত্মা গান্ধী আজ কী বলিয়াছেন শুনবে? নাও না একখানা। পড়ে দ্যাখো।
নিত তারা?
না বলত না কেউ। প্রায় সবাই-ই নিত। যত কাগজ আনতাম, যা পেতাম আর কি আপিস থেকে–হুঁ হু করে কেটে যেত সব। তা শুনুন…সেদিন সকালে হেদোর মোড়ে দাঁড়াতেই ছেলেটার কথাটা খট করে আমার মনে পড়ল। সামনেই তো বিডন স্ট্রীট? খটকাটা আজই মিটিয়ে ফেলা যাক না! আমার দিদিভাইরা আসবার আগে হিরণ লাইব্রেরির খোঁজ নিই না গিয়ে।
কাগজের পাঁজা বগলে বিজ্ঞ টি-এর পথ ধরলাম। মাঝে মাঝে এক-আধখানা কাগজও ঐ ফাঁকে বিক্রি হচ্ছিল না তা নয়–এমনি যেতে যেতে মিনার্ভা থিয়েটার পেরিয়ে গেছি তখন আমার চৈতন্যোদয় হোলো। সামনে চৈতন্যোদয় দেখলাম।
সামনে চৈতন্যোদয়? সে আবার কী ব্যাপার? তাঁর বোধগম্য হয় না।
চৈতন্য লাইব্রেরির আবির্ভাব দেখলাম, আমি কই-চৈতন্য লাইব্রেরি অ্যান্ড ফ্রী রিডিং রুম। আরে, আরেকটা লাইব্রেরি যে রয়েছে এখানেই। বেশ বড় লাইব্রেরিই বোধ হচ্ছে। এর কথা তোকই বলেনি সেই ছেলেটা। ঢুকলাম ভেতরে। বড় হল-এ বৃহৎ টেবিলে নানান পত্র-পত্রিকা বিস্তারিত-বসে বসে পড়ছিল বহুৎ লোক। আমি ভেতরে যেতেই একজন, হয়ত ঐ পাঠাগারের কর্মকর্তাই হবেন কেউ, বললেন আমাকে–তোমার কোনো কাগজ আমাদের চাই না। খবর কাগজ কি পীরিওডিক্যাল আমাদের কিনতে হয় না, অমনি আমরা ওসব কমপ্লিমেন্টারি পাই। অনেক দিনের বিখ্যাত লাইব্রেরি আমাদের…অমনি মেলে তাই। যাও, এখান থেকে কেটে পড়ো ভাই।
কেটে পড়লেন?
কী করবো? এমন অকাট্য কথার পর আর কি এক মুহূর্ত সেখানে কাটানো যায়? তবু তার মধ্যেই আমার কার্যোদ্ধার করেছি, জেনে নিয়েছি তাঁর কাছ থেকেই হিরণ লাইবেরির ঠিকানাটা। এই রাস্তারই কোথায় যেন হিরণ লাইব্রেরি বলে আরেকটা লাইব্রেরি আছে না? সেখানেই আমি যেতে চাইছিলাম মশাই। আরে, সে তো তুমি ছাড়িয়ে এসেছে অনেক আগে, জানালেন তিনি, এই ডান দিকের ফুট ধরে চলে যাও বরাবর, মিনার্ভা থিয়েটার পেরিয়ে খানিক এগিয়ে গেলেই নজরে পড়বে তোমার। সাইনবোর্ড আছে রাস্তার ওপর। কিন্তু, লাইব্রেরি তো সন্ধ্যের আগে খোলে না বাপু, তাও আবার ঘন্টা দুয়েকের জন্যেই। ছোট্ট লাইব্রেরি। আমাদের মতন এত বড় ফ্রী রিডিং রুম নেইকো তার।
তারপর?
তারপর আর কী? সেদিন ছটার শো-র সিনেমা না দেখে যথাসময়ে গিয়ে পৌঁছলাম যথাস্থানে। তারপর অনেক দিন সেই লাইব্রেরির সদস্য ছিলাম, প্রায় সব বই-ই পড়ে ফাঁক করেছি তার। লোকগুলো ভারী ভদ্র সেই লাইব্রেরির। যে বই-ই চাইতাম, দিয়ে দিত চটপট। চার আনা কি আট আনা দামের তাদের লাইব্রেরির একটা ক্যাটালগও দিয়েছিল আমাকে দেখে দেখে বাছাই করে বই নিতাম। যেমন চমৎকার সেই লাইব্রেরিটা–তেমনি তার লোকগুলোও।
তারপর?
তারপর সেই হিরণ লাইব্রেরি ফাঁক করার পর আর কোথাও তাক করার সুবিধে হয়নি। তাকাব কি, কলকাতার কোথায় কোন্ পাবলিক লাইব্রেরি আছে তার খবরই রাখতাম না। অনেকদিন বাদে একটা সুযোগ এল আবার। তখন আমি চোরবাগানের বাসায় থাকি, চোরবাগান আর কলাবাগান যেখানে এসে গলাগলি করেছে সেই চোরা গলির মোড়ে কি করে সেই গোপালবাবুর সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল হঠাৎ। পুরো নামটা তাঁর মনে পড়ে না-গোপাললাল শীলই হবেন বোধ হয়। তিনি কী একটা লাইব্রেরির কর্মকর্তাদের একজন, জানলাম। সুহৃদ লাইব্রেরি, মহম্মদ আলি পার্কের কাছাকাছি কোথায় যেন সেই পাঠাগারটা। আলাপের পর তিনি আমায় তাঁর বাড়িতেও নিয়ে গেছলেন একবার। খাইয়েছিলেনও খুব মনে আছে।
সেই জন্যেই তাঁকে আপনার মনে আছে বোধ হয়।
তা ঠিক। জনমভোর তো পরের খেয়ে না খেয়ে কাটিয়েছি আর ওই খাবার ঠেলায় আমার হৃদয়দেশ ডায়ালেটেড হয়ে উদরের কাছেই এসে ঠাই নিয়েছে প্রায়। আমার অন্তরে স্থান পেতে হলে যুগপৎ আমার উদর আর হৃদয় আক্রমণ করতে হয়। শুধু আমার বেলায় নয়, সবার বেলাইে বুঝি তাই করতে হয়। যা গে–গেলাম তো তাঁদের বাড়ি। বাড়ি দেখে মনে হলো তাঁরা অনেকলের বনেদী। পুণ্যশ্লোক মতিলাল শীলেরই কেউ হবেন কি না জানি না।
কি রকম বাড়িটা? খুব জমকালো? মার্বেল প্যালেসের মতন?
তার ধারেকাছে না। বাড়িটার বৈশিষ্ট উচ্চতায় ততটা নয় যতটা গভীরতায়। কারো বাড়ি গেলে সদর দরজা পেরিয়ে উপরেই উঠতে হয় তো? তাঁর বাড়িতে ঢুকতে হলে সদরের চৌকাঠ পেরিয়ে তিন ধাপ নামতে হয়। রাস্তার সমতল থেকে তাঁর গ্রাউফ্লোরের তলদেশ আরো তলায়। জব চার্ণকের আমলের বাড়িই হবে বোধ হয়। তার পরে বলকাতার পথঘাটের উন্নতি হয়েছে কিন্তু তাঁর বাড়িটা আর উন্নীত হতে পারেনি।
তারপর আর যাননি তাঁর বাড়িতে কখনো?
বর্ষাকালে গিয়ে দেখবার কৌতূহল হয়েছিল একবার-সেই সময় তাঁর বাড়ির তলদেশের কী দশা দাঁড়ায় দেখতেই–কিন্তু তার সুযোগ ঘটেনি। তাছাড়া, সাঁতার জানিনে, সেদিক দিয়েও বাধা ছিল আমার।…সে কথা যাক, তার সুহৃদ লাইব্রেরিতে বিদেশী বইয়ের বেশ ভালো সংগ্রহ ছিল। মোপাসা, হার্ডি, হামসূন, গোর্কি, ইবসেন, শ, পীরান্দেলো, মেটারলিঙ্ক, বেনাভেনতে, যোহান, বোয়ের প্রভৃতি কতজনের বইয়ের সঙ্গেই সাক্ষাৎ পরিচয় সেখানেই আমার। সেই শীল মশায়ের সৌজন্যেই যা আমার বিদেশী সাহিত্যের অনুশীলন। আজও আমি কৃতজ্ঞচিত্তে সে কথা স্মরণ করি, চাঁদা না নিয়ে অমন জোর করে আমায় গিলিয়ে না দিলে যথার্থ সাহিত্যের আস্বাদই আমি পেতাম না কোনোদিন। সুহৃদ পাঠাগারেই বিশ্বের সেরা সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচয় হল।
