আমার আবোলতাবোলের থেকে কী বোঝেন তিনিই জানেন। জনাব সাহেব আপন মনে ঘাড় নাড়েন তাঁর–কোনো উচ্চবাচ্য করেন না আর। আমার বোঝা তাঁর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে আমি যেন কিছু হালকা হতে পারি।
মহৎ উপন্যাস যেমনধারা, আমাদের জীবন বিন্যাসেও প্রায় তেমনটাই দেখা যায় না। কি? মহৎস্রষ্টা তাঁর উপন্যাসের পাঠককে সামনের সিংহদ্বার দিয়ে না নিয়ে হয়ত বা পিছনের, মেথরদের যাতায়াতের খিড়কিদোর দিয়ে ঢোকাতে পারেন, কিন্তু নিশ্চয় তাকে সেইখানেই বসিয়ে রাখেন না সব সময়? জগৎস্রষ্টা কোনো মহান্ লেখকের চেয়ে কম যান না–একথাটা মানবেন অবশ্যি?
…জগন্মাতাও তাঁর ছেলেমেয়েদের নিজের সব কক্ষেই নিয়ে যান, ভালো মন্দ সবরকমই দেখান, চাখান–সবার প্রতি তাঁর সমান টান। সম পক্ষপাত। আমার বেলাও তার কোনো অন্যথা হয়নি। লক্ষ্যপথ কী জানিনে, কিন্তু সব কক্ষপথেই ঘুরতে হয়েছে আমাকেও। তাঁর প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে বেড়িয়েছি, বাস করেছি, কিন্তু আটকে রাখেননি তিনি কোনোখানেও। আর, আমাকেও এমন কিছু কোষ্ঠবদ্ধতায় পায়নি যে, তাঁর একটিমাত্র প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ হয়ে সেই বাথরুমে গিয়ে বসে থাকব সারাটা দিন। আমার প্রাতঃকৃত্য যা কিছু জীবনের সেই প্রাতঃকালেই সারা হয়ে গেছে। সব।
…সেই বস্তি-নন্দিনীর কথা জানতে চাইছিলেন না? হ্যাঁ, তার সঙ্গসুখেও নন্দিত হয়েছি বই কি কিছুকাল, কিন্তু সেটা তেমন কালান্তক হয়নি–সঙ্গীদের মতন সঙ্গিনীরাও এক সময় ছেড়ে যায়–ছাড়িয়ে যায়। এগিয়ে যায় কি পিছিয়ে পড়ে। আর আমার দৌড়ও তো বেশিদূর নয়। আমি ভালোই জানি যে নন্দনকানন আমার জন্য হয়নি।
.
৩৯.
জনাব সাহেব তারপর পড়াশোনার কথায় এনে পাড়ার চেষ্টা করেন আমাকে-না, ওকথা শুনচি না। বিদ্যাস্থানে ভয়েবচ-র কথায় ভুলচিনে আমি। লেখাটেখার মধ্যে মাঝে মাঝে আপনার বেশ বিদ্যাবত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
একদম কিছু না জানার ঐ তো মজা মশাই! কিছুই না জেনেও স্বচ্ছন্দে সবজান্তা হওয়া যায়।
তা কি হয় নাকি কখনো? লেখক হতে হলে অনেক পড়াশোনা করতে হয়। কল্লোল যুগের আপনার বন্ধুরা প্রায় সবাই দারুণ পন্ডিত। তাঁদের বাড়ি গেলে ঘরবোঝাই আলমারি ঠাসা বই দেখতে পাই, একালের সেকালের নামকরা দেশি বিদেশি নানারকম বই।
আমার এখানে দেখছেন কি? আঁতিপাঁতি করে খুঁজলেও আমার নিজের লেখাও একখানা পাবেন না।
তার মানে? তিনি মানতেই চান না–এখানে বই না থাক, লাইব্রেরিতে গিয়ে আপনি পড়াশোনা করে থাকেন নিশ্চয়। অনেক লেখক যেমন ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে যান পড়তে, আবার সেখানে বসে লিখতেও।
রিসার্চ স্কলাররা। কিন্তু ট্রামবাসের ধকল ঠেলে সাত মাইল ঠেঙিয়ে ওখানে যাবার আমার উৎসাহ হয় না। কানেই শোনা, কোনদিন চোখেও দেখিনি, কেমন দেখতে লাইব্রেরিটা। তাছাড়া, আমার রিসার্চ করার কিছু নেই। আমার যা-কিছু রিসার্চ তা শুধু আমাকে নিয়েই।
কিন্তু না পড়লে কি মশাই লেখক হওয়া যায়?
যায় না বোধহয়। গোড়ায় কিছু কিছু পড়তেই হয় বইকি–ঐ লেখার অক্ষরপরিচয়ের জন্যই। কী লিখব, কেমন করে লিখব–সেইটে জানতেই। কথাটা আপনার মিথ্যে নয়, রবীন্দ্রনাথও একদা ঐ কথাই বলেছিলেন আমার বন্ধু শ্রীবিশু মুখোপাধ্যায়কে।
কিরকম?
সাহিত্যিক বিশু মুখোপাধ্যায়ের শৈশব থেকেই লেখক হবার শখ। কবিগুরুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল সেইকালেই। তিনি তাঁকে স্নেহ করতেন খুব। কী করে লেখক হওয়া যায় এই কথা শুধোতে তিনি তাকে বলেছিলেন যে, লেখক হতে হলে তার আগে পাঠক হতে হয়। বড় বড় লিখিয়েরা সব বড় বড় পড়ুয়া। বিস্তর পড়াশুনা না করলে লেখক হওয়া যায় না। লেখাপড়া শেখার কালে যেমন আগে লেখা, তার পরে পড়া। প্রথমে হাতে খড়ি হোলো, তারপরই তুমি প্রথম ভাগ ধরলে–লেখক হবার বেলায় ঠিক তার উল্টোটাই। আগে অনেক কিছু পড়া, তার পরেই লেখাটেখা। আগে তোমায় পড়তে হবে বিস্তর, তবেই তো তুমি লেখক হবে। গোড়ায় পড়ো, পরে পাড়ো।
ভারী চমৎকার কথাটা বলেছেন তো গুরুদেব।
কী ভাষায় ব্যক্ত করেছিলেন জানিনে, তবে কথাটা এইরকমই। আমার ব্যক্তিগত ভাষণে বিবৃত করলাম। তবে এই ধরনের একটা কথা বিশুবাবুর মুখেই আমি শুনেছিলাম অনেক দিন আগে।
তা ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে না যান কলকাতায় আরো তত ঢের পাঠাগার আছে, তার থেকেও কি বইটই এনে পড়া যায় না?
পড়েছিলাম। আমার মনে পড়ে-যখন কলকাতার রাস্তায় খবর কাগজ ফেরি করতাম না? আমার সেই কৈশোর কালেই, আমারই সগোত্র একটি ছেলে একটা লাইব্রেরির খবর আমায় দিয়েছিল, হিরণ লাইব্রেরি। বিজ্ঞ স্ট্রীট দিয়ে বাঁ ফুট ঘেঁষে গেলে মিনার্ভা থিয়েটারের ঢের আগেই পড়ে সেই লাইব্রেরিটা, বাতলেছিল সে। সেখানে টাকা জমা দিয়ে মেম্বার হলে চাঁদার বদলে বই নিয়ে পড়তে দেয়, সে বলেছিল। সেখান থেকে বিস্তর বই নিয়ে পড়েছি একসময়। মানে, সেই সময়েই।
আমার মনে পড়ে যায়–কাগজের পাঁজা বগলে নিয়ে সাত-সকালে গিয়ে দাঁড়াতাম তো হেদোর ধারে। আমার আনন্দবাজার, বসুমতীর খদ্দের তো যতো দিদিভাইরা। তখনো ঢের দেরি তাদের আসবার। দশটার আগে তো কোনো দিদিভাই-ই আসছেন না আর!
দিদিভাই? দিদিভাইরাই আপনার কাগজ কিনতেন নাকি? অপত্যস্নেহ বলে একটা কথা আছে জানি, কিন্তু নাতিবৃহৎ বাৎসল্যের ব্যাপার বলে তো শুনিনি কখনো?
