তার কথা বলুন। কথাটায় আমায় পাড়বার জন্য তিনি উন্মুখ।
তার কথা কী শুনবেন। সে কি একটা কথা হলো। সেটা কোনো কথাই নয়। শোনবার মত কোনো কথা না–শোনাবার মতও নয়। এক কথায় উড়িয়ে দিই কথাটা।
ততক্ষণে তিনি আমার দেয়াল-লিখন দেখতে লেগেছেন।
দেয়াল জুড়ে এসব কী লিখে রেখেছেন মশাই? হিসাবপত্তর নাকি?
বেহিসেবী লোকের আবার কিসের হিসেব? নাম-ঠিকানা যত।
কাদের নাম-ঠিকানা?
বোনদের-বন্ধুদের। বোনদের বন্ধু-বন্ধুদের বোন–এইসব। আবার কার?
দেয়ালে লেখা কেন? খাতায় লিখে রাখলেই হয় তো।
খাতা যে হারিয়ে যায়। খাতায় যেমন আমার হিসেব থাকে না, তেমনি খাতারও কোনো হিসেব থাকে না যে! কোনটা যে কোথায় যায় টেরই পাই না। দরকারের সময় পাওয়া যায় না। আবার কখন হয়ত বিনা প্রয়োজনে আপনার থেকেই আত্মপ্রকাশ করে বসেছে।
তাই দেয়ালে লিখে রেখেছেন?
ঠিক তাই। দেয়াল কখনো হারায় না-নেহাত যদি ভূমিকম্প না হয়। অশোকের শিলালিপির রহস্য এইখানেই। ভূর্জপত্রে না লিখে রেখে প্রস্তরগাত্রে খোদাই। খোদার বানানো পাহাড় ভূমিকম্পেও যাবার নয়, তার ওপর খোদকারি চিরদিনের জন্যই অটুট।
তাই দেখছি। আপনার এগুলোও হুবহু প্রায় তাই-অশোকের শিলালিপির মতই…কিছুতেই কানো পাঠোদ্ধার করা যাচ্ছে না। কিন্তু আশ্চর্য, বোনদের নাম ঠিকানাও আপনার মনে থাকে না–লিখে রাখতে হয়, এই ভেবেই আমি অবাক হচ্ছি আরো।
বোনদের মনে থাকে ঠিকই, কিন্তু তাদের ঠিক-ঠিকানা থাকে কি? আমি কই। তাঁর কথাটায় আমিও কিছু কম অবাক হই না-বিয়ের পর পদবীর সঙ্গে তাদের ঠিকানাও কি পালটে যায় না? বিয়ের পর সব মেয়েই তো পর হয়ে যায়-তা বোনই কি আর বন্ধুই কি!
তারপরেই আমার পুনশ্চ অনুযোগ : বিয়ের আগে পরী, বিয়ে হলেই পর!
তাহলেও, যত পরই হয়ে থাক, চিঠি লেখালেখির সম্পর্কটা রাখেই। আর তাদের চিঠিতেই তো ঠিকানা থাকে।
থাকে নাকি! সেই প্রথম চিঠিতেই থাকে যা, তারপর আর না। তারা ভাবে, তাদের মতন তাদের ঠিকানাটাও আমি স্মৃতিপটে চিরদিনের মত অঙ্কিত করে রেখেছি! কিন্তু স্মৃতিশক্তিতে আমি একেবারেই পটীয়ান্ নই, আমার স্মৃতিপট হচ্ছে আসলে সেই যবনিকাই। যে-পটক্ষেপের পরে আর উত্তোলন করা যায় না।
তাহলেও ভায়ের বাড়ি বোনের যাতায়াত থাকেই।…।
কই আর থাকে! দু-একজন বাদে সব বোনই তো প্রায় হারিয়ে যায়–চিরকালের মতই। সহোদরা হলে তেমনটা হয় না অবশ্যি। তারাই যাতায়াতটা বজায় রাখে। কিন্তু তা না হয়ে শুধু সহৃদয়া কাজিন মাত্র হয় যদি? তাহলে? হৃদয় একবার হারালে যেমন আর ফিরে পাওয়া যায় না, সহৃদয়াদের বেলাতেও তাই। সে সব বোন তখন অরণ্য হয়ে যায়। তাদের সংসাব অরণ্যে হারিয়ে আরো গম্ভীর হয়ে রীতিমতই শ্বাপদসঙ্কুল তখন। সেই অরণ্যে রোদন করতে কে যাবে?
বোনদের ব্যাপার থাক, তাদের তো সব ওপর ওপর, গভীর কিছু নয়। আপনি এই বস্তির মেয়েটির কথা বলুন…তার সঙ্গে কতদূর গড়িয়েছিল শুনি…অবশ্যি যদি আপনার তেমন আপত্তি না থাকে।
না, আপত্তি কী, তবে কথাটা এই, আমি তাঁর গভীর কথায় কান দিতে যাই না, নিজের কথার ভিড়েই থাকতে চাই–জীবনের সবরকম সম্পর্কই তো মৌলিকতা : যৌনিক। সব সঙ্গই তো সঙ্গম-কার্যত তেমন গভীরতার গর্ভে না গেলেও আসলে ঠিক তাই নয় কি? এমন কি, নিছক আদর করার মধ্যেও সেই আসঙ্গলিলাই।
ঠিক তাই কি? অবশ্যি ফ্রয়েড প্রমুখ মনস্তত্ত্বের পন্ডিতরা সেই রকমটাই বলেছেন বটে! তবুও যেন তাঁর দ্বিধা থেকে যায়।
জীবনের মূলরস তাই হলেও, আর ওপরেও আরো সাফল্য আরো প্রফুল্লতা থাকে-থাকে? মূলের গর্ভ থেকেই তো ফুল ফোটে-ফল ধরে-জীবনের ডালপালায় সৌরভাহুত পাখি আর মৌমাছিরা এসে জোটে, কিন্তু তাহলেও, মূলতঃ সেক্সই অস্তিত্ত্বের আদি রস হলেও এবং দুনিয়ার সবাই সেই রসে বশে থাকলেও–এমনকি তিনিও নাকি ওই রসের ওপর বৈসে রইলেও-উপনিষদে তাঁকে রসসা বৈ সঃ বলেছে না?–সেই আদি রস অনাদি অনন্ত অফুরন্ত ইত্যাদি হয়েও তাই কিছু জীবনের আদ্যন্ত নয়। বৃন্দাবনের পরও কুরুক্ষেত্র থেকে যায়। এমন কি ঘোড়া বহুত ঐ মথুরাও থাকে! শিবের লিঙ্গপ্রত্যয় আর কৃষ্ণেন্দ্র রাস পঞ্চাধ্যায় বাদেও জীবনের অনেক প্রত্যয়, অনেক প্রকাশ থেকে যায়। আদিম রস ছাড়াও আরও নানা রস রয়েছে। এই জীবনে, যা নাকি অকৃত্রিম। এমন কি ওই কসের মধ্যেও রস রয়ে গেছে–কটু তিক্ত কষায়ের মধ্যেও রসায়ন। কদর্যের ভেতরেও সৌন্দর্য। আদি রসকে ছাপিয়ে উঠে ছাড়িয়ে গিয়েই যত রূপারাপ আর শিল্পরূপ-রসোত্তীর্ণ হয়েই না! আদ্যিকালের থেকে জীবনও, মহাশূন্যের মতই, ক্রমেই আরো সম্প্রসারিত হচ্ছে না কি? সব হবার পরেও আরও কিছু বাকী থাকে। জীবনের সবখানে সেক্স থাকলেও সেক্সই কিছু জীবনের সবখানি নয়।
আমি হাঁফ ছাড়তে না ছাড়তেই তাঁর আরেক লাফ।
যথা? তিনি আরো বিশদের পক্ষপাতী : দৃষ্টান্ত স্বরূপ?
জীবনটা যেন সাতমহলা বাড়ি–তার সবটাই কিছু বাথরুম হয় না। প্রাত্যহিক প্রয়োজনে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বিরাট প্রাসাদের মধ্যে তার জন্যেও একটুখানি আলাদা করা থাকে বটে। কিন্তু সেইটাই তার সর্বস্ব নয়। বিধাতার প্রসাদে কারো যদি এই প্রাসাদে প্রবেশ লাভের সৌভাগ্য হয়, সে কি শুধু সেই বাথরুমেই বসে সারা জীবনটা কাটিয়ে দেবে তার? সে কি তার ঘরে ঘরে ঘুরে-ঘুরেফিরে সবকিছু দেখবে না? তার রঙমহল, রূপমহল, শীষমহল, নাটমহল… মহলে মহলে টহল দিয়ে নিজের কৌতূহল মেটাবে না? এমনকি যেখানে গেলে সে রাজতুল্যই, তার সেই রাজমহলে গিয়েও নিজের সিংহাসন দখল করবে না সে?… তা না হলে তার জীবনজোড়া অভিজ্ঞতার মালাই বা গাথা হবে কি করে? হাটের সব সওদা না সংগ্রহ করলে তার এই ভবযাত্রার পালাই যে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
