কেউ চায় অন্নসুধা, কারো শুধু অন্নক্ষুধা।
ঘুমোবার আগে আরেক দুর্ভাবনা হানা দিল মাথায়। শোবার ধান্দা তো চুকেছে, এখন ওঠার সমস্যা? আমাকে যে ভোর চারটেয় উঠে ছুটতে হবে, কাগজের লাইনে গিয়ে জুটতে হবে সবার গোড়ায়–সেই সমস্যা? সেটা কে মেটায়?
আমার যে অঘোর ঘুম, তার থেকে টেনে তোলে কে আমাকে?
মতি শীলের ইস্কুলে সেই ছেলেটির কাছে শুতে পেলে তার সহজ সমাধান ছিল। নজের গরজেই উঠত ছুটত, আমাকেও সঙ্গী করে নিত যথাকালে।
কিন্তু এখানে এখন-এই অকালে?
ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি কখন।
গভীর রাত্রে আমার ঘনঘোর ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ-কাঁসর ঘন্টার শোরগোলে। মার মঙ্গলারতি শুরু হয়েছে।
ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। হাতঘড়িতে দেখলাম, চারটে বাজেনি তখনো।
না, রাত গভীর নয়। মন্দিরের সামনেও বেশ ভিড়। ভক্তজনরা জড়ো হয়েছেন সেই অতি ভোরে মার আরতি দর্শনে।
একপলক দেখেই না প্রণাম ঠুকতে হয়েছে আমায়। গোলদীঘির শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেসে গিয়ে এখনি লাইন লাগাতে হবে সবার গোড়ায়। তারপর সেখানকার কাজ সেরে আমহার্স্ট স্ট্রট ধরে বৌবাজারের বসুমতী সাহিত্য মন্দিরে। যাক, মুক্তারামবাবু স্ট্রীটের এমোড় থেকে ওমোড়ে–সকাল ও দুপুরে মল্লিকবাড়ি আর রাত দুপুরে কালীতলা এই দুই মেরুর মধ্যে আমার গতিবিধির ছকবাঁধা হয়ে গেল। ব্যস্!
খাওয়া শোয়া আর অতি প্রত্যুষে কাজে যাওয়া-এই তিন ধান্দাই মিটে গেল এক যাত্রায়। অবলীলাতেই।
এখন নিশ্চিন্ত।
.
৩৮.
অনেকদিন পরে আবার এক সকালে জনাব সাহেবের স্লিপারের ধুলো পড়ল আমার দোরগোড়ায়।
আরেক খাঁটি স্লিপার তখন আমার ঘরেই–আমার বিছানায় বিলম্বিত। স্বয়ং আমিই।
পরিপাটি ঘুম দিচ্ছিলাম কিন্তু দ্বারদেশে তিনি এসে দাঁড়াতেই ঘুম ভেঙ্গে গেছে আমার।
কোনো আবির্ভাব ঘটলে অবচেতনায় কেমন করে যেন টের পাওয়া যায়। চটকা ভেঙ্গে যায় চট করে।
তাকিয়ে দেখি তিনি আমার দরজার কড়া দুটি নেড়েচেড়ে দেখছেন। নিঃশব্দে।
কী দেখছেন? জানান দেবার জন্য এখানে কড়া নাড়ার কোনো কড়ার নেই, কড়াকড়ি নান্তি। আমি জানালাম : অহোরাত্র আমার অবারিত দ্বার।
দরজা খুলেই ঘুমান? কিছু চুরিটুরি যায় যদি? তাছাড়া…তাছাড়া যেমন দিনকাল…কোন ভয় করে না আপনার?
ভয় কিসের? চোর ডাকাত ঘাতক কি পকেটমারের দুর্ভাবনা আমার নেই। প্রথমত, আমার প্রাণের কোনো দাম আছে আমি ভাবি না-কারই বা প্রাণের দাম রয়েছে একালে? তাছাড়া চোরের ভয় করতে যাব কোন্ দুঃখে? আমার ঘরের এই পুঞ্জীভূত জঞ্জাল ইনকুডিং নেংটি ইঁদুর আর কাঁকড়াবিছেদের নিতে আসবে কে? এবং আমার পকেট ফুটো। এক পয়সাও নেই সেখানে। কখনো থাকে না। তাহলে?
এত এত টাকা উপায় করেন যে…?
এত এত? আমার চোখ বুঝি টাকার মতই গোলাকার হয়।
এত এত না হলেও কিছু কিছু তো বটে। সেসব যায় কোথায়?
কে জানে! দু পয়সা উপায় না হতেই কী করে যে তারা উপে যায় দেখতে না দেখতেই–সেইটেই একটা রহস্য আমার কাছে। কখনই আমি তা ভেদ করতে পারিনি মশাই! জলেরমত খরচ করলেও তা চোখে পড়ত, হয়ত তা হাওয়া হয়ে যায় বলেই দেখতে পাই না।…সে কথা থাক, আনি আমার দরজার ওপর অমন নজর দিচ্ছিলেন কেন?
কড়া দুটো দেখছিলাম। একটা লোহার, একটা পেতলের-দরজায় দুটো পাল্লার দুরকম কড়া–অত না? এরকম তো দেখা যায় না কোথাও।…এমনটা কেন বলুন তো?
কড়া পাল্লায় পড়েছিল বোধ হয় একবার।, সেইজন্যই। আমি কই।
কী বললেন? কার পাল্লায়?
কোনো সোনালি হাতের ছোঁয়া লেগে একটা কড়া হয়ত স্বর্ণময় হয়ে গিয়েছে। এই ঘরের দ্বার ভেঙে নয়, ঐ কড়া ভেঙেই ঢুকেছিল একবার–একটি মেয়ে! তার স্মৃতিটা অক্ষয় করে রাখতেই ভাঙা কড়াটার শূন্যস্থান পূর্ণ করতে ঐ অন্য রকমের লাগিয়েছি। অন্য কড়াটা সাবেক, তাই কালো ভূত, আর নয়া আমদানি ঐ সোনা, সোনা! কি রকম কৃষ্ণ-রাধিকার মিলন রহস্যের ইঙ্গিতবহ-তাই না?
আপনার জীবনেও আদিরস এসেছিল তাহলে একদিন?
কার না আসে? অনাদি কাল থেকে আসছে সবার জীবনে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই– আমার বেলাও তার অন্যথা হতে পারে না। তবে আমার আদিম রস সেই আদ্যিকালেই ফুরিয়ে গেছে–ছেলেখেলা যত সেই ছেলেবেলাতেই খতম। তারপরই সব বিলকুল তামাদি।
আপনার ঐ কড়া কথাটা শুনতে চাই মশাই!
কথাটা কী আর! চাবি হারিয়ে গেছল, ঘরে ঢুকতে পারছিলাম না। রাত বারোটা বাজিয়ে বাসায় ফিরেছি, সব নিশুতি। এদিকে আমার ফুরফুরে পাতলা সিল্কের জামা ফুটো। হয়ে ঘরের চাবি গলে রাস্তায় পড়ে গেছে কোথায়। এই রাত দুপুরে কি করি, কোথায় যাই, চাবিওয়ালা কোথায় পাই, এমন সময় মেয়েটা এসে হাজির। দুপাক মুচড়েই ভেঙে ফেলল কড়াটাকে, কব্জির জোর ছিল তার। বস্তির মেয়ে তো।
বস্তির মেয়ে।
শ্রাবস্তীর মেয়ে কোথায় পাব! আমি যখন এ পাড়ায় প্রথম আসি তখন এর চারধারেই বস্তি ছিল। কোকেনের কারবার ছিল গলির ঐ কোণটায়…চোর ছ্যাঁচোর গুভা বদমায়েস কিলবিল করত চারধারে।
আমি ভেবেছিলাম, আপনার কোনো বোনটোন হবে বুঝি! বিনি-টিনি! ইতু-টিতু! তা নয়, বস্তির মেয়ে! হতাশার সুর ধ্বনিত হয় তাঁর গলায়।
ইতুটিতুর দেখা পাইনি তখনো…তখন তারা জন্মায়নি। না, বিনিও না। আকৃতিতে হলেও আমার বোনেদের মত প্রকৃতিই ছিল না মেয়েটার। অন্য প্রকৃতির–একটু বন্য প্রকৃতির। তা ঈষৎ বন্যরূপ হলেও, আমার বোনেদের সঙ্গে এক জায়গায় ভারী মিল ছিল তার। শুধু তার কেন, তার মতই প্রায় আমার সব বন্ধুরই–কী ছেলে কী মেয়ে! সেটা তাদের ঐ লাবণ্যরূপ।
