কাগজখানার গোড়ায় সম্পাদক শ্রীহেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ থেকে শুরু করে শেষ লাইনে মুদ্রাকরের ঘোষণা পর্যন্ত গড়িয়ে যেতেই বারোটা বেজে গেল। টনক নড়ল আমার। মাথায় আর পেটে যুগপৎ! এখন তো কিছু না খেলেই নয়।
মল্লিকবাড়ি যেতে হয় এবার। ছেলেটা বলেছিল একটার পরেই নাকি তারা খেতে দেয়। সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে একটা বেজে যাবে।
গিয়ে দেখি প্রায় হাজার খানেক ভিখিরির ভিড়। তাদের সারির ভেতর খাড়া হয়ে গেলাম। এক জায়গায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম মার্বেল প্যালেস।
এই সেই বিশ্ববিখ্যাত মর্মর প্রাসাদ! আপাদমস্তক মার্বেল প্রস্তরে গঠিত দেখে চোখ ঠিকরে যায়। দেশবিদেশ থেকে কৌতূহলী পর্যটক যা সাধ করে দেখতে আসে। সেই দানধন্য পুণ্যশ্লোক রাজেন মল্লিকের বাড়ি–যাঁর বদান্যতা ভারতবিদিত।
বিরাট প্রাঙ্গণের মাঝখানে একটা ফোয়ারায় জল উপচে পড়ছিল–এখানে-ওখানে মর্মরমূর্তির ভাস্কর-কীর্তি। সারস পাখিরা চরে বেড়াচ্ছে ইতস্তত। কয়েকটা হরিণও দেখেছিলাম মনে হয়।
এধারে আমরা সারবন্দী দাঁড়িয়ে-খাবারের প্রত্যাশায়।
আসতে আসতে আমার পালাও এল পাবার।
কিসে দেবো হে তোমাকে? থালাটালা কিছু আনননি? শুধালো পরিবেশক।
আনিনি তো। আনতে হয় জানতাম না। আজ প্রথম আসছি কিনা!
দেখছ না সবাই তাদের সানকিতে নিচ্ছে।
দেখলাম বটে, সানকি কিংবা কলাই-চটে-যাওয়া প্লেটে করেই নিচ্ছিল সবাই।
দিচ্ছিল খিচুড়ি। চরাচরের খাদ্যাখাদ্যের মধ্যে আমার অন্যতম প্রিয়তম।
আমাকে এই কাগজটাতেই দিন না হয়। কাগজেই খাব আমি।
কাগজে খাবে? সে কী?
খাওয়া নিয়ে কথা। কাগজ তো আর খেতে যাচ্ছিনে
পরিবেশক একটু হেসে বললে-তুমি কি পড়োটড়ো কোথাও? ইস্কুলের ছাত্র নাকি?
হ্যাঁ। ছাত্র বইকি। কলেজে পড়ি আমি। ন্যাশনাল কলেজে।
তাহলে তোমায় এই ভিখিরিদের মধ্যে বসে খেতে হবে না। ছাত্রদের জন্যে ভেতরে খাবার ব্যবস্থা আছে। তাদের সঙ্গে বসে খাবে তুমি।
ভেতরে গিয়ে ছাত্রদের পংক্তি ভোজনে বসলাম। সেখানে খাবার ব্যবস্থা ভালোই। তাদের মধ্যে সেই ছেলেটিকে কিন্তু দেখা গেল না। তার ইস্কুলের টিফিনের ঘন্টা পড়েনি বোধ হয় এখনো, কিংবা হয়তো সে কাগজ বেচে ভবানীপুরের থেকে এসে পৌঁছতে পারেনি যথাসময়ে। ইস্কুল কামাই করেছে আজ।
মার্বেল প্যালেসে খাওয়া আমার সেই প্রথম হলেও সেই শেষ নয়। তার পরেও, অনেকদিন পরে আরো ভেতর গিয়ে খাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল।
প্রায় দশক দুই আগে হবে মনে হয়, মল্লিক বাড়ির ছেলে বীরেন্দ্র মল্লিক গৌরাঙ্গপ্রসাদ বসুর সহযোগিতায় সম্প্রতি নামে একটি আধুনিক সাহিত্যপত্র বার করেছিল, আর সব লেখকের সাথে আমার লেখাও ছিল তাতে–তার কয়েক সংখ্যাতেই। সেই সূত্রে বীরেনের সঙ্গে আমার পরিচয়। তার বাবার সঙ্গেও যোগাযোগ।
সন্ধ্যেবেলায় সম্পাদকের বৈঠক বসত–একতলার বাঁদিক-ঘেঁষা ঘরে বীরেনের নিজের ড্রইংরুমে। ওদের কুলদেবতা জগন্নাথের সান্ধ্য পূজার শেষে মহাপ্রসাদ আসত, প্লেটে করে বড়ো বড়ো সাইজের লুচি আর তরকারি। ঘি দিয়ে রাঁধা তরকারি সব–তার স্বাদই আলাদা। আর সেই সঙ্গে তাদের নতুন বাজারের ইয়া ইয়া কড়াপাক সন্দেশ। তুলনা হয় না যার।
চমৎকার সেতার বাজাত বীরেন। আর খাসা আধুনিক কবিতা লিখত–একেবারে নতুন ধাঁচের। প্রেমেনকে তার কবিতার প্রশংসা করতে শুনেছিলাম।
সেই ছেলেটির লেখাটেখা আর দেখা যায় না। সে কি আর সেই ছেলেটি আছে এখন? তারই হয়ত তার মতন একটি ছেলে হয়েছে এতদিনে, সে ছেলেও হয়ত এখন আর ছেলেমানুষটি নেই।
বীরেনের বাবা কুমার দীনেন্দ্র মল্লিকের ছবি আঁকার প্রতিভা ছিল। আশ্চর্য পোর্ট্রেট আঁকতেন। তাঁর কয়েকখানা ছবি সম্প্রতিতে প্রকাশিতও হয়েছিল। অন্য পত্রপত্রিকাতেও সম্ভবত।
তিনি একদিন আমায় মার্বেল প্যালেসের ভেতরে বিভিন্ন ঘরে বিশ্ববিখ্যাত ভাস্কর আর শিল্পীদের বহুমূল্য ভাস্কর্য আর চিত্রকর্ম দেখিয়েছিলেন ঘুরিয়ে। সেগুলির শিল্পব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
মল্লিক বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাগজ বিক্রির আমার প্রাপ্য কমিশনের লভ্যাংশ থেকে তিনটে সিনেমা দেখলাম সেদিন। তিনটেয়, ছটায়, নটায়। তারই ভেতরে এক ফাঁকে কাগজের আপিসে টাকা জমা দিয়ে এসেছি গিয়ে।
সাড়ে এগারোটায় শেষ শো খতম হবার পর ফিরে এলাম ঠনঠনেয়। সকালে একটা পাঞ্জাবী হোটেল দেখে গেছলাম সেখানে।
সেইখানেই রাত্রের খাবার খাব ঠিক করা ছিল।
পাঞ্জাবী রুটি আর গরম গরম মাংসের চপ খেয়ে পেট ঠান্ডা করা গেল এতক্ষণে। সকালের সেই খিচুড়ির পর এখন এই খাওয়া।
অবশ্যি সারাদিন ধরেই টুকটাক চলেছিল আমার। ডালমুট চানাচুর চিনেবাদামের ব্যত্যয় হয়নি। সেই সঙ্গে ফাঁকে ফোকরে ঝুনো নারকেলের টুকরোটাকাও।
খাবার পরে এবার শোবার ধান্দা।
শোবার আগে সব কাজকর্মের কাবারে সারাদিনের শেষে মায়ের চরণদর্শন করা যাক এবার।
কালীমন্দিরে গিয়ে দেখি, আরে, এখানেই তো সারি সারি শুয়ে আছে কতজনা! ভিখিরিই বোধ হয়। এদের মাঝখানেই তো আমি শুতে পারি। এরই এক কোণে গড়িয়ে পড়ি না কেন? তোফা শোবার জায়গা!
সকালে ভিখিরিদের সামিল হয়ে খেয়েছি, রাত্রে তাদের সঙ্গেই শোয়া গেল না হয়, ক্ষতি কি?
সত্যি বলতে আমি তো ওদেরই একজন।
ভেবে দেখলে এ সংসারে কে ভিখিরি নয়? সকলেই কখনো না কখনো কারো না কারো কাছে কিছু না কিছুর প্রত্যাশী। স্বয়ং পরম শিবের থেকে অধম এই শিবরাম পর্যন্ত ভিখারী সবাই-পার্থক্য যা কিছু তা কেবল আপেক্ষিক।
